বৃন্দা কারাত
গত সপ্তাহে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) দুটি শাখা, জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চ (জেএসএম) এবং বনবাসী কল্যাণ আশ্রম, দিল্লিতে ‘জনজাতি সাংস্কৃতিক সমাগম’ নামে একটি সম্মেলনের আয়োজন করে। সেই সম্মেলনে সারা দেশের কয়েক হাজার আদিবাসী অংশগ্রহণ করেন। কিংবদন্তি বিরসা মুণ্ডার ১৫০তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে এই সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
বস্তুত সরকারি ব্যবস্থাপনায় হয়েছে এই সম্মেলন। রেল মন্ত্রক থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় মন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে সেই সত্য প্রকাশ করে দিয়েছেন আয়োজকরাই।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ প্রধান অতিথিও ছিল। ফলে অনুষ্ঠানটি কার্যত আধা-সরকারি একটি সম্মেলনের চেহারা নেয়। ঠিক সেই কারণেই, এই সম্মেলনের বিভিন্ন বক্তৃতা, উত্থাপিত দাবি এবং সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তব্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জেএসএম’র মূল লক্ষ্য হলো খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের সমস্ত সরকারি তালিকা থেকে বাদ দেওয়া। সেই সঙ্গে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষা কেড়ে নেওয়া। এই সংগঠনটি মধ্য ভারতের বেশ কয়েকটি রাজ্যে, বিশেষ করে ছত্তিশগড়ে, খ্রিস্টান ধর্মে ধর্মান্তরিত আদিবাসী পরিবারগুলিকে লক্ষ্য করে বারবার আক্রমণ চালিয়েছে। এমনকি আদিবাসী গ্রামগুলিতে খ্রিস্টান আদিবাসীদের ব্যক্তিগত মালিকানাধীন জমি থেকে কবর খুঁড়ে জোর করে মৃতদেহ তোলা হয়।
এই বছরের ফেব্রুয়ারিতে, ভারতের সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন একটি মামলায়, আদালত এই ধরনের কবর খুঁড়ে দেহ তোলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। তবুও, ভারতীয় জনতা পার্টির রাজ্য সরকারগুলির মদতে এই ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে।
একটি মৌলিক পার্থক্য
ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের সরকারি তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার দাবি নতুন করে জোরালো হওয়ার পিছনে রয়েছে সুপ্রিম কোর্টের সাম্প্রতিক একটি রায়। এই রায়ে ১৯৫০ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশকে সামনে রেখে ধর্মান্তরিত হলে তফসিলি জাতির মানুষকে আইনি ও সাংবিধানিক অধিকারের আওতা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
ওই আদেশ অনুযায়ী হিন্দু ধর্মাবলম্বী না হলে তফসিলি জাতিভুক্ত হলেও সাংবিধানিক বা আইনি সুবিধা পাবেন না।
জেএসএম’র দাবি হলো, এই নিয়ম আদিবাসীদের জন্যও চালু করা হোক। জেএসএম’র নেতারা ওই সম্মেলনে বলেছেন যে ‘সংবিধানের দুর্বলতা দূর করার জন্য’ আদিবাসীদের জন্যও এই নিয়ম চালু করা দরকার।
জেএসএম যাকে সাংবিধানিক দুর্বলতা বলে মনে করছে, তা আসলে একটি সংবিধান বর্ণিত একটি বিশেষ পার্থক্য। ভারতের সংবিধান বা আইন মোতাবেক তফসিলি জাতির অন্তর্ভুক্ত মানুষদের ক্ষেত্রে তাঁদের জাতিগত পরিচয় তাঁদের ধর্মের সঙ্গে সংযুক্ত বলে মনে করা হলেও আদিবাসীদের ক্ষেত্রে তা মনে করা হয় না।
সম্মেলনের মঞ্চে বিরসা মুণ্ডার ছবি সহ ‘ভারত মাতা’-র একটি ছবিও রাখা ছিল। পাশাপাশি প্রয়াত কার্তিক ওরাওঁয়ের একটি প্রতিকৃতিও রাখা হয় সন্মেলন মঞ্চে। কার্তিক ওরাওঁ ছিলেন কংগ্রেসের একজন সাংসদ যিনি একবার একটি আদিবাসী সংরক্ষিত আসনে ওরাওঁ সম্প্রদায়ের দু’জন সদস্যের প্রার্থীপদকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন। তাঁর যুক্তি ছিল ধর্মান্তরিত বলে সেই ব্যক্তিরা আদিবাসী সংরক্ষিত পদে প্রার্থী হওয়ার যোগ্য নন। পাটনা হাইকোর্ট ১৯৬৩ সালের রায়ে তাঁর আবেদনটি পুরোপুরি খারিজ করে দেয়। আদালত এই মর্মে রায় দেয় যে আদিবাসীদের পরিচয় ধর্মভিত্তিক নয়। এটি জাতিগত ও গোষ্ঠীগত সম্পর্কের বন্ধনের উপর নির্ভর করে। বলা হয়, ‘একজন ওরাওঁ হিন্দু, খ্রিস্টান বা বৌদ্ধ যাই হোন না কেন, তিনি ওরাওঁ-ই থাকেন।’ হাইকোর্টের আরও পর্যবেক্ষণ ছিল যে ধর্মান্তরিত হলেও আদিবাসীরা তাঁদের গোষ্ঠীর উৎসব ও অনুষ্ঠানেই অংশ নেন। এই রায়টিই এখন পর্যন্ত প্রচলিত আইনি ব্যাখ্যা হিসাবে রয়ে গেছে। জেএসএম এটি বাতিল করতে চায়। তা করার জন্য তারা যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে তা হাড়হিম করা এবং অত্যন্ত নিষ্ঠুর। ধর্মান্তরিত পরিবারগুলিকে তাঁদের সম্প্রদায়ের থেকে বিচ্ছিন্ন করে, জোর করে তাঁদের সম্প্রদায়ের উৎসবে যোগদানে বাধা দেওয়া এবং তারপর সেই জবরদস্তিমূলক বর্জনকেই ধর্মান্তরিতদের আদিবাসী সংস্কৃতি ত্যাগের প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করে ঐতিহ্যবাহী গ্রামসভাগুলো থেকে তাদের বহিষ্কারকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। প্রথমে বর্জনের বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে ঘটানো, তারপর সেটিকে প্রমাণ হিসাবে উপস্থাপন করার- এই নির্মম কাজটিই দীর্ঘ দিন ধরে করে চলেছে জেএসএস।
‘সনাতন পরিবারে অন্তর্ভুক্তির‘ অভিযান
জেএসএম এই দাবিটি জোরালোভাবে প্রচার করে চলেছে যে, আদিবাসীরা বৃহত্তর ‘সনাতন পরিবার‘-এরই অংশ। এই সম্মেলনে সংগঠনটির জাতীয় আহ্বায়ক বলেছেন, ‘‘তারা বলে আদিবাসীরা হিন্দু নয়। এ কেমন খেলা? আমরা রামের সন্তান— এটি আমাদের বিরুদ্ধে একটি ষড়যন্ত্র।’’ আরেকজন নেতা ঘোষণা করেন যে, ‘‘আদিবাসীরা সনাতন নামক বিশাল বৃক্ষের ছায়াতেই রয়েছে।’’
ধর্মান্তরিতদের জন্য জেএসএম-এর ‘ঘর ওয়াপসি’ (ঘরে ফেরা)-র পদ্ধতিটি অত্যন্ত স্পষ্ট— এই অনুষ্ঠানগুলিতে আদিবাসী প্রতীক ব্যবহার করা হয় না। তার বদলে হিন্দুত্ববাদী প্রতীক দ্বারাই চিহ্নিত করা হয়। জেএসএম’র দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী আদিবাসীরা হলো ‘বনবাসী’ অর্থাৎ অরণ্যের বাসিন্দা জনগোষ্ঠী। তাঁরা ভগবান রামের সেবক হিসাবে হিন্দু উচ্চবর্ণের দেব-দেবীদের অধীনস্ত এবং তাদের মুক্তি কেবল সেই দেব-দেবীদের আশীর্বাদের মাধ্যমেই সম্ভব। আদিবাসী গ্রামগুলোতে হিন্দু দেব-দেবীর মূর্তি সংবলিত মন্দির নির্মাণ, স্থানীয় দেব-দেবীদের বিষ্ণু, শিব বা দুর্গারই ভিন্ন রূপ হিসাবে নতুন করে উপস্থাপন এবং গ্রামের প্রবেশপথে হনুমানের মূর্তি স্থাপন— এই সবই হলো এই আধিপত্যবাদী অন্তর্ভুক্তিকরণ অভিযানেরই অংশ।
সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আদিবাসীরা তাদের ধর্ম বেছে নেওয়ার পূর্ণ অধিকারী, যা ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়। ‘প্রতারণামূলক’ ধর্মান্তরকরণ রোধের জন্য একাধিক আইন রয়েছে, যার মধ্যে কিছু আইন অত্যন্ত কঠোর। আদিবাসীরা হিন্দু, খ্রিস্ট বা অন্য যে কোনও ধর্ম বেছে নিতে পারেন। কিন্তু একজন আদিবাসী রাম বা যিশুর উপাসনা করেন কিনা তার সঙ্গে আদিবাসী হিসাবে তাঁর পরিচয়ের কোনও সম্পর্ক নেই; এটি একটি মৌলিক সাংবিধানিক নীতি। এই নীতির বিকৃতি ঘটিয়ে ধারণা দেওয়া হচ্ছে, যে আদিবাসী রামের উপাসনা করেন তিনি আদিবাসী সংস্কৃতির সঠিক অনুগামী। কিন্তু যিনি যিশুর উপাসনা করেন তিনি বিশ্বাসঘাতকতা করছেন। এই বক্তব্য মেনে নেওয়া যায় না। আদিবাসীরা দীর্ঘদিন ধরেই তাদের বিশ্বাসের স্বাতন্ত্র্য, প্রকৃতির উপাসনা, তাদের সর্বপ্রাণবাদী ঐতিহ্য ও প্রথার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির জন্য দাবি করে আসছেন। উদাহরণস্বরূপ, ঝাড়খণ্ড বিধানসভা আদিবাসীদের নিজস্ব বিশ্বাস নথিভুক্ত করার জন্য জনগণনায় ধর্মবিশ্বাস সংক্রান্ত গণনার ক্ষেত্রে একটি পৃথক কলাম রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে, যা সারা দেশের আদিবাসী বুদ্ধিজীবী এবং অসংখ্য সংগঠন বারবার দাবি জানিয়েছে। কিন্তু সরকার আদিবাসী বিশ্বাসকে অপমান করে বিষয়টি অন্যায়ভাবে উপেক্ষা করে গিয়েছে।
আদিবাসীদের গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা
জেএসএম’র প্রচারকে আজকের সময়ের ‘উলগুলান’ আখ্যা দিয়ে এই সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী অ্যা জেন্ডাকেই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ আরও এক ধাপ এগিয়ে সমর্থন করেছেন। বিরসা মুণ্ডার উলগুলান ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে একটি বিদ্রোহ। উল্লেখযোগ্য যে, তিনি খ্রিস্টান মিশনারিদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছিলেন ঠিক এই কারণেই যে, তিনি তাদের ব্রিটিশ শাসনের হাতিয়ার হিসাবে দেখতেন। অপরদিকে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী শাহের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার কখনও ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করেনি বরং তাদের সঙ্গে আপস করেছিল। ধর্মান্তরিত আদিবাসীদের বিরুদ্ধে একটি সাম্প্রদায়িক প্রচারকে বৈধতা দিতে নায়ক বিরসার নাম করে ঐতিহাসিক উলগুলানকে ব্যবহার করা আসলে ঐতিহ্যের প্রতি এক গুরুতর বিশ্বাসঘাতকতা ছাড়া কিছুই নয়। অমিত শাহ আরও ঘোষণা করেন যে সনাতনীরাও প্রকৃতি পূজারী এবং জল, জঙ্গল, পাহাড় (জল, জঙ্গল, পাহাড়) ‘আমাদের বিশ্বাসের কেন্দ্রবিন্দু’।
অমিত শাহের কথাগুলো অন্তঃসারশূন্য। শাহ যখন সন্মেলনে বক্তব্য রাখছিলেন, তখনও ওডিশার সিজিমালি ও রায়গড়ার আদিবাসী সম্প্রদায়গুলি লড়াই করছিল অমিত শাহের সরকার অনুমোদিত বক্সাইট খনন প্রকল্প থেকে নিজেদের পবিত্র পর্বতকে বাঁচানোর জন্য। ছত্তিশগড়ের হাসদেও অঞ্চলে হাজার হাজার আদিবাসী বছরের পর বছর ধরে তাদের বনভূমি বেসরকারি খনি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন। গ্রামসভার সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে লক্ষ লক্ষ গাছ কেটে ফেলা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে শাল ও করম গাছ। এই পবিত্র গাছগুলোকে ঘিরেই আদিবাসীরা তাঁদের উৎসব ও আচার-অনুষ্ঠান পালন করেন। দিল্লির ‘প্রকৃতি পূজারীরা’ যে প্রকৃতি ধ্বংসের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দক্ষ তা প্রমাণিত সত্য।
আদিবাসীদের সামনে বর্তমানে যে গুরুত্বপূর্ণ সমস্যাগুলো রয়েছে তার মধ্যে কয়েকটি হলো— বন অধিকার আইনের কার্যকারিতা নস্যাৎ করা, গ্রামসভার অধিকার কার্যত বিলুপ্ত করে ফেলা, ‘পঞ্চায়েত (তফসিলি এলাকা সম্প্রসারণ) আইন’ বা ‘পেসা’-র মূল উদ্দেশ্যকে বানচাল করা, সংরক্ষিত পদগুলোতে নিয়োগের ক্ষেত্রে বিপুল পরিমাণ বকেয়া বা শূন্যপদ জমে থাকা, আদিবাসী শিক্ষার্থীদের ছাত্রাবাসগুলোর শোচনীয় অবস্থা এবং বৃত্তির অর্থ প্রদানে দেরি করা এবং সর্বোপরি, আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে নাগরিক ও স্বাস্থ্যসেবা সুবিধার অব্যাহত অভাব। আর এই সমস্ত পরিস্থিতির মধ্যেও—একটি বারের জন্যও, একটিও দৃষ্টান্ত নেই যে ‘জেএসএম’ (জন সংগ্রাম মোর্চা) আদিবাসীদের এই সব অধিকার রক্ষার্থে সোচ্চার হয়েছে। বিশেষ করে সেইসব কর্পোরেট আগ্রাসনের বিরুদ্ধে, যা সরকারের প্রত্যক্ষ মদতে আদিবাসীদের ‘জল, জঙ্গল ও জমি’ গ্রাস করে চলেছে। বরং এর ঠিক উল্টোটাই ঘটিয়ে, আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোকে ধর্মীয় বিভাজনের মাধ্যমে বিভক্ত করে, তারা সেইসব কোম্পানির স্বার্থই রক্ষা করেছে, যারা মূলত এই আদিবাসীদেরই তাদের ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ করছে। সর্বোপরি, বঞ্চনার শিকার মানুষদের নিজেদের মধ্যেই বিভেদ সৃষ্টি করাটাই শোষকদের সেই অতি-পুরানো ও চিরাচরিত কৌশল— সেই কৌশলই জেএসএম’র এই সম্মেলন এবং সেখানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বক্তৃতার পর বোঝা যাচ্ছে আদিবাসী অধিকার রক্ষার পক্ষে শামিল বিভিন্ন অংশকেই বড় লড়াইয়ে নামতে হবে। মহান আদিবাসী বীরদের চেতনাকে হাতিয়ার করে আদিবাসী আন্দোলন এবং গণতান্ত্রিক শক্তিকে অবশ্যই সেই লড়াই করতে হবে।
JSM and Adivasi Question
আদিবাসী পরিচয়, বিশ্বাসের ওপর আধিপত্যবাদী ছায়া
×
Comments :0