post editorial

এক প্রজন্মের প্রশ্ন, এক দেশের আত্মসমীক্ষা

সম্পাদকীয় বিভাগ

শমীক লাহিড়ী 


স্বাগত জানাই ২৪লক্ষ পরীক্ষার্থীকে! স্বাগত জানাই সেইসব ভাগ্যাহত মা-বাবাদের, যাঁরা ঘটিবাটি বেচে, ঘাম রক্ত জল করে, শেষ সম্বলটুকু বাজি রেখে সন্তানদের ‘ডাক্তার’, ‘ইঞ্জিনিয়ার’ বানানোর স্বপ্ন দেখছেন। আপনাদের জন্য প্রতি বছর মে-জুন মাসের তীব্র দাবদাহে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম এক উৎসবের আয়োজন করা হয় — যার পোশাকি নাম ‘নিট-ইউজি মহাসেল’। 
এই বাজারে মেধার কোনও স্থান নেই, দিনরাত এক করে টেবিল-ল্যাম্পের আলোয় চোখ ফাটানো যোগ্যতা এখানে মূল্যহীন। যদি পকেটে তিরিশ থেকে চল্লিশ লাখ টাকার বান্ডিল থাকে, তবে পরীক্ষার আগের রাতেই আপনার হাতে চলে আসতে পারে দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র।
বছরের পর বছর ধরে চলা এই চক্র কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং এ ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থা, রাজনৈতিক দুর্নীতি, তদন্তকারী প্রতিষ্ঠানের ধামাচাপার প্রয়াস, বিচার বিভাগের প্রাতিষ্ঠানিক নির্লিপ্ততা এবং বাজারি সংবাদমাধ্যমের বিক্রি হয়ে যাওয়া মেরুদণ্ডহীনতার এক ত্রিমাত্রিক কোলাজ। আসুন, এই সার্কাসের প্রতিটি চরিত্রকে একটু গভীরভাবে ব্যবচ্ছেদ করা যাক।
১. প্রশ্ন যখন পণ্য, নীরবতা যখন নীতি
ডিজিটাল ইন্ডিয়া এবং আত্মনির্ভর ভারতের যুগে প্রশ্নপত্র ফাঁসের পদ্ধতিও অত্যন্ত আধুনিক ও কর্পোরেট রূপ ধারণ করেছে। এখন আর কোনও ভাঙা টিনের চালের তলা থেকে বা আদিম কায়দায় ট্রাঙ্কের তালা ভেঙে প্রশ্ন চুরি হয় না। এখন চুরি হয় খোদ সরকারি নজরদারির নাকের ডগা থেকে, অত্যন্ত সুপরিকল্পিত উপায়ে। ২০২৪ সালের নিট কেলেঙ্কারির তদন্তে যে তথ্য সামনে এসেছে, তা যেকোনও সভ্য সমাজের জন্য লজ্জাজনক।
ঝাড়খণ্ডের হাজারিবাগের ‘ওয়েসিস’ স্কুলের মতো পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র বের করে, অত্যন্ত নিখুঁতভাবে সিল কেটে মোবাইলের ক্যামেরায় ছবি তুলে নেওয়া হলো। তারপর সেই সিল এমনভাবে আঁঠা দিয়ে জুড়ে দেওয়া হলো, যেন বাইরে থেকে বোঝার সাধ্য কারও নেই। এর মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে রাঁচি আর পাটনার গোপন ডেরায় বসে একদল ডাক্তারি পড়ুয়া, যাদের পোশাকি নাম 'সলভার গ্যাং', চটজলদি সব প্রশ্নের নিখুঁত উত্তর তৈরি করে ফেলল। পরীক্ষার আগের রাতে পাটনার একটি প্লে-স্কুলে নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষার্থীকে জড়ো করে সেই উত্তরগুলো তোতাপাখির মতো মুখস্থ করানো হলো।
সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি এবং কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের ভূমিকা। যখন প্রথম বিহার পুলিশের অর্থনৈতিক অপরাধ শাখা পোড়া প্রশ্নপত্রের টুকরো, ব্যাঙ্ক চেকের খাতা এবং অভিযুক্তদের স্পষ্ট স্বীকারোক্তি সামনে আনল, তখন সরকারের প্রথম প্রতিক্রিয়া কী ছিল? ‘কোথাও কোনও প্রশ্ন ফাঁস হয়নি, সব গুজব। দু’-একটি কেন্দ্রে সময়ের হেরফের হয়েছে মাত্র।’ কাকে বা কাদের বাঁচাতে চেয়েছিল সরকার?
এই যে সত্যকে অস্বীকার করার মজ্জাগত অনীহা, এটাই হলো দুর্নীতির প্রথম রক্ষাকবচ। লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ যেখানে বাজি, যেখানে চব্বিশ লক্ষ পরিবারের মানসিক স্বাস্থ্য এক লহমায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সেখানে সরকারের প্রধান উদ্বেগ থাকে—কীভাবে 'প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা' বা 'সিস্টেমিক ফেইলিওর'-এর তকমা এড়ানো যায়। কারণ, ব্যর্থতা স্বীকার করলে যে গদির গরিমা ধুলোয় মিশবে! দায়বদ্ধতার চেয়ে ভাবমূর্তি রক্ষা যেখানে বড় হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে দুর্নীতি দূর করার সদিচ্ছা স্রেফ নির্বাচনী ইশ্‌তেহারের কালিতেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
২. তদন্তের প্রহসন ও ‘কিংপিন’ নিখোঁজের রহস্য
যেকোনও বড় কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার সবচেয়ে চেনা রাস্তা হলো তদন্তের ভার এমন এক সংস্থার হাতে তুলে দেওয়া, যারা অপরাধের চেয়ে 'প্রমাণের অভাব' খুঁজতে বেশি পারদর্শী। বিহার পুলিশ যখন এই কাণ্ডে সঞ্জীব কুমার ওরফে সঞ্জীব মুখিয়ার মতো এক কুখ্যাত প্রশ্ন ফাঁস মাফিয়ার নাম সামনে আনল, তখন চারিদিকে শোরগোল পড়ে গিয়েছিল। এই সঞ্জীব মুখিয়া কোনও নতুন নাম নয়; বিহারের শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা থেকে শুরু করে কনস্টেবল নিয়োগ— সব জায়গাতেই তার গ্যাংয়ের অবাধ বিচরণ ছিল।
কিন্তু কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা সিবিআই যখন তাদের চূড়ান্ত চার্জশিট পেশ করল, তখন দেখা গেল ৪৫ জন অভিযুক্তের তালিকায় সঞ্জীব মুখিয়ার নামই নেই! সিবিআই’র যুক্তি কী? ‘ডিজিটাল এভিডেন্স বা আর্থিক লেনদেনের কোনও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি।’
আইনের চোখে প্রমাণ ছাড়া কাউকে শাস্তি দেওয়া যায় না— এই আপ্তবাক্যটি আমরা সবাই জানি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, বছরের পর বছর ধরে যে ব্যক্তি এই ধরনের সমান্তরাল প্রশ্ন-বাজার চালিয়ে আসছে, এই নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তার জাল কতদূর বিস্তৃত ছিল যে কেন্দ্রীয় সংস্থাও তার নাগাল পেল না? নাকি পুরো ঘটনাটিকে ঝাড়খণ্ডের একটি নির্দিষ্ট স্কুল আর পাটনার একটি ছোট চক্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ দেখিয়ে দেওয়াটা রাজনৈতিকভাবে বেশি সুবিধাজনক ছিল? কারণ, যদি প্রমাণ হতো যে মুখিয়ার নেটওয়ার্ক দেশজুড়ে বিস্তৃত, তবে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে গোটা দেশের পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়ার ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিতে হতো। সেই বিশাল প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতা মোদী সরকারের ছিল না। তাই তদন্তের অভিমুখকে এমনভাবে সঙ্কুচিত করা হলো, যাতে সাপও মরে এবং লাঠিও না ভাঙে।
৩. বিচারালয়ের মহাজাগতিক দর্শন এবং তেলাপোকা তত্ত্ব
শিক্ষার্থীরা যখন নিজেদের অধিকারের দাবিতে, স্বচ্ছতার দাবিতে দিল্লির রাস্তায় নামল, পুলিশের লাঠি ও জলকামান সহ্য করল, তখন দেশের ভাগ্যবিধাতা হিসাবে তাঁরা তাকিয়ে ছিল সর্বোচ্চ আদালতের দিকে। কিন্তু ভারতের প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে শুনানির সময় যে পর্যবেক্ষণগুলো উঠে এল, তা লক্ষ লক্ষ তরুণ প্রজন্মের বুকে গভীর ক্ষতের সৃষ্টি করেছিল।
আদালতের বাইরে সোশাল মিডিয়ায় বিচারকদের সমালোচনা এবং কিছু আইনজীবীর আচরণে ক্ষুব্ধ হয়ে এই বছরেরই ১৫ মে প্রধান বিচারপতি মন্তব্য করেছিলেন যে, কর্মসংস্থানের অভাব এবং নিজেদের পেশায় জায়গা করতে না পেরে কিছু যুবক সর্বত্র 'তেলাপোকার মতো' (সংবাদমাধ্যম ও অনুবাদের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল) ছড়িয়ে পড়ছে— কেউ আরটিআই কর্মী হচ্ছে, কেউ সমাজকর্মী হচ্ছে, আর তারপর সিস্টেমকে আক্রমণ করছে।
কী অসামান্য এই দর্শন! যে দেশের যুবসমাজ বছরের পর বছর ধরে একটা সম্মানজনক চাকরির জন্য, একটা স্বচ্ছ পরীক্ষার জন্য নিজের যৌবনকে ঘরের কোণে বন্দি করে রাখছে, তারা যখন সিস্টেমের দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলে, তখন তারা হয়ে যায় 'আরশোলা'। আর যারা কোটি কোটি টাকার খেলা খেলে প্রশ্নপত্র চুরি করে, তারা যেন অদৃশ্য এক হাওয়া, যাদের ছোঁয়া যায় কিন্তু ধরা যায় না।
আদালতে যখন ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর হওয়া পুলিশি নির্যাতনের ভিডিও বা ডিজিটাল জালিয়াতির তথ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়, তখন পদ্ধতিগত নিয়মের দোহাই দিয়ে তা দেখতে অস্বীকার করা হয়। সাধারণ মানুষ আইনের সূক্ষ্ম মারপ্যাঁচ বোঝে না; তারা দেখে যে যখন তাদের ভবিষ্যৎ চুরি হয়ে যাচ্ছে, তখন দেশের সর্বোচ্চ আদালত বৈজ্ঞানিক ডেটা অ্যানালিটিক্সের দোহাই দিয়ে বলছে— ‘দেশজুড়ে ঢালাও ফাঁস হয়নি, তাই পরীক্ষা বাতিল হবে না।’ আইআইটি মাদ্রাজের দেওয়া সেই রিপোর্টের পেছনে যে তথ্য ফাঁকি থাকতে পারে, তা তলিয়ে দেখার চেয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখাটাকেই নিরাপদ মনে করা হলো।
৪. গোদি মিডিয়ার মহাকীর্তন: আসল অপরাধী যখন কাঠগড়ার বাইরে
এই পুরো সার্কাসের সবচেয়ে বিশ্বস্ত ও বিনোদনমূলক চরিত্র হলো আমাদের মূলধারার সংবাদমাধ্যম, যাদের ভালোবেসে 'গোদি মিডিয়া' বলে ডাকা হয়। যখন ২৪ লক্ষ শিক্ষার্থীর জীবন এক চরম অনিশ্চয়তার অন্ধকারে ডুবে রয়েছে, তখন প্রাইম টাইমের ঝাঁ চকচকে স্টুডিওতে কী নিয়ে আলোচনা হয়? কোনও বিরোধী শাসিত রাজ্যের তুচ্ছ ঘটনা, অথবা ধর্মীয় মেরুকরণের কোনও নতুন ছক।
যদি ভুল করেও কখনো নিট কেলেঙ্কারি নিয়ে স্টুডিওতে প্যানেল বসানো হয়, তবে আলোচনার মোড় এমনভাবে ঘোরানো হয় যেন অপরাধটা শিক্ষা মন্ত্রক বা প্রশ্ন চোরেরা করেনি, করেছে খোদ আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীরা। পর্দার ওপার থেকে স্যুটেড-বুটেড অ্যাঙ্কররা হাত-পা ছুঁড়ে চিৎকার করে প্রশ্ন করেন — ‘আপনারা কেন পরীক্ষা বাতিলের দাবি তুলে দেশের বদনাম করছেন? আপনারা কি চান না ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর বিশ্বের ভরসা থাকুক?’
সরকারকে ও নীতি-নির্ধারকদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সাহস এই দুর্নীতিগ্রস্ত সংবাদমাধ্যমের নেই। তারা ব্যস্ত থাকে 'সরকারের ভাবমূর্তি রক্ষায়' প্রলেপ লাগাতে। প্রশ্ন ফাঁসের মূল হোতাদের মুখোশ খোলার বদলে তারা খুঁজে বেড়ায়— এই আন্দোলনের পেছনে কোনও বিদেশি ষড়যন্ত্র বা রাজনৈতিক ইন্ধন আছে কি না! মেধার এই প্রকাশ্য শেষকৃত্যকে তারা ঢেকে দেয় বিদ্বেষ আর উগ্র উগ্র জাতীয়তাবাদের চাদরে।
৫. ভেঙে পড়া ব্যবস্থার চালচিত্র
নিট কেলেঙ্কারি কোনও একক ঘটনা নয়। বিগত কয়েক বছরে মধ্য প্রদেশের ‘ব্যাপম’, রাজস্থানের শিক্ষক নিয়োগ, উত্তর প্রদেশের পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগ থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি—সব রাজ্যেই শিক্ষাকে একটি লাভজনক কালো বাজারে পরিণত করা হয়েছে।
এই ব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট চক্র রয়েছে, যা বছরের পর বছর ধরে অবাধে কাজ করে চলেছে:
প্রথম ধাপ— পরীক্ষার বিজ্ঞপ্তি জারি হবে এবং লাখ লাখ শিক্ষার্থীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা ফর্ম ফিলাপের নামে তোলা হবে।
দ্বিতীয় ধাপ— পরীক্ষার ঠিক আগে প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়ে বাজারে বিক্রি হবে।
তৃতীয় ধাপ— ছাত্র-ছাত্রীরা যখন প্রমাণ সহ প্রতিবাদ করবে, সরকার প্রথমে তা সম্পূর্ণ অস্বীকার করবে এবং আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠি চালাবে।
চতুর্থ ধাপ— মিডিয়া বিষয়টিকে ঘুরিয়ে অন্য খাতে প্রবাহিত করবে।
পঞ্চম ধাপ— মামলা আদালতে যাবে, বছরের পর বছর চলবে, এবং অবশেষে 'প্রমাণের অভাবে' মূল চাঁইরা অধরাই থেকে যাবে।
এই চক্রের শেষ পরিণতি কী? পরিণতি হলো সেইসব সৎ, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তানদের স্বপ্নভঙ্গ, যারা কোচিং সেন্টারের ফি দিতে না পেরে নিজের ক্ষমতায় দিনরাত এক করে প্রস্তুতি নিয়েছিল। তারা অবসাদে, হতাশায় দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের মনের ভেতরের ক্ষোভ আর কান্না শোনার মতো কেউ এই সিস্টেমে নেই।
মেধার শেষকৃত্য ও নীরবতা
অমৃতকালের এই তথাকথিত প্রগতির আড়ালে আমরা আসলে এক পচনশীল শিক্ষাব্যবস্থার সাক্ষী হয়ে থাকছি। যে দেশে মেধার মূল্যায়ন হয় না, যেখানে সততার পুরস্কার হলো বেকারত্ব আর জালিয়াতির পুরস্কার হলো নীল বাতি লাগানো গাড়ি বা সরকারি কোটা, সেই দেশের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাচ্ছে, তা সহজেই অনুমেয়।
আজ যারা লক্ষ লক্ষ টাকার বান্ডিল ছড়িয়ে, প্রশ্নপত্র কিনে ডাক্তারির সিট দখল করল, তারা যখন চার-পাঁচ বছর পর গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে আমাদের বা আমাদের সন্তানদের চিকিৎসা করতে আসবে, তখন সেই সমাজের রূপ কেমন হবে? ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর হার বাড়লে কি তখন আবার নতুন কোনও তদন্ত কমিটি বসাবে সরকার?
এই শিক্ষা-সার্কাসে মেধার মৃত্যুতে অনেকে আজও নীরব দর্শক। সরকার তার গদি বাঁচাতে ব্যস্ত, তদন্তকারী সংস্থা প্রমাণ লোপাটে ব্যস্ত, আদালত তার সাংবিধানিক গরিমা রক্ষায় ব্যস্ত, আর সংবাদমাধ্যম ব্যস্ত চাটুকারিতায়। আর এই সবের মাঝে, দেশের সাধারণ নাগরিক আর অধিকারের দাবি তোলা যুবসমাজ সিস্টেমের চোখে স্রেফ এক-একটি 'তেলাপোকা'— যাদের কাজ শুধু পিষে মরে যাওয়া আর সিস্টেমের চাকার তলায় নিজেদের ভবিষ্যৎ সঁপে দেওয়া।
প্রতিবাদই গণতন্ত্রের শ্বাস
মেধার মৃত্যু কোনও এক ছাত্রের ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এ জাতির ভবিষ্যতের সংকেত।
যে সমাজে প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় না, সেখানে আগামী দিনের ডাক্তার, প্রকৌশলী, প্রশাসক — সবার যোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন থেকে যায়। আর সেই প্রশ্ন কেবল শিক্ষাব্যবস্থার নয়; রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থারও।
তাই এই লড়াই কোনও একটি দল, সরকার বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নয়। এ জবাবদিহির পক্ষে।  স্বচ্ছতার পক্ষে। এ সেই সব ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষে, যারা বিশ্বাস করে— পরীক্ষার হলে শুধু উত্তরপত্রেরই মূল্য থাকবে, টাকার বান্ডিলের নয়।
নীরবতা কখনও নিরপেক্ষতা নয়। অন্যায়ের সামনে দীর্ঘ নীরবতা শেষ পর্যন্ত অন্যায়েরই ভাষা হয়ে ওঠে। তাই শিক্ষা, মেধা ও ভবিষ্যতের প্রশ্নে— প্রশ্ন তোলা, জবাবদিহি চাওয়া এবং প্রতিবাদ করাই একজন গণতান্ত্রিক নাগরিকের নৈতিক দায়িত্ব।
আসুন, প্রশ্ন করি। স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করি। আর এই শিক্ষার দুর্নীতির নায়কদের অপসারণের দাবিতে ছাত্র-ছাত্রীদের লড়াইয়ের পাশে দাঁড়াই।
আজ ২৪ লক্ষের মধ্যে আপনার-আমার পরিবারের কেউ নাও থাকতে পারে, কিন্তু কাল অন্য কোথাও রাজনৈতিক দুর্নীতির শিকার হবে না– এই নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারেন কি?

Comments :0

Login to leave a comment