প্রবন্ধ | নৌকা, নদী, বলাগড়ের নৌকা শিল্প এবং শ্রেণী সংগ্রাম
অয়ন মুখোপাধ্যায়
মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ৯ জুলাই ২০২৬
শ্রেণী সংগ্রাম-এর আর্থসামাজিক কোলাজ
আজকাল বাজারে একটা নতুন হিড়িক উঠেছে—যে কোনো ধুঁকতে থাকা পুরোনো শিল্পকে ধরে এনে গায়ে একটা ‘জি আই ট্যাগ’-এর তকমা সেঁটে দেওয়া। যেন জন্ডিসের রোগীকে ফেয়ারনেস ক্রিম মাখিয়ে দিলেই সে রাতারাতি অলিম্পিকে দৌড়ানোর জন্য ফিট হয়ে যাবে! বলাগড়ের কাঠের ডিঙি নৌকা এবার জি আই ট্যাগ পেয়েছে। ব্যস, ফেসবুকের নিউজফিড থেকে শুরু করে কাগজের রোববারের পাতা—সব জায়গায় নস্টালজিয়ার বন্যা বয়ে যাচ্ছে। বলাগড় নাকি বাংলার গৌরব, নদীমাতৃক সভ্যতার শেষ গল্প! কিন্তু মুশকিল হলো, এই তুমুল রোমান্টিক হুল্লোড়ের মধ্যে আমরা একটা অতি সহজ বাস্তব গুলিয়ে ফেলছি—নৌকাটা একটা জিনিস হতে পারে, কিন্তু সেটা যারা হাতুড়ি পিটিয়ে বানায়, তারা রক্তমাংসের মানুষ। আর সেই মানুষের পেটের খিদের সাথে জি আই ট্যাগের গ্ল্যামারের দূরত্বটা ঠিক কতটা, সেটা বোঝার জন্য কোনো বড় বিজ্ঞানী হওয়ার প্রয়োজন পড়ে না।
আসল টাকা আর মহাজনী খেলা
একটু খতিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, বলাগড়ের এই নৌকা তৈরির ইতিহাস আসলে কোনো মিষ্টি পল্লীগীতি নয়, ওটা আসলে একটা নিখাদ শ্রেণী সংগ্রামের ইতিহাস। সেই সুদূর অতীতকাল থেকে সমীকরণটা খুব পরিষ্কার ছিল। নদীর জল সবার হতে পারে, কিন্তু জলের ভেতরের ব্যবসাটা কতিপয় মানুষের বাপের সম্পত্তি। নৌকা বানাতেন যে সূত্রধর বা রাজবংশী কারিগররা, তাঁরা চিরকালই থেকে গেলেন ব্যবস্থার সবচেয়ে নিচে, ওই জলের তলার পলিমাটির মতো। কারিগরের কাছে ছিল শুধু হাতের কাজ, কিন্তু পুঁজি ছিল না। শাল-সেগুন কাঠ কেনার পয়সা যার নেই, সে যতই বিশ্বকর্মার আপন ভাগ্নে হোক না কেন, মহাজনের দয়ার ওপর তাকে বাঁচতেই হবে। ব্যবসার চাবিকাঠিটা রয়ে গেল সেই ধনী পুঁজিপতিদের হাতেই। কারিগররা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে নৌকা বানালেন, তার লাভের মোটা টাকা চলে গেল মহাজনের সিন্দুকে, আর কারিগরের কপালে জুটল যৎসামান্য দৈনিক মজুরি। এটাকে যদি আপনারা শোষণ না বলে 'ঐতিহ্যের ধরে রাখা' বলতে চান, তবে আমার কিছু বলার নেই।
চলবে
Comments :0