Post editorial

ইথানল, গড়করি ভাইয়েরা এবং কিছু প্রশ্ন

সম্পাদকীয় বিভাগ

অমিত সরকার
২০১৪ সাল থেকে সড়ক পরিবহণ ‌এবং মহাসড়ক মন্ত্রী নীতিন। তখন থেকেই সভায় সভায় তিনি বলতে শুরু করেন, ইথানল তৈরি করুন। পেট্রলের সঙ্গে মিশিয়ে ব্যবহার করুন গাড়িতে। এই গ্রহকে বাঁচান। কৃষকদের ক্ষমতায়ন করুন। তিনি ঠিক যেন এক পরিবেশ যোদ্ধা। তাঁর বক্তব্য, ইথানল তৈরিতে চাল, চিনি, গম লাগে। তাই এতে উপকার হবে চাষিদেরও। ইথানল মেশানো পেট্রল ব্যবহার করলে বায়ুদূষণ কমবে।
চিত্র ২৬। ২০২৬ এর ১ এপ্রিল কেন্দ্রে বিজেপি সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তেল আমদানির খরচ বাঁচাতে দেশের সব খুচরো আউটলেটে ই ২০ পেট্রলই বিক্রি হবে। এই পেট্রল পাম্পে রাখাটা বাধ্যতামূলক। গাড়ি চালাতে হবে এই পেট্রলে। আর ইথানলমুক্ত পেট্রল নিতে হলে বাজারের দাম দিতে হবে ১৬৭ থেকে ১৭০ টাকা লিটার। আপাতত দেশের ৯০ হাজার পাস্পে এখন পৌঁছে যাচ্ছে ২০ শতাংশ ইথানল ও ৮০ শতাংশ পেট্রল মেশানো জ্বালানি ই ২০। এই লক্ষ্য অর্জিত হয়েছে কেন্দ্রের স্থির করা লক্ষ্যমাত্রার ৫বছর আগেই। কেন্দ্রের নিয়ম, এখন ই ২০ পেট্রলই কিনতে হবে। বিজেপি সরকারের স্লোগান, জ্বালানির খরচ কমিয়ে বিদেশি মুদ্রা বাঁচাতে হবে। পরিবেশ বাঁচাতে হবে। এবং সরকার এখন দাবি করছে, বাতাস পরিচ্ছন্ন হয়েছে, তেল আমাদানির চাপ কমেছে, চাষিরা ধনী হয়েছে। কাগজে কলমে সবার জয় হয়েছে।
আসলে কেন্দ্রের এমন ইথানল নীতিকে একেবারে সামনে ঠেলে পৌঁছে দিয়েছেন সড়ক পরিবহণ ‌ও মহাসড়ক মন্ত্রী গড়করি। অতএব তাঁরও জয় হয়েছে। 
তবে কাহিনি এত সরল নয়।
জয় হয়েছে আরও এক পক্ষের। গড়করি পরিবারের। নাগপুরে গড়করি পরিবারের চিনি ও কৃষিভিত্তিক শিল্প সংস্থা পূর্তি গ্রুপ অনেক দিন আগেই তাদের গৌরব হারিয়ে বসেছিল। ইথানলের দৌলতে ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে দুটি কোম্পানি— মানস অ্যাগ্রো ও সিয়ান অ্যাগ্রো। পরে সিয়ানের সঙ্গে মিশে গেছে মানস। দুটোরই মালিক গড়করির দুই ছেলে। বড় নিখিল গড়করি ছিলেন সিয়ানের এমডি। ছোট সারঙ্গ ছিলেন মানসের এমডি। এখন অবশ্য দুই ভাই মিলে সিয়ানের ইথানল সাম্রাজ্য দেখাশোনা করছেন।
একদা ঘুমন্ত সিয়ান তৈরি করত সাবান আর মশলার তেল। এক দিন তাদের হঠাৎই নজর পড়ে ইথানলে। পরের দৃশ্য এরকম। ২০২৪ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে সিয়ানের আয়ের পরিমাণ ছিল ১৭ কোটি। ২০২৬ সালের প্রথম ত্রৈমাসিকে তা লাফিয়ে হয় ৫১১ কোটি। মানে, ২বছরে আয় বৃদ্ধি ৩০ গুণ । একটা ত্রৈমাসিকে মুনাফা বৃদ্ধি ৫২০০০ কোটি টাকা। যে সংস্থার শেয়ারের দাম ছিল ৪০ টাকা, ১৬ মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১৬৩৮টাকা। এই কোম্পানির বাজার মূল্য এখন ৯২২২ কোটি টাকা। 
এই সাফল্যকে কাকতালীয় মানতে নারাজ। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রে ইথানল নীতি তৈরি ও চালু করার পিছনে রয়েছে মন্ত্রী নীতিন গড়করি। আর সেই নীতিকে কাজে লাগিয়ে মুনাফা কামাচ্ছেন নীতিনের দুই ছেলে। ফলে সোশাল মিডিয়ায় পোস্ট আসছে, যখন হাইওয়ে ভেঙে পড়ছে, নীতি নৈতিকতা উধাও, তখন নীতিন গড়করি, আপনি এত নিশ্চিন্তে ঘুম যাচ্ছেন কী করে? গড়করির উত্তর, এতে আমার কোনও ভূমিকা নেই। দেশে যত ইথানল হয় তার মাত্র ০.৫ শতাংশ তৈরি করে সিয়ান। আরও ৪৫০টা কোম্পানি এই ব্যবসায়ে আছে। আর দাম? সে তো ঠিক করে ক্যাবিনেট।

২০২৪ সালে প্রথম কেন্দ্র ভারতে চালু করে ই ২০ নীতি। মানে ২০ শতাংশ ইথানল মেশানো পেট্রল বিক্রি করতে হবে পাম্পে। তেল সংস্থাগুলি ওই পেট্রল তৈরি করবে। কেন্দ্র এই নির্দেশ জারির আগে সিয়ান অ্যাগ্রো কোম্পানির নিট মূল্য ছিল ৮৯.২৩ কোটি। আয় আদায় ১৮২কোটি। মুনাফা ৪.৯ কোটি। এর ঠিক এক বছর পর, ২০২৫এর ১ জুলাই এই কোম্পানির নিট মূল্য বেড়ে দাঁড়ায় ৮৯.২৩ কোটি টাকা থেকে ২০১৭ কোটি। আয় ১৮২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১০৫৪ কোটি। মুনাফা ৪.৯ কোটি থেকে বেড়ে হয় ৪১.৬ কোটি। 
গড়করির দাবি, তাঁর ছেলেরা সৎ ভাবে ব্যবসা করে এই আয় করেছে। পালটা অভিযোগ, ছেলের ব্যবসা দাঁড় করাতে গিয়ে পেট্রলে ইথানল মেশানোর নীতির স্বপক্ষে সোচ্চার থেকেছেন গড়করি। আর এখন এতে সর্বনাশ হচ্ছে গাড়ি শিল্পের। 
প্রশ্ন উঠেছে হঠাৎ করে সেক ওয়ানের মতো গুড় নির্মাতা কোম্পানির সঙ্গে রাতারাতি কীভাবে মিলে গেল সিয়ান। আবার মানসও মিশে গেল সিয়ানের সঙ্গে? গোটাটা কি ইথানলেনর দিকে তাকিয়ে নয়? কারণ ইথানল তৈরিতে চাল, গম, কাসাভার সঙ্গে চিনিরও দরকার হয়। আর আখ থেকে মেলে চিনি। অতএব গড়করি ভ্রাতাদের সমীকরণ একেবারে নিখুঁত বললে ভুল হবে না। অভিযোগ, আগাম চিনি আর গুড়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে তাঁরা সরকারি নীতিকে দোহনের ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন। আপাতত সিয়ান ইথানল ছাপিয়ে বায়ো সিএনজি, গ্রিন হাইড্রোজেন বানিয়ে তা রপ্তানি করার স্বপ্নে বিভোর।
একটা কোম্পানির শেয়ারের দাম ১৬ মাসে ৪০ টাকা থেকে পৌঁছে গেল ৩১৩৮ টাকায়। সেবি কোনও প্রশ্ন করল না, কোনও তদন্তও হলো না। শুধু কয়েকটা ভ্রু কুঞ্চিত হলো মাত্র। দুর্মুখেরা বলছেন, মন্ত্রী বাবার প্রিয় নীতির দৌলতে দুই ছেলে হয়ে গেল ইথানল মিলিওনার। তাই দুর্গন্ধ তো ছড়াবেই।
কুড়ি শতাংশ ইথানল মিশ্রিত পেট্রল ই ২০ ব্যবহার করায় তাঁর গাড়ি বিকল হয়েছে, ছত্তিসগড়ের রায়পুরের উপভোক্তা আদালতে এমনই নালিশ করেন এক চিকিৎসক। অভিযোগকারীকে ক্ষতিপূরণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত।  মারুতি সুজুকি জানিয়েছে, তাদের গাড়ি ই ২০ ব্যবহার করার মতো করেই তৈরি করা হয়েছে এবং তারা উপভোক্তা আদালতের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করবে। তেল সংস্থাগুলি জানিয়েছে, বিষয়টা ই ২০ নয়, গাড়ির সমস্যা।  (সূত্র, আনন্দবাজার পত্রিকা ও দ্য হিন্দু, ১৭ জুলাই)। কেন্দ্র বলছে, জ্বালানি বাঁচাতে ইথানল মেশানো ই ২০ পেট্রলের ব্যবহার করতেই হবে। গাড়ি নির্মাতা বলছে, ইঞ্জিন ই ২০র উপযোগী করে তৈরি। তেল সংস্থা বলছে তাদের তৈরি ই ২০তে কোনও ভেজাল নেই। অথচ গাড়ি ব্রেক ডাউন হচ্ছে। ওদিকে সিয়ান কোম্পানির শেয়ারের দাম বেড়েই চলেছে। এখন তবে গাড়ি মালিকের কথা কে শুনবেন?
অস্বস্তি এখানেই শেষ হচ্ছে না। সম্প্রতি দক্ষিণের কয়েকজন পেট্রল পাম্প মালিক দাবি করেছেন, ইথানলের সঙ্গে জলের সখ্য রয়েছে। ফলে বর্ষায়, বিশেষ করে উপকূল এলাকায় পেট্রলের ট্যাঙ্কে জল চুঁইয়ে ঢুকে ই ২০র সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। ই ২০কে বিশুদ্ধ রাখতে জল চোঁয়ানো আটকানোর কথা ভেবে এই ট্যাঙ্কগুলো তৈরি করা হয়নি। এগুলো তৈরি হয়েছিল সাধারণ পেট্রল রাখার জন্য। অভিযোগ, জল মিশে যাওয়া ই ২০ ব্যবহার করার পর গাড়ির ফুয়েল ডিসপেনসার থেকে উঠে আসছে কাদা, ই ২০ নয়। এধরনের খবরের ভিডিও ভাইরালও হয়েছে। যারা এই ভিডিও করেছে তাদের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছে পুলিশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন পাম্প মালিক জানিয়েছেন, ট্যাঙ্কে ভরা ই ২০র সঙ্গে যদি চুঁইয়ে পড়া জল মেশার মাত্রা ০.৫ শতাংশের বেশি হয়ে যায়, তাহলেই ইথানলে আর জলে মিলেমিশে যায়। সেই মিশ্রণ এক সময় ট্যাঙ্কের নীচে থিতিয়ে যায়। ওপরে ভাসে পেট্রল। সেই জিনিস ট্যাঙ্ক থেকে গাড়ির ইঞ্জিনে গেলে ব্রেকডাউন তো হবেই। ডিলাররা জানিয়েছেন, গাড়ির ক্রেতারা বলার পরই তাঁরা খতিয়ে দেখে বিষয়টি জানতে পেরেছেন। তাঁদের আশঙ্কা, ইথানলে জল মিশে গেলে ট্যাঙ্কের মধ্যেকার থাকা ইস্পাতের পাইপেও ক্ষয় ধরবে। (সূত্র:দ্য হিন্দু, ১৭ জুলাই)
এমনই নানান অভিযোগের ভিত্তিতে দাবি উঠেছে, পাম্পে বিভিন্ন মাত্রায় ইথানল মেশানে পেট্রল রাখা হোক। কেন্দ্র বলছে,তাদের এত সব কিছু করার মতো পরিকঠামো নেই। পেট্রলিয়াম মন্ত্রক এটা স্বীকার করেছে যে ইথানল ভিত্তিক জ্বালানি ই ২০ ব্যবহারে জ্বালানি সাশ্রয় ৩ থেকে ৫শতাংশ কমতে পারে। তবে ই ১০ কিংবা বিশুদ্ধ পেট্রলে এমনটা হতো কিনা তা স্পষ্ট করেনি। কেন্দ্র আরও জানিয়েছে, সমস্যার মোকাবিলায় ই ২২, ই ২৫, ই২৭, ই ৩০বাজারে আনা হবে। তবে পেট্রলে আরও বেশি ইথানল মেশালে জ্বালানি সাশ্রয় আরও কমবে কিনা তাও স্পষ্ট করা হয়নি। ইতিমধ্যেই এত কোম্পানি ইথানল তৈরিতে নেমেছে যে দেশে ৭০০ কোটি লিটার ইথানল মজুত হয়ে রয়েছে। যদি ই ২০ ব্যবহারে এখন রাশ টানা হয় তাহলে সেই মজুতেরও বা কী হবে— এমন চিন্তাও সম্ভবত রয়েছে কেন্দ্রের। তাছাড়া, গত কয়েক বছরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি ইথানল উৎপাদন ও সংশ্লিষ্ট পরিকাঠামো তৈরিতে যে লক্ষ লক্ষ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে, তারই বা কী হবে?
এই পরিস্থিতিতে ই ২০র সমস্যা, গড়করি ভায়েদের ইথানল ব্যবসায়ে বিপুল মুনাফা, নীতিন গড়করির ইথানল প্রীতি নিয়ে সোচ্চার সোশাল মিডিয়া। তিনটি সোশাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে বিজেপি’র মিডিয়া সেলের তৎপরতায় এফআইআর দায়ের করা হয়েছে নাগপুরে। তবে ইউটিউবার ও সোশাল ইনফ্লুয়েন্সিয়ার মণীশ কাশ্যপ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি ভিডিও প্রত্যাহার করে নেবেন না।
এরই মধ্যে বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশে আরও এক ঘটনা ঘটেছে। সরকারি গুদাম থেকে ইথানল তৈরিতে ব্যবহার করার জন্য প্রচুর চাল (কাস্টম মিলড রাইস) কেনে একটি সংস্থা। সেটি পৌঁছানর কথা ছিল ছিন্দাওয়ারার একটি ইথানল প্ল্যান্টে। সেখানে না পাঠিয়ে ওই চাল জমা করে রাখা হয় ওয়ারাসেওনির একটি ব্যক্তিগত মালিকানাধীন রাইস মিলে। লক্ষ্য ছিল ওই চাল ফের প্রক্রিয়াকরণ করে সরকারি গুদামে বিক্রি করে মুনাফা কামানো। তবে এই ছক ফাঁস হয়ে যায়। বিষয়টি নিয়ে পুলিশি তদন্ত চলছে।
মণিভূষণ ভট্টাচার্য লিখেছিলেন, ‘‘নেতার সঙ্গে মন্ত্রীর যোগাযোগ ছিলো,/ মন্ত্রীর সঙ্গে কেন্দ্রের যোগ ছিলো, /কেন্দ্রের সঙ্গে পরিধির যোগ ছিলো,/পরিধির সঙ্গে ব্যাস এবং ব্যাসের সঙ্গে / ব্যাসার্ধের সংযোগ ছিলো এবং এইসব সূক্ষ্ম যোগাযোগগুলি/ একসঙ্গে গিঁট লেগে একটা মোটা নাইলনের দড়ি হয়ে’’ (বেকারের চিঠি) চেপে বসেছে গাড়ির মালিক, পেট্রল পাম্প মালিক থেকে জ্বালানির সাধারণ উপভোক্তাদের দিকে এবং দুর্নীতির শিকড় সরকারি গুদামে মজুত খাদ্যকেও ছাড়ছে না। এভাবেই বিজেপি’র শাসনে দেশ এগিয়ে চলেছে কোন খাদের দিকে কে জানে।

Highlights
কেন্দ্রের ইথানল নীতিকে সামনে ঠেলে পৌঁছে দিয়েছেন সড়ক পরিবহণ ‌মন্ত্রী গড়করি। অতএব তাঁর জয় হয়েছে। জয় হয়েছে গড়করি পরিবারেরও। নাগপুরে গড়করি পরিবারের শিল্প সংস্থা পূর্তি গ্রুপ আগেই গৌরব হারিয়ে বসেছিল। ইথানলের দৌলতে ভস্ম থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে দুটি কোম্পানি মানস অ্যাগ্রো ও সিয়ান অ্যাগ্রো। দুটোরই মালিক গড়করির দুই ছেলে।

Comments :0

Login to leave a comment