পার্থপ্রতিম বিশ্বাস
অবশেষে আবারও সর্ষের মধ্যে ভূতের সন্ধান মিলেছে। মিলেছে এ বছর নিট পরীক্ষার ভিড়ে। ২০২৬-এর দেশজোড়া মেডিক্যাল শিক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষা ‘নিট’ আবারও বাতিল হয়েছে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের প্রেক্ষিতে। ইতিমধ্যে দেশের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থার হাতে আসা তথ্যে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে, নিট পরীক্ষার প্রশ্নকর্তাদের মধ্যেই কেউ কেউ এবার ওই প্রশ্ন ফাঁসের সাথে জড়িয়ে গেছেন! তদন্ত শেষ হলে বোঝা যাবে যে, দেশের ৫৫২টা আর বিদেশের ১৪টা শহরে ৫৪৩২টা পরীক্ষা কেন্দ্রে সম্পন্ন হওয়া পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের কারিগর এমন একজন দু’জন প্রশ্নকর্তা ছিলেন, নাকি দেশের বৃহত্তর প্রশ্ন ফাঁস চক্রের অংশ হয়ে পড়েছিলেন তাঁরা?
এবারের ‘নিট’ প্রবেশিকা বাতিল হওয়ার সাথে সাথেই আবারও নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হতে হচ্ছে পরীক্ষায় বসা দেশের ২৩ লক্ষ ডাক্তারি পড়ুয়ার। পুনরায় বাতিল হওয়া পরীক্ষার নেওয়ার তারিখ ২১ জুন স্থির হলেও পরীক্ষায় সাফল্যের লক্ষ্যভেদে অনিশ্চয়তার বাতাবরণে প্রবল মানসিক চাপে এখন দিন কাটাতে হবে ঐ লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া এবং তাদের অভিভাবকদের। ‘নিট’ পরীক্ষা বাতিল হওয়ার পরপরই হতাশার আবর্তে ইতিমধ্যে আত্মঘাতী হয়েছেন চারজন পড়ুয়া। ফলে আশঙ্কা ইতিমধ্যে হয়ে যাওয়া প্রথম দফার পরীক্ষায় যারা ভালো ফল আশা করেছিল দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষায় আশানুরূপ ভালো ফল না হলে তাঁদের অনেকেই নতুন করে হতাশার আবর্তে জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু হতাশা কি কেবলই নিট পরীক্ষায় বসা পড়ুয়াদের গ্রাস করছে? নাকি প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগে একের পর এক পরীক্ষা বাতিলে সারাদেশে পড়ুয়া থেকে অভিভাবক কিংবা শিক্ষক থেকে প্রশাসকেরা আস্থা হারিয়ে ফেলছে দেশের নতুন পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সির (এনটিএ) কাজকর্মে।
কার্যত এনটিএ তৈরি হওয়ার পর দেশে গত দশ বছরে ৮৯বার প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ এসেছে, এমনটাই দাবি করেছেন দেশের সংসদের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। গত কয়েক বছরে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ প্রকাশ্যে সামনে আসার পর একের পর এক পরীক্ষা বাতিলের ধাক্কায় ভুক্তভোগী হয়ে চলেছে দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়া। ‘এক দেশ-এক পরীক্ষা’ তত্ত্বে ভর করে দেশের সরকার যখনই জাতীয় প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলির কেন্দ্রীকরণ ঘটাতে ছুটেছিল উপযুক্ত পরিকল্পনা এবং পরিকাঠামো ব্যতিরেকেই তখন থেকেই এমন বড় মাপের প্রবেশিকা পরীক্ষাগুলিতে ‘বজ্র আঁটুনি ফসকা গেরোর মেঘ’ দেখা গিয়েছিল। ফলে ‘এনটিএ’ তৈরির দশ বছরের মাথায় সেই সংস্থার ব্যর্থতার খতিয়ান দেখলে আজ স্পষ্ট হচ্ছে সংস্থার নেওয়া পরীক্ষাগুলিতে ‘বেনো জল’ ঢোকার আশঙ্কা প্রবল থেকে প্রবলতর হয়েছে। ডাক্তারি স্নাতক স্তরের প্রবেশিকা নিট পরীক্ষা বাতিল এই প্রথম নয়। বিগত ২০২৪ সালেও মেডিক্যাল নিট পরীক্ষা বাতিল করতে হয়েছিল প্রশ্ন ফাঁসের গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে! এমন কি সেবার ফল প্রকাশের পর চোখ ধাঁধানো দুর্নীতির একের পর এক নমুনা সামনে এসেছিল। কিন্তু সেই পরীক্ষা দুর্নীতির তদন্তে নেমে আখেরে প্রশ্ন ফাঁসের মতো গুরুতর ব্যাধি নিরসনের কোনও প্রতিষেধক বের করা যায়নি। সেই কারণেই আজ দু’বছরের মাথায় আবার নতুন করে ওই প্রশ্ন ফাঁসের দুর্নীতিতে ২৩ লক্ষ পড়ুয়ার দেওয়া একটা পরীক্ষা বাতিল করতে হল। ফলে বলাই বাহুল্য যে, অতীতের ব্যর্থতা থেকে কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যর্থ হয়েছে দেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থা এবং শিক্ষামন্ত্রক।
আজ এই প্রেক্ষিতেই ডাক্তারের মতো উচ্চ মেধা এবং উচ্চ সামাজিক প্রতিপত্তির পেশায় শিক্ষার ক্ষেত্রে প্রবেশিকার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা জরুরি বিশেষত পর্যায়নের পথে শিক্ষার অন্তর্জলি যাত্রা শুরু হওয়ার সাথে সাথেই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মতো পেশাগত শিক্ষায় ফ্যালো করি মাখো তেলের ফর্মুলা সমাজ দ্রুত আয়ত্ত করে নিয়েছে ফলে প্রবেশিকার ক্ষেত্রে পড়ুয়ার মেধাকে ছাপিয়ে যেতে চলেছে এখন কোচিং নির্ভর পুঁজির দাপট। কার্যত এখন পেশাগত শিক্ষা ছলে-বলে-কৌশলে লক্ষ্যভেদ করাটাই পাখির চোখ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পড়ুয়া থেকে অভিভাবক সকলেরই সাফল্যই জীবনের শেষ কথা। ফলে প্রতিযোগিতার জীবনে সাফল্যের লক্ষ্যভেদে এখন এরাও কূটনীতির পাকেচক্রে ঝুঁকে পড়ছেন। পরীক্ষা নিয়ামক সংস্থার তত্ত্বাবধানে নিশ্চিদ্র পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে যে অসংখ্য দুর্নীতির ছিদ্রপথ প্রতিনিয়তই আবিষ্কৃত হচ্ছে তাতে দেশ জোড়া শিক্ষা মাফিয়াদের সাথে অভিভাবকেরাও ওই ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র লক্ষ লক্ষ টাকায় কেনা বেচায় এবং হাতবদলের চক্রে যুক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে ওই সব সংস্থার ছাতার তলায় প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির নাগপাশে জড়িয়ে পড়ছে দেশের উচ্চ বহু অংশীদার। ফলে সরকারের এখন মূল দায়িত্ব হলো সরকার ঘোষিত উচ্চশিক্ষায় সরকারি নিয়ামক সংস্থার নেওয়া প্রবেশিকাগুলির স্বচ্ছতার প্রতি মানুষের আস্থা ফেরানো।
সেই লক্ষ্যে এনটিএ’র মতো সংস্থার পরিচালন ব্যবস্থা এবং পরিকাঠামো খোল নলচে বদলানোর প্রয়োজন। ইতিমধ্যে ২০২৪-এর ‘নিট’ পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের দুর্নীতির প্রেক্ষিতে গঠিত রাধাকৃষ্ণন কমিটি যে সুপারিশগুলি করেছিল সেগুলি এখনও সংসদের শিক্ষা বিষয়ক স্ট্যান্ডিং কমিটির বিবেচনাধীন। সেই কমিটির অন্যতম সুপারিশ ছিল বর্তমানে কাগজে ছাপা প্রশ্নপত্র এবং পরীক্ষার হলে বসে ‘ওএমআর’ শিট পেন-পেন্সিল দিয়ে উত্তর দেওয়ার পরিবর্তে গোটা পরীক্ষা ব্যবস্থাটাই অনলাইনে কম্পিউটার নির্ভর। Computer based test – (CBT)] ব্যবস্থার মাধ্যমে সম্পন্ন করা। বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সর্বভারতীয় পরীক্ষা জয়েন্ট এন্ট্রান্স মেইন কিংবা ‘ CUET’ নেওয়া হয় দেশজুড়ে বিভিন্ন পরীক্ষা কেন্দ্রে, অনলাইন কম্পিউটার নির্ভর ব্যবস্থার মাধ্যমেই। গোটা দেশজুড়ে এমন কম্পিউটার নির্ভর পরীক্ষার জন্য মেরেকেটে ১.২৫ লক্ষ পড়ুয়ার পরীক্ষার আসনের পরিকাঠামো রয়েছে। কিন্তু দেশের ২৩লাখ মেডিক্যাল পড়ুয়ার নিট পরীক্ষা একই দিনে একই প্রশ্নপত্রে নেওয়া সম্ভব নয়। ফলে দেশের সীমাবদ্ধ অনলাইন পরিকাঠামো ব্যবহার করে বার্ষিক নিট পরীক্ষা নিতে গেলে বিভিন্ন পর্যায়ে, বিভিন্ন দিন মিলিয়ে অন্তত ১৮-২০দিন সময় লাগবে। এই প্রেক্ষিতে দেশজুড়ে প্রবেশিকা পরীক্ষার কম্পিউটার নির্ভর নিরাপদ পরিকাঠামো অগ্রাধিকার দিয়ে গড়ে তোলা না গেলে প্রশ্ন ফাঁসের মোকাবিলা করা অত্যন্ত কঠিন।
সে ক্ষেত্রে বিবেচনায় রাখতে হবে আমাদের দেশে শহর- গ্রাম কিংবা শহরতলির মতো বিভিন্ন ভৌগোলিক এলাকায় ইন্টারনেট সংযোগের মাত্রার গুণগত ফারাক রয়েছে। ফলে ‘সিবিটি টেস্টের’ জন্য প্রয়োজন বিভিন্ন অঞ্চলের পরীক্ষা কেন্দ্রগুলির নেট-নির্ভর প্রযুক্তি পরিকাঠামোর অভিন্ন গুণমান নিশ্চিত করা। ইতিমধ্যে ‘এনটিএ’র বিভিন্ন প্রবেশিকার অনলাইন ফর্ম ভরতে গিয়েও দেশের লক্ষ লক্ষ পড়ুয়ারা রোজ খাবি খাচ্ছে প্রযুক্তিগত পরিকাঠামোর বেহাল অবস্থার কারণে। কারণ দেশের সরকার ‘ডিজিটাল ইন্ডিয়ার’ কথা তাঁদের রাজনৈতিক ভাষ্যে আনলেও কার্যক্ষেত্রে প্রবেশিকা থেকে অনলাইন ক্লাস কিংবা ব্যাঙ্ক থেকে বিমা পরিষেবার বহু ক্ষেত্রে আজ বেহাল অবস্থায় রয়েছে দেশ। উপরন্তু কাগজে ছাপা প্রশ্ন কিংবা ওএমআর শিটের বদলে অনলাইন পরীক্ষা হয়ে গেলে যে প্রশ্ন ফাঁস সম্পূর্ণ নির্মূল হবে এমন ভাবাটাও ভুল! কারণ অনলাইন ব্যবস্থায় লাখ লাখ পড়ুয়াদের প্রযুক্তিনির্ভর সংযোগ, রেজিস্ট্রেশন অথবা তাদের পরিচিতি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে হ্যাকিং-এর বিপদ গোটা পৃথিবী জুড়েই রয়েছে। ফলে এদেশের জল হাওয়ায় ‘অনলাইন জালিয়াতির’ তালিকায় আবার নতুন করে ঢুকে পড়তে পারে প্রবেশিকা পরীক্ষার নাম! সেক্ষেত্রে বিশেষ যত্নবান হতে হবে দেশের সরকারকে। অন্যথায় ‘হাইব্রিড মডেল’ — যেখানে প্রশ্নপত্র ছেপে পরীক্ষা কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়ার পরিবর্তে পরীক্ষা শুরুর এক ঘণ্টা আগে পরীক্ষা কেন্দ্রেই অনলাইনে পাঠানো প্রশ্ন ছেপে নেওয়া যাবে। আর পড়ুয়ারা বাকি পরীক্ষা দেবে ‘ওএমআর’ সিট ব্যবহার করেই। ফলে ছাপাখানা থেকে পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্নপত্র পৌঁছানোর আগে প্রশ্নপত্র বেহাত হওয়ার আশঙ্কা কমানো যাবে। কিন্তু এবারের মতো প্রশ্নকর্তা যদি প্রশ্ন ফাঁসের চক্রে জুড়ে থাকেন তখন সেই দুর্নীতি রোখার প্রশাসনিক পরিকল্পনা করতে হবে নিয়ামক সংস্থাকে। এক্ষেত্রে দেশের সরকারকে দেশজোড়া পরীক্ষা মাফিয়াদের দ্বারা পরিচালিত কোচিং সেন্টারগুলির ওপর কড়া নজরদারি প্রয়োজন। বিশেষত যে সমস্ত কোচিং সেন্টারগুলির সর্বভারতীয় পরীক্ষায় সাম্প্রতিককালে সাফল্যের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি তাঁদেরই প্রাথমিকভাবে আনা উচিত আতশ কাচের তলায়। প্রশ্ন ফাঁসের ক্ষেত্রে ঠগ বাছার উপায় বের করতেই হবে সরকারকে যখন সরকারি নীতিতেই শিক্ষা পণ্য-পরিষেবা হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
কিন্তু এসব প্রযুক্তি কিংবা পদ্ধতিকে হাল আমলে ছাপিয়ে গেছে পরীক্ষার ব্যবস্থাপনায় নিযুক্ত প্রশাসনিক কর্তাদের দায়বদ্ধতা ও সক্ষমতা। এ রাজ্যের বিগত সরকারের শাসনকালে পরীক্ষাকেন্দ্রে খালি ‘ওএমআর’ শিট জমা দিয়েও বহু পরীক্ষার্থী সাফল্যের তালিকায় স্থান পেয়েছেন। কারণ উত্তরপত্রের মূল্যায়নের দায়িত্বে থাকা মানুষজনের মধ্যেই সরষের ভূতেরা বাসা বেঁধেছিল। এমনকি এ রাজ্যে কলেজে কলেজে পড়ুয়া ভর্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছ অনলাইন ব্যবস্থা চালু করতে লেগেছে পাক্কা দশ বছর। প্রবেশিকা থেকে শুরু করে নিয়োগ, প্রতিটি পরীক্ষার আয়োজনে ও তার মূল্যায়নে সরকারি স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে বারবার। যার ফলে ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিক্ষা ক্ষেত্রে রাজ্যের ভাবমূর্তি! আজ ‘এনটিএ’র মতো কেন্দ্রীয় নিয়ামক সংস্থার প্রশ্নফাঁস ধরা পড়ছে কখনো পরীক্ষা হওয়ার আগে, কখনও পরে আবার কখনও ফল প্রকাশের পর। কিন্তু যে পরীক্ষাগুলিতে প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগ আপাতভাবে সামনে আসেনি এখন সেগুলির ফলাফলের স্বচ্ছতা নিয়েও জনমানসে সন্দেহের তীর উঁকি মারলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এই প্রেক্ষিতে ‘এনটিএ’র এক দশক পূর্তিতে আজ দেশের উচ্চ শিক্ষার মান মর্যাদার স্বার্থেই দেশের সরকারের আত্মসমীক্ষা জরুরি।
Comments :0