অন্যকথা
রথ ভাবে আমি দেব পথ ভাবে আমি
স্বর্ণেন্দু দাস
মুক্তধারা — ৪র্থ বর্ষ — ২৭ জুলাই ২০২৬
রথ ভাবে সে ধন্য, পথ ভাবে তারি দান,
অহংকারে মত্ত সবে, ভুলে আসল প্রাণ।
পরস্পরের মেলবন্ধনে চলে সৃষ্টির চাকা,
বিনয় ছাড়া জগতের সব অগ্রগতিই ফাঁকা।
রথ মনে করে সে-ই পথিককে গন্তব্যে পৌঁছে দিচ্ছে, আবার পথও ভাবে তার জন্যই যাত্রা সম্ভব হচ্ছে। অথচ প্রকৃত সত্য হলো, রথ চলে ঘোড়ার শক্তিতে, আর পথের গুরুত্ব তখনই আছে যখন কেউ তার ওপর দিয়ে চলে। রথ আর পথ দুটোই আসলে মাধ্যম মাত্র, তারা নিজেরাই গন্তব্য বা কর্তা নয়।
এই প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়, প্রতিটি পক্ষ নিজেকেই মূল কারিগর বা কেন্দ্রবিন্দু ভেবে বসে। অথচ প্রকৃত সত্য হলো—কোনো একক ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা উপাদান একা কিছুই সম্পন্ন করতে পারে না। একে অপরের সহযোগিতা, নির্ভরতা ও সংযোগেই সমগ্র ব্যবস্থা সচল থাকে। রথ আর ঘোড়া, ঘোড়া আর সারথি, সারথি আর যাত্রী—সব মিলিয়েই যাত্রা সম্পূর্ণ হয়। তেমনি পথও তার নিজস্ব অস্তিত্ব নিয়ে সার্থক নয়, যতক্ষণ না কেউ তার ওপর দিয়ে হেঁটে তাকে অর্থবহ করে তোলে।
এই মিথ্যা অহংকার বা আত্মকেন্দ্রিক চিন্তাধারা থেকেই জন্ম নেয় সামাজিক দ্বন্দ্ব, বিভেদ ও অসহযোগিতা। প্রত্যেকে যখন নিজেকেই একমাত্র কৃতিত্বের অধিকারী মনে করে, তখন পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যায় এবং সম্পর্কে ফাটল ধরে। কিন্তু যদি প্রতিটি পক্ষ নিজের ভূমিকার সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে এবং অন্যের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়, তবেই প্রকৃত সমন্বয় ও অগ্রগতি সম্ভব হয়। মানবজীবনেও এই সত্য বারবার প্রতিফলিত হয়। সমাজের প্রতিটি অংশ—শিক্ষক, কর্মী, নেতা, যন্ত্র—একে অপরের সহযোগে বৃহত্তর লক্ষ্য পূরণ করে। কিন্তু অনেক সময় প্রতিটি অংশ নিজেকেই মূল কারিগর ভেবে অহংকারী হয়ে ওঠে। একজন কর্মচারী ভাবেন প্রতিষ্ঠান তার জন্যই চলছে, আবার প্রতিষ্ঠানও ভাবে কর্মচারী তারই দয়ায় টিকে আছে। প্রকৃতপক্ষে উভয়ে পরস্পর-নির্ভরশীল; একে অপরকে ছাড়া কেউই সম্পূর্ণ নয়। এই অহংকার বা মিথ্যা কৃতিত্বের বোধ থেকেই জন্ম নেয় বিভেদ, দ্বন্দ্ব ও সহযোগিতার অভাব। প্রকৃত সাফল্য আসে তখনই, যখন প্রতিটি অংশ নিজের সীমাবদ্ধতা ও অন্যের অবদান স্বীকার করে নিতে শেখে।
তাই রথ ও পথ—উভয়েরই উচিত নিজেদের প্রকৃত ভূমিকা বোঝা। কৃতিত্বের অহংকার নয়, বরং পারস্পরিক নির্ভরতা ও বিনয়ের মধ্য দিয়েই জীবনের প্রকৃত অগ্রগতি সম্ভব।
দশম শ্রেণি
কল্যাননগর বিদ্যাপীঠ
Comments :0