সাধারণ শিল্প-বাণিজ্য ক্ষেত্রের সর্বত্র বেসরকারিকরণ অনেক আগেই হয়ে গেছে। এতকাল যেসব ক্ষেত্রে শুধুমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই বিরাজ করতো সেখানে নীতি ও আইন বদলে বেসরকারি পুঁজিকে ঢুকিয়ে বাজার দখল ও মুনাফার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। এমন কি দূরে সরিয়ে রাখা হয়নি বিদেশি পুঁজিকেও। কয়লা, ইস্পাত, খনি, বিদ্যুৎ, টেলিকম ইত্যাদি যেখানে ছিল রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার দাপট এখন সেখানে বেসরকারি কর্পোরেটেরই সর্বাধিপত্য। বেসরকারিকরণের ঢালাও ব্যবস্থাপনায় দেশের নিরাপত্তা, ট্র্যাটেজিক গুরুত্বের ক্ষেত্রগুলিকেও ছাড় দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই ঢুকে পড়েছে দেশের প্রায় সবকটি শীর্ষ কর্পোরেট। আদানি, আম্বানি, টাটা, মাহিন্দ্রা-সহ ডজন খানেক দেশীয় সংস্থা বিদেশি বহুজাতিকের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগ তৈরি করে যুদ্ধ বিমান, ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র সহ যাবতীয় যুদ্ধ সরঞ্জাম তৈরির আয়োজন করেছে। মোদী সরকার তাদেরকে বরাতও দিয়ে দিচ্ছে। অতি জাতীয়তাবাদী ও অতি দেশপ্রেমিক সরকার চোখ বুজে দেশের নিরাপত্তার বিষয়টাও কার্যত বেসরকারি পুঁজির মুনাফার স্বার্থে উৎসর্গ করে দিয়েছে।
বাকি ছিল মহাকাশ ক্ষেত্র। ২০২৩ সালে নতুন মহাকাশ নীতি ঘোষণা করে মহাকাশ ক্ষেত্রে বেসরকারি সস্থার অনুপ্রবেশের রাস্তা খুলে দেওয়া হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থা ইসরোর আর একচ্ছত্র আধিপত্য থাকবে না। সেখানে বেসরকারি সংস্থা কাজ করবে। উপগ্রহ সহ অন্যান্য উৎক্ষেপণের খরচ কমানো, মহাকাশ অভিযানে বেসরকারি সংস্থাকে মুনাফার সুযোগ করে দেওয়াই মহাকাশ ক্ষেত্রকে বেসরকারিকরণের মূল লক্ষ্য।
এই নীতি ঘোষণার পর দ্রুত স্টার্ট আপ কোম্পানি নথিভুক্ত হতে থাকে। ইসরোর সঙ্গে একদা সরকারি বা পরোক্ষে যুক্ত গবেষক, ইঞ্জিনিয়ার ও প্রযুক্তিবিদরা যুক্ত হতে থাকেন এইসব স্টার্ট আপ সংস্থার সঙ্গে। প্রধানত সরকারি উৎসাহে ইসরোর সাহায্য-সহযোগিতার মধ্যে দিয়ে বাড়তে থাকে বেসরকারি সংস্থাগুলি। কয়েক মাস আগে জানা যায় শতাধিক অভিজ্ঞ বিজ্ঞানী ইসরো ছেড়ে চলে গেছেন। অভিযোগ আগের মতো বন্ধুত্বপূর্ণ কাজের পরিবেশ নেই। সময়সূচি মতো প্রকল্প শেষ হচ্ছে না। সময় মতো ছাড়পত্র মিলছে না। সিদ্ধান্ত গ্রহণে অতিকেন্দ্রিকতা। সরকারি সংস্থার ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
গত কয়েক বছর ধরে বেসরকারি সংস্থার দ্রুত সামনে আসা এবং ইসরোর কাজে শিথিলতার আবহে স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে প্রথম বেসরকারি সংস্থা সফলভাবে উৎক্ষেপণ সম্পন্ন করে। যদিও এই সাফল্যের পেছনে সিংহভাগ অবদানই ছিল ইসরোর। ইসরোর সার্বিক সাহায্য ছাড়া একাজ কখনোই সম্ভব ছিল না। এমন আবহে ইসরোর কর্মীদের অজানা আশঙ্কা দানা বাঁধতে থাকে। তারা অনুমান করেন অন্যান্য বিখ্যাত রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার মতোই ইসরোকে গুটিয়ে ফেলা হবে। টেলিকম ক্ষেত্রে বিএসএনএল-র মতো হাল হবে ইসরোর। এমন আশঙ্কা থেকেই ইসরোর পাঁচ হাজার কর্মী-বিজ্ঞানী চিঠি লিখে ইসরোর ভবিষ্যৎ নিয়ে অবস্থান জানতে চেয়েছেন। জবাবে ইসরো কর্তৃপক্ষ যা বলেছেন তাতে আশঙ্কার নিরসন হচ্ছে না। আসলে গোটাটাই সরকারি নীতি ও অবস্থান। ইসরোর ভবিষ্যৎ ইসরোর কর্তৃপক্ষ ঠিক করে না। সরকারের নীতি ও পদক্ষেপ অনুযায়ী ইসরো পরিচালিত হয়। সরকারে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না থাকায় এবং ক্রমাগত বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রমাণ করে সরকার ইসরো নিয়ে বেশি কিছু ভাবতে রাজি নয়। ইসরোর কাজের পরিসর ছোট করে নামমাত্র সংস্থা হিসাবে রেখে দিয়ে বেসরকারি সংস্থাকেই গোটা পরিসরটা ছেড়ে দিতে চায়। অর্থাৎ ইসরোকে স্বাভাবিক মৃত্যুর দিকেই ঠেলে দেবার ব্যবস্থা।
Editorial
আর এক বিএসএনএল হতে যাচ্ছে ইসরো
×
Comments :0