মীর আফরোজ জামান : ঢাকা ভারত- বাংলাদেশের লাগোয়া সীমান্তবর্তী পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই তথাকথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের’ থাকতে না দেওয়ার হুঙ্কার দিয়েছিলেন নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এই প্রেক্ষাপটে, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের বাস্তবতায়, সেখান থেকে বাংলাদেশে পুশ ইন-এর চেষ্টা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করেছিলেন অনেকে।
ঈদের দু’দিন আগে মঙ্গলবার বাংলাদেশের সাতক্ষীরা অংশে ভারতে হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে তথাকথিত ‘বাংলাদেশি’ পরিচয় দেওয়া কয়েকজনকে ভারত থেকে জোর করে বাংলাদেশে প্রবেশ করানোর চেষ্টা হয়েছিল। বিজিবি’র তৎপরতায় রুখে দিয়েছে পুশইনের ঘটনা। এমনটাই দাবি করেছেন সাতক্ষীরা ৩৩ বিজিবি’র লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী আশিকুর রহমান।
তিনি জানান, এই ধরনের চেষ্টা ঠেকাতে সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বিজিবি সদস্যরা। একইসঙ্গে সীমান্ত এলাকায় মাইকিংও চালানো হচ্ছে। ঈদের আগে গত ২৬ মে ভারত থেকে বাংলাদেশে পুশইনের সর্বশেষ চেষ্টা করা হয়েছিল। এরপর থেকে বিএসএফ এই চেষ্টা আর করেনি, বলেও দাবি করেন তিনি।
বাংলাদেশি পরিচয় দেওয়া কয়েকশো জনকে ভারত-বিজিবি’র কাছে হস্তান্তর করেছে কিনা, এই প্রশ্নের জবাবে আশিকুর রহমান বলছেন, এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি।
তিনি বলেন, ‘‘এই সীমান্ত দিয়ে পুশ-ইন তো হয়ই নি। এটা হওয়ার কোনও সুযোগও নাই। আমাদের কাছে যদি কাউকে হস্তান্তর করা হয় এটা তো একটা অথরাইজড প্রক্রিয়া, গোপনে গোপনে হওয়ার মতো তো কিছু নেই’’।
অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে যে তথ্য প্রচার করা হচ্ছে সেটি সঠিক নয় বলেও দাবি করেন তিনি।
আশিকুর রহমান বলছেন, ‘‘যে-সব অনলাইন পোর্টালে এরকম নিউজ করা হয়েছে তাদের অনেকের সঙ্গে আমরা যোগাযোগ করেছি যে, এরকম নিউজ আপনারা কোথায় পেলেন। তারা ভারতীয় বিভিন্ন নিউজ পোর্টালের বরাত দিচ্ছে’’
এছাড়া সাতক্ষীরার কাকডাঙ্গা-হাকিমপুর সীমান্ত নিয়ে বিজিবি’র এই কর্মকর্তা বলছেন, ‘‘অনেক আগে হাকিমপুর ছিল ট্র্যাডিশনাল রুট। কিন্তু সিচুয়েশন এখন আগের মতো নেই। আমরা কঠোরভাবে ওদের যে-কোনও ধরনের অ্যাটেম্পট প্রতিহতও করছি।’’
এদিকে, বাংলাদেশের সাতক্ষীরা জেলা সংলগ্ন ভারতের হাকিমপুর সীমান্তে অবৈধভাবে দেশটিতে যাওয়া কয়েকশো কথিত বাংলাদেশি ফেরার জন্য জড়ো হয়েছেন। ভারতের উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্তে সপ্তাহ খানেক ধরে প্রতিদিনই ‘বাংলাদেশি’ নাগরিক পরিচয়ে অনেকে যে জড়ো হচ্ছেন যা ভারতের বিভিন্ন মিডিয়ায় এসেছে। দাবি করা হচ্ছে যে, বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময় যারা অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছিলেন মূলত তারাই নিজ দেশে ফেরার জন্য এখন ওই সীমান্তে ভিড় করছেন। তাদের নথিপত্র যাচাই করে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য স্থানীয় ‘সেন্টার’ বা আটক শিবিরগুলোয় রাখা হচ্ছে বলেও জানা গেছে। এমনকি ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী শতাধিক কথিত বাংলাদেশিকে ইতোমধ্যে হাকিমপুর সীমান্ত দিয়ে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি’র হাতে তুলে দিয়েছে বলেও দুই দেশের একাধিক গণমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে। অবৈধ অনুপ্রবেশ, সীমান্ত হত্যা সহ নানা ঘটনায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে উত্তেজনা অনেকটা ধারাবাহিক রূপ নিয়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে। পুশ ইন-এর অভিযোগ কিংবা সীমান্ত হত্যা নিয়ে বাংলাদেশে ভারত দুই দেশের মধ্যে আগে থেকেই অস্বস্তি রয়েছে। কয়েকদিন আগেই সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার সোনারহাট সীমান্ত এলাকার দুই দেশের সীমান্ত রক্ষী বাহিনীর মধ্যে পালটাপালটি গুলিবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।
এদিকে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সম্প্রতি সাপ্তাহিক রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছেন,‘‘ভারতের পক্ষ থেকে অনুপ্রবেশকারীদের নথি যাচাই করার জন্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছিল আগেই, কিন্তু বাংলাদেশ সে বিষয়ে কোনও সাড়া দেয়নি। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেছেন, যদি বাংলাদেশ এ ব্যাপারে সাড়া না দেয় তাহলে ঘটনা অন্যরকম হতে পারে!’’
এ ব্যাপারে সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী কেড়াগাছি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন হাবিল বলছেন, ভারতের হাকিমপুরে অবৈধ বাংলাদেশি পরিচয়ে অনেক মানুষের জড়ো খবর থাকলেও বাংলাদেশ অংশে এ নিয়ে এখনও কোনও উত্তেজনা নেই। ‘‘আমি শুনছি যে হাকিমপুরে বাংলাদেশের লোক এক জায়গা করছে সব, কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ঢুকছে বলে খবর পাইনি।’’ সীমান্ত এলাকার পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে বলেই জানান সাতক্ষীরার একাধিক গণমাধ্যমকর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও। কলারোয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এইচ এম শাহীন এই প্রতিবেদক কে বলছেন, সীমান্তের ওপার থেকে নানা খবর পাওয়া গেলেও বাংলাদেশ অংশে এ নিয়ে এখনও তেমন কোনও উত্তেজনা নেই।
ভারত থেকে অনুপ্রবেশকারী বাংলাদেশি পরিচয়ে কাউকে হস্তান্তর করা হয়েছে, এই তথ্য সঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাউসার আজিজ।
গণশক্তিকে তিনি বলেন, ‘‘গত রাতেও বিজিবি’র যিনি এখানে অধিনায়ক তার সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, ওপার থেকে পুশ ইন এর চেষ্টা হয়েছিল, তবে তারা সফল হয়নি। বাংলাদেশ প্রান্তে বিজিবি সতর্ক আছে।’’
সাতক্ষীরার পাশেই ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা বাংলাদেশের আরেক জেলা যশোরের সীমান্ত এলাকায়ও অবৈধ অনুপ্রবেশ বা জোর করে কাউকে ভারত থেকে বাংলাদেশে পাঠানোর ঘটনা ঘটেনি।
যশোরের পুলিশ সুপার সৈয়দ রফিকুল ইসলাম এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, “সীমান্তে ভারত থেকে বাংলাদেশে জোর করে বা আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে পাঠানো হয়েছে এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি।”
Bangladesh Push In
চলছে মাইকিং, অতিরিক্ত পাহারা ‘পুশ ইন’ আটকাতে প্রস্তুতি ঢাকার
×
Comments :0