INFILTRATION

অবিশ্বাস, অনাস্থা, আশঙ্কার অনুপ্রবেশ

সম্পাদকীয় বিভাগ

চন্দন দাস
প্রথমে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধনী(এসআইআর) হয়েছে। প্রায় ২৭লক্ষ মানুষকে ছিটকে দেওয়া হয়েছে ভোটার তালিকা থেকে। তারপর নবগঠিত রাজ্য সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সিএএ আইন বলবৎ করার ঘোষণা করেছেন। একই সঙ্গে তিনি, শুভেন্দু অধিকারী অনুপ্রবেশকারীদের সম্পর্কে তাঁর সরকারের নীতি ঘোষণা করেছেন ‘ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট।’ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে আসামের ডিটেনশন সেন্টারের মতো রাজ্যে ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ রাখার ঘোষণাও বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী করেছেন। 
তিনটি পদক্ষেপেই একটি বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট— নির্বাচনের সময় দেওয়া বিজেপি’র ঘোষিত ‘ভয় আউট, ভরসা ইন’ নয়, সমাজে আতঙ্ক, ধর্মীয় ভেদাভেদের নামে পারস্পরিক অবিশ্বাস, অনাস্থা তৈরিই বিজেপি’র লক্ষ্য। সমাজে মানুষের মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটেছে আশঙ্কার।   
রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের তিন মাস আগে মুম্বাইতে আরএসএস’র শতবর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন সঙ্ঘের প্রধান মোহন ভাগবত। সেখানে তিনি অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে বের করার নির্দেশ দেন। ভাগবত বলেন,‘‘অনুপ্রবেশের বিষয়ে সরকারের অনেক কাজ করতে হবে। তাদের শনাক্ত করতে হবে এবং বহিষ্কার করতে হবে। আগে এটা হচ্ছিলো না, কিন্তু এখন ধীরে ধীরে শুরু হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়বে। যখন জনগণনা বা এসআইআর পরিচালিত হয়, তখন অনেক মানুষ সামনে আসে যারা এই দেশের নাগরিক নয়। তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া হয়।’’ এসআইআর এবং অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়াকে এইভাবেই একসূত্রে বেঁধে এগিয়েছে বিজেপি। রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনেও বিজেপি এই অভিমুখেই প্রচার চালিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীর ঘোষণাতেও মোহন ভাগবতের প্রতিধ্বনি। অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করা, বিচার করা এবং বিএসএফ’র হাতে তুলে দেওয়ার মতো যে ব্যবস্থা এতকাল দেশে স্বাধীনতার পর থেকে চলছে,সেই পথে হাঁটবে না সরকার। ইতিমধ্যেই এই পথে রাজ্য থেকে কয়েকজনকে বাংলাদেশে ‘পুশ ব্যাক’ করা হয়েছে।  
অনুপ্রবেশকারীদের ধরার কাজ দেশে বিজেপি কেন্দ্র কিংবা রাজ্য সরকার গঠন করার শুরু হলো, তা নয়। উদাহরণ অনেক। একটি দেওয়া যাক। লোকসভায় ২০১২-তে পি বিশ্বনাথ এবং অনুরাগ সিং ঠাকুর সংসদে অনুপ্রবেশের বিষয়ে একটি প্রশ্ন করেন। তার উত্তরে কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী মুল্লাপাল্লি রামচন্দ্রন জানান যে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ২০০৯ থেকে ২০১১, এই তিন বছরে ৪৮২৮জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অনুপ্রবেশের অভিযোগে। একই পদ্ধতিতে ২০২২ থেকে ২০২৪, এই তিন বছরে ৭২১৮জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে একই অভিযোগে, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তেই। ২০০৯-২০১১-তে ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে ১১৯জন অনুপ্রবেশকারী ধরা পড়েছিল। ২০২২ থেকে ২০২৪-এ ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে অনুপ্রবেশকারী গ্রেপ্তার হয়েছে ১৪৬জন। 
২০১২-য় যে তথ্য সংসদে পেশ হয়েছে, সেখানে দুই সীমান্তে বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তানে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করতে গিয়ে কতজন ভারতীয় ধরা পড়েছে, তার তথ্য দেওয়া ছিল। তার আগেও যতবার সংসদে এই সংক্রান্ত উত্তর সরকার পক্ষ দিয়েছে, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তারা এই ভাবেই তথ্য পেশ করেছে। জ্যোতি বসুর প্রবন্ধেও এই বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট। অনুপ্রবেশকারীদের মধ্যে ধর্মের ভিত্তিতে বিভাজনের কোনও উদ্দেশ্য যে বামপন্থীদের থাকে না, সেই তথ্য থেকে তাও স্পষ্ট। নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহর শাসনে তথ্য পেশের পদ্ধতিও তাদের লক্ষ্য অনুসারে বদলেছে। কতজন ভারতীয় অন্য দেশে অনুপ্রবেশ করতে গিয়ে ধরা পড়েছে, তার তথ্য এই আমলে মেলে না। কতজন হিন্দু অন্য দেশ থেকে ভারতে ঢুকতে গিয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন, তার কোনও তথ্য দেওয়া হয় না। আপাতদৃষ্টিতে মনে করানো হয় যে, অনুপ্রবেশকারী মানেই মুসলমান। এবং তা শুধু অন্য দেশ থেকে ভারতেই হয়।
আরএসএস’র আঙ্গিকে রাজ্য রাজনীতিতে ‘অনুপ্রবেশ’কে একটি সাম্প্রদায়িক বিভাজনের ইস্যু করে তোলার কাজ প্রথম করেছেন মমতা ব্যানার্জি। তিনিই রাজ্যে বিজেপি-কে ডেকে এনেছিলেন। তিনিই সংসদে পশ্চিমবঙ্গে অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকায় নাম তুলে সিপিআই(এম) নির্বাচনে জেতে, এই বিষয়ে আলোচনা করতে চেয়েছিলেন। সেই সময় এই প্রচার ছিল সঙ্ঘ এবং বিজেপি’র। সংসদে সঙ্ঘের এই প্রচার তুলে ধরতে না পেরে ২০০৫-এর ৪ আগস্ট সংসদের উপাধ্যক্ষ চরণজিৎ অটওয়ালকে লক্ষ্য করে কাগজের তাড়া ছুঁড়ে মেরেছিলেন। তিনি সেই সময় বলেছিলেন যে, তিনি প্রমাণ দেবেন ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত ‘বাংলাদেশি’দের। কিন্তু পারেননি। বিজেপি সেই ‘অনুপ্রবেশ’কে আতঙ্কের ইস্যু করে তুলেছে। ধাপে ধাপে তাদের হাতিয়ার হয়েছে এসআইআর, সিএএ।
অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে রাজ্যের পদক্ষেপের ভিত্তি হবে সিটিজেনশিপ অ্যামেন্ডমেন্ট অ্যাক্ট(সিএএ),২০১৯। সিএএ কী বলছে? ২০১৪-র ৩১ ডিসেম্বরের আগে বাংলাদেশ, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তান থেকে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে ভারতে চলে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, পার্সি এবং খ্রিস্টানদের শরণার্থীর মর্যাদা দেওয়া হবে। তাঁরা ভারতের নাগরিকত্ব পাবেন। বাদ কারা? মুসলমানরা। বৈধ নথি ছাড়া ভারতে বসবাসকারী মুসলিমরা শরণার্থী নন, অনুপ্রবেশকারী। এই সরকারী নীতি, আইনের ভিত্তি রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ব্যাখ্যা। সঙ্ঘের ব্যাখ্যায় যথাযথ নথি ছাড়া ভারতে বসবাসকারী মুসলমানরা অনুপ্রবেশকারী। হিন্দু সহ অন্যান্য ধর্মের মানুষ শরণার্থী।
রাজ্যের বিজেপি’র সরকার গঠিত হওয়ার দশদিনের মধ্যে সঙ্ঘের সেই নীতি অনুসারে পদক্ষেপ নিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সেই অনুসারেই বলেছেন,‘‘সিএএ আইন অনুযায়ী, সাতটি সম্প্রদায়ের মানুষ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের আওতাভুক্ত। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত যাঁরা এ রাজ্যে এসেছেন, তাঁদের পুলিশ কোনও হেনস্তা করতে পারবে না বা আটক করতে পারবে না।’’ অর্থাৎ মুসলমান ছাড়া বাকি ধর্মের মানুষের জন্য এই ব্যবস্থা। অধিকারী আরও বলেছেন, ‘‘কিন্তু যাঁরা সিএএ’র অন্তর্ভুক্ত নন, তাঁরা সম্পূর্ণ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী। তাঁদের সরাসরি রাজ্য পুলিশ গ্রেপ্তার করবে এবং বিএসএফ’র হাতে তুলে দেবে। বিজিবি’র (বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী) সঙ্গে কথা বলে তাঁদের দেশ থেকে বার করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। অর্থাৎ, ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট।’’ মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণায় যা বিভ্রান্তিকর তা হলো, সিএএ অনুসারে ‘কাট অব ডেট’ ২০১৪-র ৩১ডিসেম্বর। তা দশ বছর বাড়িয়ে দিলেন কেন শুভেন্দু অধিকারী?
আসামের ‘ডিটেনশন সেন্টার’-এর মতো এই অনুপ্রবেশকারীদের জন্য মুখ্যমন্ত্রী ‘হোল্ডিং সেন্টার’ বানানোর নির্দেশ দিয়েছেন। সেই কাজ ইতিমধ্যে শুরুও হয়েছে। অনুপ্রবেশকারীদের ধরে সেই ‘হোল্ডিং সেন্টার’-এ রাখার কাজও চলছে। কিন্তু ‘ডিটেক্ট’ বা চিহ্নিতকরণের এই একটিই পদ্ধতি নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মায় অনুপ্রাণিত। তা শুধু চা বাগানের উন্নতির ক্ষেত্রেই নয়। আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, অনুপ্রবেশকারী হিসাবে কাউকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আসামের বিজেপি সরকারের পথই অনুসরণ করতে পারে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। এসআইআর— পরবর্তী ভোটার তালিকাকে এই কাজে ব্যবহার করা হতে পারে। 
রাজ্যে এসআইআর-এ ২৭লক্ষ মানুষের নাম বাদ গেছিল। যাঁরা পশ্চিমবঙ্গের ১৮তম বিধানসভা নির্বাচনে ভোট দিতে পারেননি। অথচ তাঁদের অনেকেই আগে বিভিন্ন নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। তবু তাঁদের নাম ‘ডিলিট’ হয়েছে। কারণ, তাঁরা ‘লিগ্যাসি’ প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি বলে অভিযোগ। তাঁর বাবা, মা, ঠাকুর্দার মতো পূর্ব পুরুষদের নাম ২০০২-এর ভোটার তালিকায় ছিল, তা তাঁরা প্রতিষ্ঠিত করতে পারেননি বলে অভিযোগ। তবে শুধু তাই নয়, ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’র নামে নথিপত্রের সামান্য ত্রুটি বা নামের বানানে ভুল থাকার অজুহাতে যেভাবে লক্ষ লক্ষ বৈধ ভোটারকে ‘সন্দেহজনক’ তালিকায় ফেলে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিশেষ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করতে হয়েছে। সেই কাজ এখনও চলছে। ট্রাইব্যুনালের রায়ের পর ওই ২৭ লক্ষের যাঁরা বৈধ বলে চিহ্নিত হবেন না, তাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাবে। আসামেও প্রথম ভোটার তালিকা সংশোধনের সময় ভোটার তালিকায় ‘ডি’ ভোটার বা ‘সন্দেহজনক’ ভোটারদের চিহ্নিত করা হয়েছিল। সেখানকার পরিস্থিতি ছিল আলাদা। তবু আসামে আগে থেকে চিহ্নিত ‘ডি’ ভোটাররা জাতীয় নাগরিক পঞ্জি(এনআরসি)’র তালিকা থেকে প্রথম বাদ পড়েছিলেন। 
অনুপ্রবেশ আটকানোর কাজ বিজেপি-ই প্রথম শুরু করলো, তা নয়। অনুপ্রবেশকারীদের আটকানো, তাদের নিজের দেশে ফেরত পাঠানোর কাজ ভারতে অনেকদিন থেকে চলছে। বিজেপি ছাড়াও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি কেন্দ্র অথবা রাজ্য সরকারে থাকাকালীন এই কাজ লাগাতার করেছে। তবে অনুপ্রবেশ আটকানোর কাজ মূলত বিএসএফ’র। রাজ্য সরকারগুলি এই কাজে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা করে। এই কাজ যে দীর্ঘদিন দেশে হচ্ছে। 
তাৎপর্যপূর্ণ হলো, চীনও ভারতের সীমান্তবর্তী দেশ। তবে সেখান থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের কোনও নিদর্শন নেই। কোনও সরকারই ভারত-চীন সীমান্তে অনুপ্রবেশের কোনও তথ্য সংসদে পেশ করতে পারেননি। কারণ স্বাভাবিক। চীনের মানুষের আয় ভারত, বাংলাদেশের মানুষের আয়ের থেকে অনেক বেশি। চীন পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী, সমৃদ্ধশালী দেশ। সেখানকার মানুষ ভারতে লুকিয়ে ঢুকে কাজ করে জীবন ধারণ করার কথা ভাবতেই পারেন না। আর চীনের সীমান্ত অত্যন্ত কঠোরভাবে রক্ষা করে সেখানকার বাহিনী। 
আমাদের আলোচনা সমৃদ্ধশালী চীন নিয়ে নয়। আমাদের আলোচনা পৃথিবীর আরও দুটি অত্যন্ত পিছিয়ে থাকা দেশ নিয়ে। ২০২৫-এর ‘হাঙ্গার ইনডেক্স’-এ চীন পৃথিবীর প্রথম সারির দেশের মধ্যে। সেই তালিকায় পাকিস্তান আছে ১০৬নম্বরে, ভারত আছে ১০২ নম্বরে, আর বাংলাদেশ আছে ৮৫নম্বরে। তবে বাংলাদেশের ন্যূনতম মজুরি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ভারতের বিভিন্ন এলাকার থেকে কম। কাজের সুযোগও সেখানে তুলনামূলক কম। আমাদের আলোচনা এই দেশগুলি নিয়ে, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বাংলাদেশ নিয়ে। কারণ, রাজ্যে সম্প্রতি বিজেপি’র সরকার হয়েছে। দেশেও বিজেপি’রই সরকার। পশ্চিমবঙ্গ ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকারের টানে দেদার এগবে, এমনই প্রচার আমরা শুনেছি এবং এখনও শুনছি। তবে ‘ডবল ইঞ্জিন’ সরকার তার কাজ শুরু করেছে অনুপ্রবেশ প্রশ্নে ‘জিরো টলারেন্স’-এর ঘোষণার মাধ্যমে। কিন্তু অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে বামপন্থীরা কখনও দুর্বলতা দেখায়নি। তারাও অনুপ্রবেশ রুখতে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষপাতী। কিন্তু তার জন্য সারা দেশে আতঙ্ক, ধর্মীয় ভেদাভেদ তৈরি করা, মূল সমস্যাগুলি থেকে নজর ঘুরিয়ে দেওয়ার তারা বিরোধী।
দেশান্তর পৃথিবী জুড়ে দেখা যাচ্ছে। কাজের সন্ধান, উপার্জনের লক্ষ্য, শান্তি— এসবই দেশান্তরের কারণ প্রধানত। কিন্তু ভারত আর সংলগ্ন দেশগুলির দেশান্তরীদের স্বাভাবিক গন্তব্য নয়। হিন্দুই হোক কিংবা মুসলিম— ভিনদেশে জন্মানো ভারতে থাকা মানুষের সংখ্যা লাগাতার কমছে। ২০০১-র জনগণনা অনুযায়ী, দেশে তখন ৬১ লক্ষ মানুষ ছিলেন যারা ভিন দেশে জন্মেছিলেন। মোট জনসংখ্যার তুলনায় তা ছিল মাত্র ০.৬ শতাংশ। ২০১১-র জনগণনায় এই শতাংশ হয়েছে ০.৪ শতাংশ। এদের মধ্যে শুধু বাংলাদেশের মানুষই আছেন, তা নয়। শ্রীলঙ্কা, নেপালের মানুষও আছেন। সামান্য পাকিস্তানের মানুষ। সব মিলিয়ে এদেশে আসা লোকের সংখ্যা কমছে।
বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী অমিত শাহ্‌ থেকে শুভেন্দু অধিকারী, প্রত্যেকে ‘অনুপ্রবেশ’কে প্রধান ইস্যু করেছেন। প্রধানমন্ত্রী দাবি করেছেন যে, অনুপ্রবেশের জন্য পশ্চিমবঙ্গের যুবকরা রাজ্যে কাজ পাচ্ছেন না। রায়দিঘীতে বলেছেন, মৎস্যজীবীরা মাছ পাচ্ছেন না অনুপ্রবেশকারীদের জন্য। কাজের অভাব, আর্থিক মন্দার মতো সমস্যা, যা মূলত কেন্দ্রীয় সরকারের নীতির কারণে মারাত্মক সঙ্কট হিসাবে দেখা দিয়েছে, সেগুলিকে আড়াল করে ‘অনুপ্রবেশ’কে প্রধান ইস্যু করার এই চেষ্টা আসলে হিন্দুত্ববাদী সঙ্ঘেরই কৌশল। কারণ, অনুপ্রবেশকে একটি সাম্প্রদায়িক দৃষ্ঠিভঙ্গি থেকে বিচার করে দেশের জনমানসে তা প্রতিষ্ঠা করার জন্য লাগাতার নানাভাবে প্রচার চালিয়েছে সঙ্ঘ পরিবার। এবার সরকারকে ব্যবহার করে অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত করার নামে সমাজে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা হবে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মাত্রা আরও বাড়িয়ে সংগঠিত আন্দোলনকে ভাঙার কাজে ব্যবহার করা হবে ‘অনুপ্রবেশ’ ইস্যুকে।

Comments :0

Login to leave a comment