BOOK | EAK KURI DUI | KINGSHUK ROY | MUKTADHARA | 4th YEAR | 28 JULY 2026

বই | প্রতিটি গল্পের পিছনে থাকে আর একটা গল্প | কিংশুক রায় | মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৮ জুলাই ২০২৬

নতুনপাতা/মুক্তধারা

BOOK  EAK KURI DUI  KINGSHUK ROY  MUKTADHARA  4th YEAR  28 JULY 2026

বই | প্রতিটি গল্পের পিছনে থাকে আর একটা গল্প 
      কিংশুক রায়

মুক্তধারা | বর্ষ ৪ | ২৮ জুলাই ২০২৬
 

একজন নাট্যকর্মী হিসাবেই এই শহরে দেবাশিসের বেড়ে ওঠা। নাটকের জগতে সে কারণে দেবাশিসের অবাধ যাতায়াত। স্বাভাবিকভাবে দেবাশিসের কলমে নাটক সংক্রান্ত বহুবিধ রচনার সঙ্গে পাঠক সমাজের পরিচয় আছে। কিন্তু একজন গল্পকাররূপে এবার তাঁকে পেলাম ‘এক কুড়ি দুই’-এ। এককথায় বাইশটি গল্প নিয়ে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের গল্পের বইয়ে নাটকের উপাদনের অভাব নেই। সবচেয়ে বড় কথা নাট্যসূত্রে রাজ্য, রাজ্যের বাইরে, এমনকী দেশের বাইরে তাঁর যাবতীয় বিচরণের পিছনে নাটক থাকলেও মন ও দেখার চোখ  অন্য কিছু একটার অন্বেষণে সবসময় নিমগ্ন ছিল। গল্পের শরীরে বারেবারে উঁকি দিয়েছে দেশ কাল সময়। কোন ও কোনও গল্পে সময়কে চিহ্নিত করছে সামগ্রিকতায়। যেমন ‘পুবের আলো’ ভোরের আলো ফুটলে মনে হয় আজকের দিনটা সুন্দর হবে। কল্যাণব্রতর যে কাহিনি দিয়ে গল্পের সূত্রপাত তার তিনটি দিক আছে। নিয়মানুবর্তিতা, সময়জ্ঞান ও সত্যের পথে অবিচল থাকা এক আদর্শনিষ্ট মানুষের কথনে ও যাপিত জীবনে উপন্যাসের উপকরণ আছে।
প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশের একুশে ফ্রেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনবদ্য দুটি গল্প এখানে স্থান পেয়েছে। ‘অন্যপ্রজন্ম’ গল্পে লেখক একজন সংবাদপত্রের প্রতিনিধি হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী এক লাঞ্ছিতা নারীর উপলদ্ধির কথা মেলে ধরেছেন। শিহরিত হতে হয় সে অকথিত কাহিনি পাঠ করে। যদিও আজ স্মৃতিভারে সবই আবছা ম্রিয়মান। আবার ‘ফল্গুধারা’তে একুশে ভাষা শহীদ স্মরণে রোশেনারা ও আমিরুলের কথায় উঠে আসে ‘এদেশের মানুষ হারমোনিয়াম তবলা নিয়ে গান শিখতে বসে না’। অন্তর থেকে গান উচ্চারিত হয় ‘সবকটা জানালা খুলে দাও না’। এই জানলা খোলার অপেক্ষাতেই রাত কাটে ‘ফণীমনসা’র সাবধানী সুমিতার। শোক, দুঃখ, জ্বালা, যন্ত্রণা কোনও কিছুই তখন কাজ করে না যখন কুয়াশা ঢাকা এক সকালে শহরের জনারণ্যে পা ফেলল ফেলি সঙ্গীসাথিদের পায়ে পা মিলিয়ে, ঢোলকের দড়িটা কাঁধে ফেলে বৃহন্নলা ফেলি চলল জীবিকার সন্ধানে। আসলে খিদের কখনও জাত হয় না।
‘শিফট ডিউটি’ গল্পের কথাই ধরা যাক। তিন শিফটে কাজ করে ভন্টু। সম্বল একটা ভ্যানগাড়ি। আমাদের চেনা শহর আহিরিটোলা বাগবাজার বড়বাজার ছুঁয়ে মানিকতলা ভন্টুর কাজের এলাকা। সূর্য ওঠার আগে প্রথম শিফটের কাজ শুরু। বয়স্কা মহিলাদের ভ্যানে চাপিয়ে গঙ্গা স্নানে নিয়ে আসে ও ফিরিয়ে নিয়ে যায়। দ্বিতীয় শিফটে হাটখোলা বেনিয়াটোলা অঞ্চলে গেঞ্জির কারখানায় মাল পৌঁছে দেয় গৌরসাহার গোডাউন থেকে। তৃতীয় শিফটে কানাই সাঁতরার ঝুপড়ি হোটেলে রাতের বাসনপত্র মাজা থেকে হোটেল পরিষ্কার পরিছন্ন করার বিনিময়ে রাতের খাবার আর বেঞ্চি জোড়া দিয়ে ঘুম। এই গল্পের আসল রহস্য লুকিয়ে আছে শ্রমজীবী মানুষের শ্রম চুরি করে মালিকের মুনাফার অর্জনের পাশাপাশি একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে নিজের পরিচয় ফিরে পাওয়া। ‘অভিযোজন’ দেবাশিসের অন্যতম একটি গল্পকথা হয়ে থাকবে। বিশেষ করে এই সময়ে ছাত্র শিক্ষক সম্পর্কের একটা ছবি এখানে ফুট উঠেছে। রাজ্যের শাসক দল নিয়ন্ত্রিত ছাত্র আন্দোলনে গোষ্ঠী সংঘর্ষের একটা চেহারা আর অধ্যাপককে জগ ছুঁড়ে মারার স্মৃতি যেন ফিরে আসে। কিন্তু এই পথ যে সঠিক নয় তার ঈঙ্গিত দিয়ে আমরা পেয়ে যাই অভিযোজনে। মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আর একটি গল্প ‘প্রতীক্ষা’। বন্ধুর চিঠিতে যে এত মায়ামাখা থাকে ঝিনুকখোলার আসাদ মিঞা অনুভব করে। ‘তুমি আসবা না দোস্ত? একবার আস, কইলজার মইধ্যে অনেক অনেক কথা জমসে। একবার আস, দিন রাইত এক কইরা শুধু কথা কই। দেখবা তোমারও প্রাণডা জুড়াইব।’ সত্যিই তাই। মনের ভিতরে হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন আবার ফিরে ফিরে আসে।
সিঙ্গুরে টাটার মোটর গাড়ির কারখানা এখন শুধুই স্মৃতি। ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক প্রশ্নে প্রায় সমাপ্তির পথে একটা কারখানা বিরোধী দলের আন্দোলনের ফলে  উঠে গেল। সেই সঙ্গে ধ্বংস হয়ে গেল এ রাজ্যের বেকারদের চাকরির ভবিষ্যৎ। ‘পদ্মরা’ গল্পে তারই জলছবি। নন্দনপুরে বিশাল জমি নিয়ে টিভির কারখানা হবে। প্রচুর কর্মসংস্থান হবে। বিশাল ক্যান্টিন চালাতে চাই প্রশিক্ষিত কর্মী। পদ্মরা তাই দল বেঁধে কলকাতার এক কলেজে রান্নার যাবতীয় কাজ শিখতে যায়। সামনে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ছবি। শেষ পর্যন্ত কারখানার বুকে অশনিসংকেতের মেঘ জমে ওঠে। কারখানা নির্মাণ মুলতবি হয়ে যায়। অবিকল সিঙ্গুরের ছবি আমাদের ভিতরটা নাড়া দিয়ে যায়। লেখকের প্রতিটি গল্পের পিছনে আর একটা গল্প আছে। যে গল্পের সঙ্গে মিশে আছে ভোরের আজান। একদিন সূর্যের ভোর হবেই। স্বল্প পরিসরে গড়ে ওঠা গল্পের শরীরে আবহ সঙ্গীতের মতন কাজ করে রবীন্দ্রনাথের গান।
 

এক কুড়ি দুই। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। একুশশতক। ১৫শ্যামাচরণ দে স্ট্রিট। কলকাতা ৭০০০৭৩। ১৫০টাকা।

Comments :0

Login to leave a comment