গল্প | আম
সৌরীশ মিশ্র
নতুনপাতা | ৪র্থ বর্ষ | ৪ জুলাই ২০২৬
"বুবুন, যা তো একটু তপতী ঠাম্মির বাড়ি। কাল গাছ থেকে আম পাড়িয়াছেন। এই ফোন করেছিলেন। আম রেখেছেন ক'টা আমাদের জন্য। নিয়ে আয়।"
সন্ধ্যেবেলা এখন। নিজের ঘরে খাটে বসে পড়াশুনা করছিল বুবুন। ওর এখন ক্লাস ফাইভ। হাতে ধরা ইতিহাস বইখানা খাটের একপাশে রেখে উঠে পড়ল সে। বুবুনের পরনে ছিল একটা স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট। সে গেঞ্জির ওপর একটা জামা পড়ে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ল বাড়ি থেকে।
বুবুনদের বাড়ি থেকে বেড়িয়ে ডানদিকে চারটে বাড়ি ছেড়ে অনেকটা জায়গা জুড়ে বিশাল বাগান ঘেরা পেল্লাই দোতলা সাদা রঙের বাড়িখানা যেটা, সেটাই তপতী রায়চোধুরীর বাড়ি। যিনিই এই পাড়ার সব কচিকাচাদের তপতী ঠাম্মি। ঐ বাড়িতে আর কেউ থাকে না। ওনার স্বামী মারা গেছেন বছর দু'য়েক আগে। নিঃসন্তান ওনারা।
তা, আগেই বলেছি না, ঐ তপতী দেবীর বাড়িটা ঘিরে আছে একটা সুবিশাল বাগান। ফুলের গাছ তেমন নেই। প্রায় সবই ফলের গাছ। আম, জাম, কাঁঠাল... কি ফলের গাছ নেই ঐ বাগানে! তবে এইসব গাছ কোনোটাই তপতী দেবীর বা ওনার স্বামী মন্মথবাবুর লাগানো নয়। সব লাগানো মন্মথবাবুর বাবার, অর্থাৎ তপতী দেবীর শ্বশুরমশায়ের। মন্মথবাবু যখন ছিলেন তখন মালি দিয়ে যত্ন করাতেন তিনি এই বাগানের। আর এখন বাগানের সেই পরিচর্যা চলে তপতী দেবীর তত্ত্বাবধানে। তাই, প্রায় সারা বছর ধরেই নানান ফল হয় ঐ বাগানটায়। আর, গ্রীষ্মকাল এলে তো কথাই নেই! আর সে সব ফল পাড়ার সব ছোটদের মধ্যে বিলিয়ে দেন তপতী দেবী। আজ যেমন বুবুনের মা-কে একটু আগে ফোন করে বলেছেন তিনি, বুবুনকে একটু পাঠিয়ে দিতে যাতে পাড়া আম কিছু নিয়ে যায় এসে সে। গতকাল বিকেলে লোক লাগিয়ে দুটো গাছের আম পাড়িয়েছেন তপতী দেবী।
যাই হোক, ইতিমধ্যেই বুবুন পৌঁছে গেছে তপতী দেবীর বাড়ির সামনে। তপতী দেবী বারান্দাতেই ছিলেন। বুবুনেরই অপেক্ষা করছিলেন। "আয়, ঘরে আয়।" বুবুনের মাথায় আদর করে একটু হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন তপতী দেবী।
তপতী দেবীর পিছন-পিছন ঘরে গিয়ে ঢুকল বুবুন। বহুবার এসছে এই বাড়িতে সে। তাই, এই বাড়ির কোথায় কি সবই জানে বুবুন। ডাইনিং টেবিলে রাখা দুটো প্যাকেট। বুবুন বুঝতেই পারলো, ওগুলোর মধ্যেই আম আছে।
তপতী দেবী ঐ দুটো প্যাকেটের মধ্যের একটা নিয়ে বুবুনের হাতে দিলেন। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হেসে বললেন, "খাস্। তোর তো আম ফেভারিট।"
বুবুনের কথাটা শুনে কেমন লজ্জা-লজ্জা পায়! সে ঘাড় নেড়ে বোঝায়, সে খাবে। তারপর বলে, "আসি তাহলে ঠাম্মি?"
"হ্যাঁ, আয়।" বলেন তপতী দেবী।
বুবুন বাড়ির মেন গেটের দিকে পা বাড়ায়। সবে দু'পা এগিয়েছে সে, পিছন থেকে ফের তাকে ডাকলেন কেন জানি তপতী দেবী। "বুবুন..."
বুবুন তাড়াতাড়ি ঘুরে পিছনের দিকে তাকায়। তপতী দেবীর দিকে তাকিয়ে বলে, "কিছু বলছো আমায় ঠাম্মি?"
"হ্যাঁরে। আচ্ছা, আমাদের পাড়ায় ঢুকে যে নতুন একতলা বাড়িটায় লোক এসেছে না, ওটায় একটা তোরই মতোন বয়সী ছেলে থাকে না?"
"হ্যাঁ তো। ও তো সঞ্জু। ভালো নাম সঞ্জীব।" বলে বুবুন।
"তুই তো চিনিস দেখছি ওকে।"
"চিনবো না কেন! ও তো আমাদের সাথেই বিকেলে খেলাধুলা করে। কেন ঠাম্মি?"
"তুই একটা আমার কাজ করে দিবি বাবা?"
"কেন করবো না! বলো না, কি কাজ।"
"ঐ বাড়ির কারোর সাথে তো আমার পরিচয় নেই। দেখেছি, দূর থেকে ওদের। তা আমি না, ওদের জন্য কিছু আম রেখেছি। তুই একটু দিয়ে দিবি রে?"
"কেন দেবো না! দাও। আমি এক্ষুনি দিয়ে আসছি।"
"লক্ষ্মী ছেলে আমার!" তপতী দেবী ডাইনিং টেবিলে আর একটা যে প্যাকেট রাখা ছিল সেটা তুলে নিয়ে হাতে দিলেন বুবুনের। "কাল আম পেড়েছি বিকেলে। তখনই মালিকে দিয়ে সবার বাড়ি-বাড়ি দিয়ে দিয়েছি। তোরা বাড়িতে ছিলিস না। আর ঐ বাড়িতেও কেউ ছিল না। তাই, তোদের আর ওদের শুধু দিতে পারিনি।"
"আমরা তো সবাই মামাবাড়ি গেছিলাম।"
"হ্যাঁ, তোর মা বলল ফোনে।"
"এবার আসি তবে ঠাম্মি? তুমি চিন্তা কোরো না, আমি এক্ষুনি দিয়ে আসছি সঞ্জুদের বাড়ি। ওরা আছেও বাড়িতে আজ।"
"কি করে বুঝলি?"
"তোমার বাড়িতে আসবো বলে বেরোলাম যখন, দেখি, সঞ্জু ওদের বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে। আমি হাত নাড়লাম। ও-ও তাই দেখে হাত নাড়লো। কিন্তু, মনটা যে এখনো খারাপ হয়ে আছে ওর, বুঝতে পারলাম জানো ঠাম্মি।"
"মন খারাপ কেন রে!"
"আজকের দিনেই তো ক'বছর আগে নাকি ওর মা মারা গেছে, ঠাম্মি। আমিও তো জানতাম না আগে। আজ বিকেলে ডাকতে গেছি ওকে, মাঠে খেলতে যাব, বলল, আজ যাবে না। কেন, জিজ্ঞেস করতে তখন বলল। বলল, মা-এর কথা তো সবসময়ই মনে পড়ে। কিন্তু, আজকের দিনগুলোয় মা-এর জন্য এতো এতো মন খারাপ করে কি বলব রে তোকে, বুবুন।"
তপতী দেবীর কথাগুলো শুনে চোখে জল চলে এলো সাথে-সাথে।
তিনি শাড়ির আঁচল দিয়ে তাঁর চোখের জল মুছলেন।
Comments :0