editorial

রাষ্ট্রের পায়ে পিষ্ট মানুষ

সম্পাদকীয় বিভাগ

রাষ্ট্রবাদী দল পরিচালিত ডাবল ইঞ্জিনের সরকার উন্নয়নের নামাবলী গায়ে জড়িয়ে রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী ও আধিপত্যকামী কদর্য চেহারার প্রকাশ ঘটাচ্ছে একের পর এক জনবিরোধী পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে। দেশের সাধারণ মানুষের সেবায় রাষ্ট্রকে নিয়োজিত না করে মানুষকেই রাষ্ট্রের দাসত্ব শৃঙ্খলে শৃঙ্খলিত করতে চাইছে। উন্নয়নের নামে, সৌন্দর্য বৃদ্ধির নামে গরিব মানুষের রুটি-রুজির ন্যূনতম সংস্থানটুকুও ক্ষমতার গগনস্পর্শী দম্ভে বলপূর্বক কেড়ে নিতে চাইছে। রাষ্ট্র নামক শোষণ-নিপী‍‌ড়নের এক যান্ত্রিক কাঠামোকে নিমর্মভাবে ব্যবহার করে গরিবের অধিকার কাড়ছে। প্রতিবাদ করলে বা বাধা দিলে বুলডোজারের আঘাতে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে গরিবের বেঁচে থাকার শেষ পুঁজিটুকুকেও।
আরএসএস-বিজেপি হিন্দুত্ববাদের গেরুয়া ঝান্ডা উড়িয়ে যে স্বৈরতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে রাষ্ট্রবাদের বেদীতে সেখানে গণতন্ত্রের কণ্ঠস্বর ক্ষীণ, বাক্‌-স্বাধীনতা অপহৃত, বিরোধিতা বা প্রতিবাদ করা অপরাধ বলে সাব্যস্ত। ধর্মান্ধতার আড়ালে হিন্দুত্ববাদ ফ্যাসিস্ত ব্যবস্থাকেও পোক্ত করতে চাইছে। ফ্যাসিস্তদের মতই জনদরদি সেজে, সাধারণ মানুষের যাবতীয় সমস্যা সমাধানের মোহময়ী প্রতিশ্রুতি দিয়ে, দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদের উন্মাদনা তৈরি করে এরা ভোটে মানুষকে মুগ্ধ করেছিল। ভোটে জেতার পর ভালো মানুষের খোলস থেকে আসল ফ্যাসিস্ত চেহারাটা একটু একটু করে বার করছে।
রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর এক মাস কাটতে না কাটতেই নানা রকম শর্তের জালে অন্নপূর্ণা যোজনার প্রাপক সংখ্যা অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ছেঁটে ফেলতে চাইছে। ভোটের আগে প্রতিশ্রুতি থাকলে বেকার ভাতা নিয়ে এখনো কোনও উচ্চবাচ্য নেই। একই প্রক্রিয়ায় চালু অন্যান্য কল্যাণকর প্রকল্পের প্রাপক ছাঁটাই করার চক্রান্ত চলছে। কৃষকদের থেকে সরাসরি ফসল কেনার পরিমাণ কমানোর কথা ইতিমধ্যেই ঘোষিত হয়েছে। রেশন বণ্টনেও ব্যাপক রদবদল ও ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনা আছে। সীমান্তে নজরদারির কাজে বিএসএফ-কে দেওয়া হচ্ছে বিপুল জমি। রেল সহ নানা সরকারি প্রকল্পে জোর করে নেওয়া শুরু হয়েছে গরিব কৃষকের জমি। তাদের বিকল্প রোজগার এবং জমির উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ নিয়ে কোনও কথা নেই। একইভাবে বৃহৎ কর্পোরেটের জন্য চিহ্নিত হচ্ছে শত শত একর জমি। কর্পোরেট মুনাফার জন্য গরিব মানুষ ভিটে মাটি ছাড়া হবেন, তাদের রোজগার বন্ধ হবে। সরকার দায় নেবে না। এটাই রাষ্ট্রবাদী আর ক্ষমতাবাদীদের উন্নয়নের মডেল।
রেল স্টেশন, রেল চত্বর, রেলের জমি থেকে চরম নৃশংসতার মাধ্যমে বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে উচ্ছেদ হচ্ছে হকার। রেলের জায়গা গরিব হকারদের পেটের ভাত জোগাড়ের জন্য নয়, সেখানে কর্পোরেট বিপণন ব্যবস্থা হবে। উচ্চ মূল্যের ব্রান্ডেড পণ্য বিক্রি হবে। গরিব মানুষ মরবে কি বাঁচবে দেখার দায় সরকারের নেই। সরকার বড়লোকের জন্য ঝাঁ চকচকে স্টেশন বানাবে। সেখানে বড় ব্যবসায়ীদের শপিং মল থাকবে। অর্থাৎ বিত্তবানদের জন্যই উন্নয়ন হবে। শিলিগুড়ি থেকে দিল্লি বুলেট ট্রেন ছুটবে। কারা চড়বে? বড়লোকরা। তার জন্য জমি হারাবে গরিব কৃষক। রুজি হারাবে হকার। ভিটে মাটি হারাবে গরিব মানুষ।
বৃহত্তর স্বার্থে উন্নয়নের জন্য এমন অনেক ক্ষয়ক্ষতি হতেই পারে। কিন্তু যেকোনও গণতান্ত্রিক ও মানবিক সরকারের কর্তব্য যেসব প্রান্তিক মানুষ ক্ষতির শিকার, রুজি হারা তাদের জন্য বিকল্প রুজির বন্দোবস্ত করা। বিত্তবান কর্পোরেটপন্থী সরকার তাতে নারাজ। গরিব মরুক, ভেসে যাক। তা না হলে আদানি-আম্বানিরা দেশের মালিকানা নেবেন কি করে।

Comments :0

Login to leave a comment