Editorial

হিন্দুত্ববাদীদের হাতে মন্দির নিরাপদ নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের স্বঘোষিত ঠিকাদার হিসাবে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির যারা তুখোড় খেলোয়াড় তাদের আসল স্বরূপটি ধর্মপ্রাণ মানুষের কাছে বেআব্রু হয়ে গেছে অযোধ্যায় দান চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে। নরেন্দ্র মোদীর হাতে অসমাপ্ত রামমন্দিরের উদ্বোধন এবং রামের মুর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার দু’বছর কাটতে না কাটতেই ভক্তদের দান করা শত শত কোটি টাকা ও স্বর্ণালঙ্কার বেবাক চুরি হয়ে গেছে। চুরি করেছে অন্য কেউ নয়, যাদের হাতে মন্দিরের পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, দেখভালের দায়িত্ব ‘দেবতার ধন’ চুরির সঙ্গে সরাসরি বা পরোক্ষে জড়িত তারাই। তাই যারা হিন্দু হিন্দু বলে বাজার গরম করে, নিজেদের হিন্দু রক্ষা কর্তা বলে দাবি করে, মুসলিম বিদ্বেষ ছড়িয়ে সম্প্রীতি নষ্ট করে দাঙ্গার উসকানি দেয় তাদের সম্পর্কে সতর্ক হবার সময় এসেছে। নতুন করে ভাববার সময় এসেছে হিন্দু এবং হিন্দুত্ববাদ এক নয়। ধর্ম হিসাবে হিন্দু ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও আচরণের বিষয়। হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসীদের কাছে মন্দির অত্যন্ত পবিত্র স্থান। তারা মন্দিরকে তাদের আরাধ্য দেবতার আবাস মনে করেন। তাই মন্দির বা দেবালয়ের দায়িত্ব তাদেরই হাতে থাকা উচিত বলে ভক্তরা মনে করেন যাদের দেবতার আরাধনা ছাড়া দ্বিতীয় কোনও স্বার্থ নেই।
কিন্তু বাস্তবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে মন্দির বা ধর্মস্থানগুলিতে নিঃস্বার্থ ধর্মপ্রাণ মানুষের বদলে হিন্দুত্ববাদীদের একচ্ছত্র দাপট। হিন্দুত্ববাদ আরএসএস উদ্ভাবিত একটি রাজনৈতিক প্রকল্প। হিন্দু ধর্মের সঙ্গে এর কোনও সম্পর্ক নেই। তবে হিন্দু ধর্মকে আশ্রয় করে ও ব্যবহার করে পরগাছার মতো হিন্দুত্ববাদ বেড়ে উঠতে চায়। এই হিন্দুত্ববাদী রাজনৈতিক প্রকল্পকে আশ্রয় করে একদা হিন্দু মহাসভা, পরে জনসঙ্ঘ, অধুনা বিজেপি তৈরি হয়েছে। এদের লক্ষ্য হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করা। সেই মতো সংবিধান বদলে ফেলা। হিন্দু ধর্মের উদারতা, সহিষ্ণুতা, সৌহার্দতার ছিটেফোটা নিদর্শনও হিন্দুত্ববাদে নেই। হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে স্বৈরাচার, একনায়কতন্ত্র তথা ফ্যাসিবাদের ভীষণ রকমের মিল। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি যে রাজনৈতিক ব্যবস্থার জন্ম দিতে চায় তাতে একদল, এক নেতা, এক ভাষ্যই সার কথা। তাই হিন্দুত্ববাদীরা এক দেশ, এক দল, এক নেতা, এক ধর্ম, এক ভাষ্য, এক সংস্কৃতির কথা হামেশাই বলে থাকে। অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদে ভিন্নমতের কোনও জায়গা নেই। ব্যক্তি স্বাধীনতা, সর্বজনীন নাগরিক অধিকার হিন্দুত্ববাদে স্বীকৃত নয়। হিন্দুত্ববাদ অতি উগ্র জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস করে। রাষ্ট্রই সব। রাষ্ট্রনায়ক আগেকার রাজা বা সম্রাটের মতো সব ক্ষমতার অধিকারী। হিন্দুত্ববাদে স্বাধীন নাগরিক অনুগত প্রজায় পরিণত হয়। প্রজার ভিন্ন মত পোষণ, বিরোধিতা করার অধিকার, প্রতিবাদ করার অধিকার, সমালোচনার অধিকার থাকে না। হিন্দুত্ববাদীরা ভারতকে সেই দিকে নিয়ে যেতে বদ্ধ পরিকর।
হিন্দুত্ববাদের ব্যবস্থাপনায় মন্দির আর ধর্মপ্রাণ ভক্তদের থাকে না, সেটা চলে যায় রাজনৈতিক হিন্দুত্বের কারবারিদের দখলে। অযোধ্যায় সেটাই হয়েছে। রাজনৈতিক হিন্দুত্বে স্বার্থবাদী কলুষতার ছড়াছড়ি। এরা আসলে কেউ ধার্মিক নয়। ভেকধারী। মন্দিরকে ঘিরে সমগ্র ধর্মীয় পরিসরকে রাজনীতির ভিত্তিকেন্দ্র হিসাবে অপব্যবহার করে। সকল ধর্মভীরু মানুষকে রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে ক্ষমতা দখলের সোপান হিসাবে।

Comments :0

Login to leave a comment