নতুনপাতা
বইকথা
ডিরোজিও-চর্চায় একটি মহাকাব্যিক প্রয়াস
পল্লব সেনগুপ্ত
৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
রবীন্দ্রনাথের ‘ভাইফোঁটা’ গল্পে ডিরোজিওর একটি প্রসঙ্গ আছে : তাঁর ছাত্র সনাতন দত্ত (সম্ভবত কবির কল্পিত চরিত্র) না কি একই সঙ্গে সুরা এবং সত্য— এই দুয়ের প্রতি সমান নিষ্ঠাবান ছিলেন— এমনই একটা বর্ণনা আছে ওই গল্পের শুরুতেই। কথাটা উল্লেখ করছি এই কারণে যে, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও এদেশে নতুন যুগের অন্যতম মুখ্য আলোক দিশারি ওই বাইশ বছরের তরুণের মূল্যায়নে পুরোপুরি সুবিচার করেননি সেইটে বোঝাতেই।
ডিরোজিওর সম্পর্কে একটা সময় পর্যন্ত আমাদের পূর্বজদের ওই রকমেরই অসম্পূর্ণ কোনও মূল্যায়নের প্রবণতা ছিল। অথচ, ১৯ শতক থেকে এদেশের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক জীবনে যে নতুন দিগ্বলয় উদ্ভাসিত হয়, তার দিগ্দ্রষ্টা হিসাবে রামমোহন ও বিদ্যাসাগর ছাড়া ডিরোজিওর যে একটা খুব বড় ভূমিকা ছিল, সেটা ভুলে যাওয়াটা অবশ্য ঐতিহাসিক ভ্রান্তি,... এই অপহ্নবি ভাবনার মোচন হয় সর্বপ্রথম শিবনাথ শাস্ত্রীর হাতে। তারপরে ক্রমে ক্রমে সুশোভন সরকার যোগেশচন্দ্র বাগল, রাধারমণ মিত্র, বিনয় ঘোষ, অমর দত্ত, সুরেশচন্দ্র মৈত্র, সুবীর রায় চৌধুরি, (কুণ্ঠিতভাবেই বলি এই অকিঞ্চন আলোচকও) নানা ভাবে তাকে নিয়ে অন্বেষণ ও বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ডিরোজিও-চর্চায় নিবেদিত প্রাণ, ওই পূর্বতনদের পরে এসে-দাঁড়ানো যে- নিবিষ্ট গবেষক ডিরোজিয়ানাকে বস্তুত পক্ষে একটি বিদ্যাশৃঙ্খলা হিসাবেই গড়ে তুলেছেন— তিনি শক্তি সাধন মুখোপাধ্যায়। ‘ডিরোজিও ও বৃক্ষ’ তাঁর সেই নিবিড় ও গভীর শ্রম সাধনার লব্ধ ফল।
শক্তিসাধন সুদীর্ঘকাল ধরে ডিরোজিও-ও- তার সময়কাল নিয়ে গবেষণায় রত আছেন তিনি নিজে ইউরোপীয় রেনেসাঁসের বিশেষজ্ঞ। পাশ্চাত্য দেশের ওই নবজাগরণ এবং এদেশের ১৯ শতকের আধুনিকতার উদ্ভাসের মধ্যে তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন তাঁর এই ডিরোজিও কেন্দ্রিক গবেষণায়। ডিরোজিও এবং তার প্রাসঙ্গিক বেশ কয়েকটি বইও লিখেছেন শক্তিসাধন। ‘ডিরোজিও বৃক্ষ’ হলো সেই সবগুলি গবেষণা গ্রন্থের বক্তব্য-ও-তথ্যের সুসমন্বিত বিন্যাস। বিশাল এই বইটিতে তথ্য এবং তাদের ঐতিহাসিক নিরিখে সুন্দর বিশ্লেষণ এমনভাবেই করা হয়েছে যে, স্বচ্ছন্দে একে সমালোচনার পরিভাষায়, হেনরি ডিরোজিও কনকর্ড্যান্স আখ্যা দেওয়াই যায়। অসংখ্য মানুষের সঙ্গে আলোচনা, বহু গ্রন্থাগার এবং মহাফেজ খানায় দিনের পর দিন একনাগাড়ে অন্বেষণ এবং পূর্বসূরিদের চিন্তাভাবনার পুনর্মূল্যায়ন— এই সব কিছুর ফলশ্রুতি এ বই। অজস্র ছবি নথিপত্রের প্রামাণ্য চিত্র এবং বহু বছর ধরে পড়া বই ও পত্রপত্রিকায় প্রাপ্ত তথ্য ও তার বিশ্লেষণ নিয়ে, শক্তি সাধন তাঁর এই গবেষণাকে সমৃদ্ধ করেছেন। ডিরোজিওর নিজের লেখা কবিতা এবং নিবন্ধ বহুল সংখ্যায় এতে যেমন সংকলিত, তেমনি আবার পূর্বসূরিদের অনূদিত কিছু কবিতা সম্ভারও এর মধ্যে সাজিয়ে দিয়েছেন শক্তিসাধন।
এটা ঠিকই যে, ডিরোজিও-ও-তাঁর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মানুষ ও তথ্যের যত যা সংগ্রহ করেছেন লেখক, তার সবই এতে নেই। কিন্তু আগে তিনি যত কিছু বিস্তৃতভাবে সংকলন ও প্রতিবেদন করেছেন পূর্বতন বই ও প্রবন্ধগুলিতে, তাদের সারনির্যাস সেখানে সঞ্চিত আছে। ফলে ডিরোজিওর বিষয়ে সম্পূর্ণ অনবহিত পাঠকও এই বই থেকে তার সম্পর্কে একটা পরিপূর্ণ এবং স্বচ্ছ ধারণা গড়ে নিতে পারবেন।
শক্তিসাধন ডিরোজিওর পরিবারের সামগ্রিকভাবে পরিচয় দিয়েছেন শুরুতেই। ঠিক কোন সূত্রে যে এই পর্তুগিজ পরিবারের সঙ্গে ভারতীয়ত্ব অবিচ্ছেদ্যভাবে বাধা পড়েছিল, তার বিশ্লেষণ সেরে, ডিরোজিওর ছাত্র জীবন, কর্মজীবনের শুরু, পারিবারিক পরিবেশ, হিন্দু কলেজের ছাত্রদের নিয়ে আধুনিক জ্ঞান-ও-মানসিকতার উদ্ভাসন, আর তার পরিণামে রক্ষণশীল সমাজপতিদের দ্বারা বিপন্ন হওয়া এবং সঙ্গে সঙ্গেই নতুন এক ইতিহাসের দিশা দেখানো— এত সবকিছু স্তরে-স্তরে আলোচিত হয়েছে এই বইতে। সুবিস্তৃত এইসব তথ্যনিষ্ঠ আলোচনার পরে ডিরোজিওর মনন এবং সাহিত্য সৃষ্টি নিয়েও সমান গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন শক্তি সাধন। আর তারপরে, সমকালে ও উত্তর কালে ডিরোজিওর সম্পর্কে যে বৈধ মনোভাব ছিল সাহিব ও নেটিভ সমাজে, তারও ইতিহাসনিষ্ঠ বিবরণ দিয়ে বইকে পরিপূর্ণ করেছেন বিদগ্ধ এই লেখক।
অভিনিবেশ না নিয়ে পড়লে এই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বইয়ের পূর্ণায়ত বিচার করা সম্ভব নয়। বইটা উনিশ শতকের বাংলার সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক ক্রমবিকাশকে উপলব্ধি করার ক্ষেত্রে এক অপরিহার্য পাঠ্যরূপে প্রতীত হবে যে এ নিয়ে দ্বিধার অবসর নেই। হয়তো বিশদতর সংকেত পাওয়া যেতো কোনও কোনও ক্ষেত্রে, যা মনে করি, ভবিষ্যতের সংস্করণে শক্তি সাধন দিয়ে দেবেন। ওই তথাকথিত ফিরিঙ্গি তরুণই যে এদেশে সর্বপ্রথম ভারতীয়ত্বের উপলব্ধি সঞ্চারিত করতে চেয়েছিলেন, পাশ্চাত্য ভূমির বিদ্যা এবং এদেশের জ্ঞান চর্চার ঐতিহ্যকে সমন্বিত করার দিশা দেখিয়েছিলেন, সতীদাহ প্রথার বিরুদ্ধে তিনিও যে তীব্র আক্রমণ করেছিলেন আর সেই যুগে বসেও হিন্দু মুসলিমের মধ্যে প্রেম ও মিলনের কথা বর্ণনা করেছিলেন, বিধবা মেয়ের বেদনায় তিনিও ব্যথিত হয়ে সংবেদনশীল হয়েছেন এসবই লেখক তুলে ধরেছেন তবে এগুলো আরও স্পষ্ট রঙে আঁকলে পাঠক হিসাবে আরো কিছু পরিতৃপ্তি লাভ করতাম হয়তো
কবি শঙ্খ ঘোষ এই বইয়ের নামকরণের প্রেরণাদাতা— লেখক বলেছেন। সার্থক নামকরণ ডিরোজিওকে বিশাল মহীরূহ রূপে কল্পনা করে দেশ, জাতি, সমাজ ও সংস্কৃতির পরিব্যাপ্ত শাখাপত্রালির পরিচয়বাহী এই বইয়ের বোধ হয় এর চেয়ে বেশি মানানসই অন্য কোনও নাম হওয়া সম্ভব ছিল না!
‘ডিরোজিও বৃক্ষ’
শক্তি সাধন মুখোপাধ্যায়। দে’জ পাবলিশিং, কলকাতা ৮০০ টাকা।
Comments :0