জয়ন্ত সাহা
ভুটান ও বাংলাদেশের সঙ্গে স্থল বানিজ্যের নতুন দিগন্ত খুলতো অনায়াসে, যা হচ্ছে না কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের সদিচ্ছার অভাবে! এ রাজ্যে স্থল বানিজ্যের প্রসঙ্গ উঠলেই পেট্রাপোলের নাম উঠে আসে কিন্তু উত্তরবঙ্গের মেখলিগঞ্জ, ফুলবাড়ি, মেহেদীপুর কিংবা দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি আজও ব্রাত্য হয়ে আছে। অথচ রেল পথের কাজ সম্পন্ন হলে কোচবিহারের হিলি থেকে দক্ষিণ দিনাজপুরের হিলি পর্যন্ত হতে পারে দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তর স্থল বানিজ্যের কড়িডোর। স্থল বানিজ্যের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীরা বলছেন, স্থল বানিজ্যের জন্য উত্তরবঙ্গে চাই মাল্টি মোডাল অত্যাধুনিক লজিস্টিক পার্ক। ট্রেন থেকে পন্য নামিয়ে লরিতে লোড করে বাংলাদেশে পাঠাতে চাই স্বয়ংক্রিয় ক্রেন আর বড় বড় ওয়ারহাউস। এখন পণ্য ওঠা নামায় সময় ও অর্থ দুইয়েরই অপচয় হয়। একই সাথে পেট্রাপোলের আদলে চ্যাংরাবান্ধা ও হিলির মধ্যে একটি সমন্বিত চেকপোষ্ট বা আইসিপি। আর প্রয়োজন সিঙ্গিল উইন্ডো ক্লিয়ারেন্স ব্যবস্থা। এটা হলে ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষার অবসান হবে। চ্যাংরাবান্ধার ইমপোর্ট ব্যবসায়ীদের দাবি চ্যাংরাবান্ধা এবং হিলি, ফুলবাড়িতে পণ্য বোঝাই লরি দাঁড়িয়ে থেকে তীব্র যানজটের সৃষ্টি করে। যানজট এড়াতে চাই ট্রান্সপোর্ট বন্দর বা ডেডিকেটেড ট্রাক টার্মিনাল।
উত্তরবঙ্গের কোন স্থল বাণিজ্যকেন্দ্রেই নেই চেইন কোল্ড স্টোরেজ। আধুনিক হিমঘর অত্যন্ত জরুরী।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত কোচবিহার, শিলিগুড়ি, মালদা এবং দুই দিনাজপুরে রয়েছে কৃষিজাত পণ্যের বিপুল ভান্ডার। কোচবিহারের চাল, ভুট্টা তামাক আর আলুর যেমন বাংলাদেশে ও ভুটানে চাহিদা রয়েছে তেমনি উত্তর দিনাজপুরের উন্নত মানের চালের বাংলাদেশে বড় বাজার রয়েছে। একই ভাবে মালদার আম, মাখানা ও পাটের বিপুল রপ্তানীর সম্ভবনা মার খাচ্ছে অনুন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে। এখন পরিকাঠামোর কারণে স্থল বাণিজ্য অত্যন্ত ধীর গতিতে চলে এবং ব্যয় সাপেক্ষও। একই ভাবে কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার ও জলপাইগুড়ি থেকে ফুন্টশিলিং-জয়গাঁ হয়ে ভুটানের সাথে বাণিজ্যও মার খাচ্ছে রেল ও সড়ক যোগাযোগ দূর্বল হবার কারণে। কেন্দ্র ও রাজ্যের উদাসীনতায় উত্তরবঙ্গের "এগ্রো এক্সপোর্ট হাব আজও গড়ে ওঠে নি।
অন্যদিকে, হিলি সীমান্তের স্থল বাণিজ্যে বড় ভূমিকা নিতে পারে বালুরঘাট-হিলি রেলওয়ে প্রজেক্ট। এখানে রেল যোগাযোগ হলে আর সড়কপথে পণ্য আসা নয় একেবারে বাল্ক কার্গো বা বিপুল পরিমাণে পণ্য আসা সম্ভব হবে। যাতে পণ্য পরিবহণে সাশ্রয় হবে। বাড়বে গতিও।
উত্তরবঙ্গের স্থল বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির সংযোগের জন্য সব জায়গায় হাইওয়ে আছে। কিন্তু হাইওয়ে থেকে স্থল বাণিজ্যের " জিরো পয়েন্ট" পর্যন্ত চাই চার লেনের রাস্তা।যার জন্য জমি অধিগ্রহণ করতে হবে সরকারকে। আর চাই কেন্দ্রের বরাদ্দ।
উত্তরবঙ্গের সব স্থল বাণিজ্য কেন্দ্রগুলিতেই বিএসএফ আর ব্যবসায়ীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে।বিএসএফ চায় নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে। যা অত্যন্ত ন্যায্য। কিন্তু চেকিং ব্যবস্থায় এতটুকুও উন্নত ব্যবস্থা আসে নি উত্তরের কোন স্থল বাণিজ্য কেন্দ্রেই।
ব্যবসায়ীরা চাইছেন এর থেকে মুক্তির জন্য লরিতে ইলেকট্রনিক কার্গো ট্র্যাকিং সিল এবং সীমান্তের গেটে বসুক ফুল ভিহিকেল স্ক্যানার। এটা হলে বিএসএফের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত হবে। সীমান্ত পার হতে পণ্যবাহী লরিকে আর লম্বা সময় অপেক্ষা করতে হবে না।
উত্তরবঙ্গের স্থল বাণিজ্য কেন্দ্রগুলির আরও এক বড় সমস্যা গত ১৫ বছরে অন্য ক্ষেত্রের মত এখানেও সেই ফড়ে কিংবা দালাল চক্রের রমরমা। হিলি থেকে চ্যাংরাবান্ধা সব জায়গাতেই এই সিন্ডিকেট রাজ বন্ধ না হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের হেনস্থা, হয়রানি কমবে না।
উত্তরবঙ্গের সীমান্তের স্থল বাণিজ্যের জন্য ট্রেড করিডোর হলে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সম্ভবনার নতুন দিগন্ত খুলতে পারে।
আগের সরকার চ্যাংরাবান্ধা উন্নয়ন পর্ষদ গড়লেও আখেরে কোন কাজেই লাগে নি স্থল বাণিজ্য কেন্দ্রের জন্য। নতুন সরকার আসার তিনমাস পরেও সেই পর্ষদ কার্যত আছে কিনা নেই সেটাও স্পষ্ট নয়। আর হিলি, ফুলবাড়ি কিংবা মেহেদিপুর নিয়ে কোন পরিকল্পনা গত ১৫ বছরে ছিল না এখনও নেই। ফলে স্থল বাণিজ্যের নতুন দিগন্ত আসার সম্ভবনা আপাতত চোখে পড়ছে না।
Comments :0