post editorial

দেশের বামপন্থী আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক

উত্তর সম্পাদকীয়​

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য
আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি। এ রাজ্যে ৩৩ বছর ধরে যে বামফ্রন্ট সরকার চলছে তা যেমন গণআন্দোলনের ধারাবাহিকতার ফলশ্রুতি, তেমনই সেই গণআন্দোলনের শীর্ষ নেতার নাম জ্যোতি বসু। কোনও একটা বিশেষণে, কিংবা কোনও একটা ঘটনার বর্ণনার মধ্যে জ্যোতি বসুকে সীমাবদ্ধ করা অসম্ভব। জ্যোতি বসু দেশের বামপন্থী আন্দোলনের মূর্ত প্রতীক। বহু আন্দোলনের তরঙ্গে তাঁকে উদ্ভাসিত হয়ে উঠতে দেখেছি, বহু প্রতিকূলতার মধ্যে তাঁর বাঙ্‌ময় উপস্থিতি দেখেছি। রাজনীতিতে তাঁকে জীবন্ত কিংবদন্তী বলা হতো। দেশে বিদেশে তিনি শ্রদ্ধার আসন অর্জন করেছিলেন। গত শতকের চল্লিশের দশক থেকে তিনি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জনসাধারণের ভালোবাসা ও শুভেচ্ছা সবসময় তাঁর সঙ্গে ছিল। তাঁকে পার্টির নেতা হিসাবে দেখেছি। শ্রমিক, মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের প্রিয় নেতা ছিলেন তিনি। ছিলেন কৃষিজীবী সমাজের ভালোবাসার মানুষ। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ছিল বিতর্কের ঊর্ধ্বে। আমাদের বর্তমান শিল্পনীতিও তাঁরই চিন্তাপ্রসূত। দেখেছি, সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে তিনি কখনো দেরি করতেন না। 
এ সবকিছুর বাইরেও জ্যোতি বসুকে আমি দেখেছি এক অসমসাহসী মানুষ হিসাবে। তাঁর কথা মনে করলেই এক লহমায় হাজির হয় অসংখ্য উজ্জ্বল স্মৃতি। সেই সব স্মৃতির মধ্যে থেকে উঠে আসে স্ফুলিঙ্গ সব মুহূর্ত আর দেখতে পাই দৃপ্ত জ্যোতিবাবুকে। তাঁর ওপর আক্রমণের একাধিক ঘটনা ঘটেছে। পাটনায় তাঁর প্রাণনাশের চেষ্টা হয়েছিল। বারুইপুরে তাঁর ওপর আক্রমণ চালিয়েছিল কংগ্রেসীরা। বসিরহাটে হামলা করেছিল নকশালরা। কোনও ঘটনায় তাঁকে বিচলিত হতে দেখিনি। এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে একটি দিনের কথা। বিরাটিতে একটা সভা করতে যাচ্ছিলেন জ্যোতিবাবু। আমি সঙ্গে ছিলাম। ১৯৭১ সাল। দমদম বিমানবন্দরের কাছে আমাদের আটকাতে প্রচুর বোমা পড়ছিল। খুব গন্ডগোল হচ্ছিল। আমাদের গাড়ি চালাচ্ছিলেন হাবুদা, কিছুটা হতচকিত হয়ে পড়লেন। জ্যোতিবাবু শুধু বললেন— থামলে চলবে না। আমাদের এগতেই হবে। গাড়ি এগলো। বোমাবাজি, হাঙ্গামার মধ্যে দিয়েই আমরা সভায় গিয়ে পৌঁছলাম। সভা হলো। এইরকম আরও ঘটনার সাক্ষী আছেন আরও অনেকে। আমারই কত স্মৃতি আছে। অনেক।
আর একটা দিনের কথা উল্লেখ করতে চাই। সেটা ’৭২-এর নির্বাচনের দিন। পুলিস নামিয়ে, মিলিটারি নামিয়ে, দুষ্কৃতীদের দিয়ে সন্ত্রাস চালিয়ে ভোট করল ওরা। বরানগরের প্রার্থী জ্যোতি বসু, পার্টির কর্মী-নেতাদের নিয়ে এই রিগিং বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু বেলা বারোটা নাগাদ বুঝে গেলেন অসম্ভব। বুঝলেন পরিকল্পিত রিগিং। কিছু করা যাবে না। জ্যোতিবাবু প্রার্থীপদ প্রত্যাহার করে নিলেন। তারপর সোজা পার্টি অফিসে চলে এলেন। সেখানে প্রমোদ দাশগুপ্ত, পি সুন্দরাইয়া ছিলেন। রাজ্যের বহু জায়গা থেকে একইরকম খবর আসছে। আমাদের প্রার্থীরা, কর্মীরা আক্রান্ত, মানুষ ভোট দিতে যেতেই পারছেন না। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরে বুঝতে পারলাম সন্ত্রাস, জালিয়াতি করে রায় পালটে দেওয়া হয়েছে।
’৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকার প্রতিষ্ঠার পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজই ছিল গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠিত করা। শান্তিশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। ওরা যা করেছিল তার প্রতিশোধ নয়, একথা প্রকাশ্যেই ঘোষণা করেছিলেন প্রমোদ দাশগুপ্ত, জ্যোতি বসু। শুরুতেই বামফ্রন্ট সরকারের একটা বড় পদক্ষেপ হলো সার্বিক বন্দিমুক্তি। আমাদের পার্টি কর্মীদের, সেই সঙ্গে নকশালদেরও মুক্তি দেওয়া হলো। সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় কংগ্রেসের মাঝারি মাপের অনেক নেতাকেও ওদের দলের কোন্দলে জেলে বন্দি করে রেখেছিলেন, তাদেরকেও মুক্তি দেওয়া হয়। নকশাল নেতা কানু সান্যালকে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তখনই। কিন্তু অন্ধ্র প্রদেশে কেস থাকায় তাঁকে ছাড়া যায়নি। জ্যোতিবাবুর চিঠি নিয়ে তখন আমি অন্ধ্র প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলাম। বললেন, অসম্ভব, কানু সান্যালকে মুক্তি দিতে পারবো না। ফিরে আসতে হলো।
বামফ্রন্ট সরকার যে অন্যরকম সরকার তা প্রথম দিনেই বুঝিয়ে দিয়েছিলেন জ্যোতি বসু। মুখ্যমন্ত্রীর শপথ নিয়ে মহাকরণে ঢোকার সময়েই তিনি বললেন, সরকার মহাকরণ থেকে চলবে না। তার মানে কি মহাকরণে কোনও কাজ হবে না? তা নয়, সরকারকে নেমে আসতে হবে সাধারণের মধ্যে। এটাই বামফ্রন্ট সরকারের মূল দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা তাই করে চলেছি। পরের বছরই পুরানো আইনকে কাজে লাগিয়েই পঞ্চায়েত নির্বাচন হলো। সরকার প্রকৃত অর্থেই নেমে এল মানুষের কাছে, জেলায়-ব্লকে-গ্রামে। ক্ষমতা পেলেন মানুষ। কাজ শুরু হলো বিপুল বিক্রমে। এই শক্তি যে কতটা, আমরা বুঝতে পারলাম সে বছরই। এল বিধ্বংসী বন্যা। আমরা পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে পেরেছিলাম নতুন পঞ্চায়েত মাঠে নেমেছিল বলেই। শুধু প্রশাসন দিয়ে একাজ করা যেত না।
শহরে পৌরসভাগুলোকেও জাগিয়ে তোলা হলো সেই সময়ে। কংগ্রেস বেশিরভাগ পৌরসভা ভেঙে প্রশাসক দিয়ে চালাচ্ছিল। আমরা অচল, আমলাচালিত পৌরসভাকে জনগণের কাছে ফিরিয়ে দিলাম। আমাদের রাজ্যে পঞ্চায়েতের এতবড় সাফল্য, যা পরবর্তীকালে গোটা দেশে মডেল হয়ে উঠলো তার পেছনেও রয়েছে গণআন্দোলনের এক বর্ণময় ইতিহাস। ১৯৬৭, ১৯৬৯, দু’বারের যুক্তফ্রন্ট সরকার, ব্যাপক জমির লড়াই, তার পটভূমিতেই ’৭৭ সালে শুরু হলো জমির পুনর্বণ্টন। জোতদারের হাতে যে শতশত একর সিলিং বহির্ভূত জমি, যার রাজনৈতিক খুঁটি ছিল কংগ্রেস, তা এল প্রান্তিক মানুষের হাতে। বর্গাদারের অধিকার প্রতিষ্ঠা হলো। এসবের ফল পাওয়া গেল কৃষিতে। ক্রমান্বয়ে বাড়লো ফলন। সারাদেশে এখন আমরা যে কৃষি ফলনে প্রথমদিকে তার সূত্রপাত কিন্তু সেই ’৭৭ সালে।
কিন্তু ক্রমশ আমরা বুঝতে পারছিলাম শুধু কৃষিতে অগ্রগতি বা ছোট, মাঝারি শিল্পে সাফল্য রাজ্যের সার্বিক উন্নয়ন ঘটাতে পারবে না। আমাদের শিল্পে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। কর্মসংস্থান বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চনা হয়েছে এ রাজ্যের প্রতি। আমরা পিছিয়ে গিয়েছিলাম। আর একটা সুযোগ সেইসময়ে এসে গেলো, উদারনীতির সুবাদে লাইসেন্স প্রথা তুলে দিল কেন্দ্রীয় সরকার। আগে বড় শিল্পের জন্য দিল্লির অনুমতি লাগতো। জ্যোতি বসু সেইসময়ে শিল্পে এগনোর ওপর বারবার জোর দিতে লাগলেন। আজকের যে শিল্পনীতি তা তৈরিই হয় ’৯৪ সালে। যার নির্যাস হলো উন্নয়নের স্বার্থে শিল্পের প্রয়োজনীয়তা। শুধু সরকার সেটা করতে পারে না। ব্যক্তিগত পুঁজিরও প্রয়োজন রয়েছে। ওরা মুনাফা করবে ঠিকই, কিন্তু আমাদেরও প্রয়োজন কর্মসংস্থান। এর ওপর দাঁড়িয়েই আমাদের শিল্পনীতি। আস্তে আস্তে এই নীতির বিশ্বাসযোগ্যতা বেড়েছে। বিনিয়োগ এসেছে। এই পথেই আমরা এগিয়েছি। শিল্পের চিত্রও ক্রমশ পালটেছে। শিল্পনীতি রচনার ক্ষেত্রে জ্যোতি বসু আরেকটা বিষয়ে খুবই গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তাহলো শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থ রক্ষার বিষয়। তিনি শ্রমিক আন্দোলনেরও সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন। শ্রমিক স্বার্থ বিঘ্নিত যাতে না হতে পারে সেদিকে তাঁর ছিল প্রখর নজর। 
 আর একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হবে। কংগ্রেস আমলে এ রাজ্যে শিক্ষা খুবই অবহেলিত ছিল। শিক্ষকদের মাইনে ছিল না, সম্মানও ছিল না। অনেক আন্দোলন হয়েছে। সেই আন্দোলনে জ্যোতিবাবু ছিলেন, জেলে গেছেন। বামফ্রন্ট সরকার আসার পর অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয় হলো সর্বজনীন শিক্ষা। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত অবৈতনিক করা হলো। শিক্ষকদের অবস্থার পরিবর্তন হলো। সম্মান বাড়লো।
এরকম বহু ঘটনার কথাই বলা যায়। জ্যোতি বসুকে রাজনীতিবিদ হিসাবে দেখেছি, প্রশাসক হিসাবে দেখেছি। দুই ক্ষেত্রেই তাঁকে দেখেছি সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে। কত সহজে জ্যোতি বসু প্রকাশ করতেন নিজেকে, পরিস্থিতিকে। কি সাবলীল ছিল তার সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা। এবং সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন। তা সে আইন শৃঙ্খলার ক্ষেত্রেই হোক, কিংবা অন্য ক্ষেত্রে। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতেন, আমরা দেখেছি কত নির্ভুল ছিল সেইসব সিদ্ধান্ত।
বামফ্রন্ট এবং বামফ্রন্ট সরকার গঠনের প্রধান রূপকারদের মধ্যে জ্যোতি বসু ছিলেন অন্যতম। বামফ্রন্ট হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। বলা যেতে পারে ৫০-এর দশক থেকে বহু গণসংগ্রামের ফলশ্রুতিতে এই বামফ্রন্ট। যার সম্মুখ সারির নেতা জ্যোতি বসু। এই একই প্রক্রিয়ায়, এর মধ্যে দিয়ে যেতে যেতেই শুরু দেশ জুড়ে বাম ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করা। তাঁরই নেতৃত্বে শ্রমিক, কৃষক, মধ্যবিত্ত সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের আন্দোলনের যে স্রোত তার ভিত্তিতেই চলতে থাকে বিকল্পের সন্ধান। সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও চলতে থাকে বিকল্পের জন্য সংগ্রাম। তার ভিত্তি যে বাম-গণতান্ত্রিক ঐক্য, সেই দিকে আন্দোলনের দিক নির্দেশ করতেন। বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সারাদেশে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। বহুরকম অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা যে নিতে হবে জ্যোতি বসুকে দেখেছি সবসময়ই সে ব্যাপারে তৎপর। পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে পারতেন সঠিকভাবে। 
প্রকৃত বিকল্পের সন্ধান এখনও চলছে। সেই জন্যই বলছিলাম, আমরা শূন্য থেকে শুরু করিনি। চিন্তা-ভাবনা, ‌আন্দোলন–সংগ্রাম সবকিছুর মধ্যেই একটা ধারাবাহিকতা রয়েছে। এখানেই জ্যোতি বসুর অবস্থান। আমাদের লক্ষ্য আরও এগনো। আমরা সত্যিই এগিয়েছি, না পিছিয়েছি, মানুষই তা বিচার করবেন।
( ২৪শে জানুয়ারি, ২০১০ গণশক্তি পত্রিকায় বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের এই লেখাটি প্রকাশিত হয়। জ্যোতি বসুর ১১৩ তম জন্মদিবসে লেখাটি পুন:প্রকাশ করা হলো।)

বামফ্রন্ট এবং বামফ্রন্ট সরকার গঠনের প্রধান রূপকারদের মধ্যে জ্যোতি বসু অন্যতম। বামফ্রন্ট হঠাৎ গড়ে ওঠেনি। এর পেছনে দীর্ঘ আন্দোলনের ইতিহাস রয়েছে। বাম ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে সারাদেশে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে জ্যোতিবাবু অসামান্য অবদান রেখে গেছেন। বহুরকম অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা যে নিতে হবে জ্যোতি বসুকে দেখেছি সবসময়ই সে ব্যাপারে তৎপর। পরিস্থিতিকে ব্যবহার করতে পারতেন সঠিকভাবে।

Comments :0

Login to leave a comment