মুক্তধারা
অন্যকথা
স্বাধীনতার কিছু কিছু ইতিহাস ফিরে দেখা
সৌরভ দত্ত
১৭ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
পদাতিক কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়ের কবিতা পঙক্তির সরণি বেয়ে — "শতাব্দী শেষ হয়ে আসছে— একটু পা চালিয়ে, ভাই, একটু পা চালিয়ে চালিয়ে ভাই... এভাবেই হাঁটতে হাঁটতে ভারতের স্বাধীনতার ইতিহাসকে ফিরে দেখা।পায়ে পায়ে ভারতের স্বাধীনতার আশি বছর অতিক্রান্ত।একটা বিস্তৃত কালখণ্ড।জগৎবল্লভপুরে শিশু শিক্ষানিকেতন--মেরি গোল্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল। ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের রক্তঝরা দিনগুলোর ইতিহাস বড়োদের মুখে মুখে ফেরে। বয়স্করা যারা নিজেদের চোখ দিয়ে দেখেছেন ও শুনেছেন আসমুদ্রহিমাচল ভারতবাসীর গর্জন ইংরেজ ভারত ছাড়ো। সেদিন স্বাধীনতার রাতে সবাই বেরিয়ে পড়েছে রাস্তায়, রাস্তায়।এর মাঝে রয়ে যায় দেশভাগ ও উদ্বাস্তু শিবিরের ক্রন্দনধ্বনি।হাওড়া জেলা জুড়েও ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও সটীক ইতিহাস রয়েছে। প্রযুক্তি নির্ভরতার যুগেও মাঝেমধ্যে যদি ভারতের বিপ্লববাদের সমস্ত চরিত্রগুলো জীবন্ত হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত কথা বলে আপনাদের সামনে তাহলে কেমন হয়! তেমনি এক অভিচিন্তিত অভিমুখ থেকে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামীদের আত্মবলিদান,অহিংস আন্দোলন ও সশস্ত্র বিপ্লববাদে--দ্য গ্রেট রেভলিউশনারি মুভমেন্টকে সম্মান জানানোর সম্যক ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে।মেরি গোল্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল শিক্ষার্থীদের তুলে ধরল এমনই একটা আয়না।যেখানে পড়ুয়ারা ফ্ল্যাশব্যাকে গিয়ে ভারতবর্ষের আশি বছরের আগের সেই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের দিনগুলোকে দেখতে পায়। ওরা যেন ইতিহাস চেতনা সম্পর্কে আত্মবিস্মৃত না হয়।আর ওদের চোখেও যেন ফুটে ওঠে--ক্ষুদিরামের ফাঁসির দৃশ্য,নেতাজীর অন্তর্ধান,লক্ষ্মী বাঈয়ের অকুতোভয় সংগ্রাম,তাম্রলিপ্তে ভারত ছাড়ো আন্দোলনে গান্ধী বুড়ি মাতঙ্গিনীর ব্রিটিশ পুলিশের বুলেট আঘাতে লুটিয়ে পড়া,ভগৎ সিংয়ের হাসিমুখে ফাঁসিকাঠে আত্ম বলিদান, বিবেকানন্দের শিকাগোতে নতুন ভারতের জন্য উজ্জীবিত বক্তৃতা মালা। এছাড়াও আমরা যাদের ভুলতে বসেছি সেই সব মহান দেশ যোদ্ধাদের ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ পর্ব--রাইটার্স বিল্ডিং আক্রমণকারী বিনয়-বাদল-দীনেশ, সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী ক্ষুদিরামের সাথী প্রফুল্ল চাকী,বুড়িবালামের তীরের লড়াইয়ে অবতীর্ণ বাঘাযতীন,ভগৎ সিং-এর সহযোদ্ধা ও কেন্দ্রীয় সংসদ ভবনে বোমা নিক্ষেপকারী বটুকেশ্বর দত্ত, চট্টগ্রামের মুক্তিসূর্য মাস্টারদা সূর্য সেন, ইউরোপীয়ান ক্লাব আক্রমণের অন্যতম নারী যোদ্ধা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, দুর্ভিক্ষ পীড়িত কিশোর কবি সুকান্তের জন্মদিন,ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম মুখ উল্লাসকর দত্ত প্রমুখ উজ্জ্বল ক্রান্তিকারী ব্যক্তিত্বের নানাবিধ কর্মকাণ্ড। অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে সবই মজুত ছিল। অনুষ্ঠানের সূচনায় ছিল জাতীয় পতাকা উত্তোলন, জাতীয় সংগীত,মহান বিপ্লবীদের স্মরণে নিরবতা পালন।স্বাগত ভাষণ।স্বাধীনতার উদযাপনে শত শত পড়ুয়ার হাতে উদ্বেলিত ত্রিবর্ণ রঞ্জিত জাতীয় পতাকা ও স্বঘোষিত ধ্বনি--জয় হিন্দ, বন্দেমাতরম ধ্বনি, স্বাধীন ভারত কি জয় । ভারতের স্বাধীনতার আশি তম বর্ষপূর্তির প্রাক্কালে অভিনব সাজসজ্জা ও শৈল্পিক ভাবনায় শোভিত চতুর্থ শ্রেণির আব্দুল আহাত--শহীদ ক্ষুদিরাম, অষ্টম শ্রেণির আরিয়ান আলি--ভগৎ সিং,সপ্তম শ্রেণির অনির্বাণ দাস--নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু,অষ্টম শ্রেণির অন্বেষা মারিক--মাতঙ্গিনী হাজরা,নবম শ্রেণির সালমন--স্বামী বিবেকানন্দ,সপ্তম শ্রেণির ঐন্দ্রিলা সাউ--ঝাঁসির রানী লক্ষ্মী বাঈয়ের চলমান মডেল হয়ে নেমে এসেছিল গ্রামের রাস্তায়। স্কুলের শিক্ষার্থীদের নিজস্ব ব্যাণ্ড পার্টির দেশাত্মবোধক তান অনুরণিত হচ্ছিল জনমানসে।প্রতিটি শিশু ওদের চোখ দিয়ে ভারতের স্বাধীনতার পূর্বতন ইতিহাসকে ফিরে ফিরে দেখছিল ।ওদের চোখের মণিতে দৃপ্ত হয়ে উঠছিল সংগ্রামী যুগপর্বের স্বপ্নের সফর ও নতুন দিনের স্বপ্ন।ছোট্ট আব্দুল আহাত সেজেছে শহীদ ক্ষুদিরাম যে তার স্বঘোষিত ভাষ্যে বলেছে--আমিই শহীদ ক্ষুদিরাম বলছি ;কোনো সন্ত্রাসীবাদী নয়,তোমরা ভুলে যেও না আমাকে...নেতাজীর সাজে সজ্জিত পড়ুয়া বলছে-- তোমরা আমাকে রক্ত দাও...। তেজদীপ্ত মাতঙ্গিনী বলে উঠছে--তমলুকের আমার সাহসী ভারতবাসী,ভাই ও বোনেরা...ভগৎ সিং সোচ্চার কন্ঠে বলে-- ইনকিলাব জিন্দাবাদ... ঈয়ে ফিরিঙ্গি লোক সোচ্ তা হ্যায় কেয়া!... স্বামী বিবেকানন্দের বক্তব্যে অভিবাদনের সুর --আমার আমেরিকার সমস্ত ভাই ও বোনেদের আমি আমাদের সাংস্কৃতিক ও পরম্পরা সম্পর্কে অবগত করছি...দ্যুতিময় ঝাঁসির রানীর অভিঘাত --আমিই সেই ঝাঁসির রানী লক্ষ্মীবাঈ ,ঝাঁসি আমি তোমাদের কখনো দেব না কারণ মাতৃভূমি রক্ষার থেকে বড় ধর্ম আর কিছু নেই...। এভাবেই ফেলে আসা ইতিহাসের পদধ্বনি মুখরিত করছিল মানুষকে।তার সাথে রাস্তার বিভিন্ন পয়েন্টে দেশাত্মবোধক নৃত্যের নান্দনিক ভঙ্গিমা ।শিক্ষাব্রতী মানুষ, শিক্ষক-শিক্ষিকা, অভিভাবকদের উজ্জ্বল উপস্থিতিতে এভাবেই কচিকাঁচাদের নিয়ে এক অভিনব উদ্যোগ নিয়েছিল ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলটি। পড়ুয়াদের কাঁচা হাতের স্বরচিত কবিতা ,গল্পঃ,স্মৃতিকথা,গদ্য প্রভৃতি অসংখ্য লেখার সম্ভারে ও অদ্ভুত সুন্দর চিত্ররেখায় ও অন্যন্য কারুভাষে সেজে উঠেছিল মেরি গোল্ড ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের --"রেনবো" নামক দেওয়াল পত্রিকার "গ্লোরি অফ মনসুন্" সংখ্যাটি। পরিশেষে বলা যায় স্বাধীনতা আসে, স্বাধীনতা যায় সত্যিই দিন বদলায় কি! শিশু-কিশোররা সারাবছর ধরে সযত্নে বুকে পালন করে স্বাধীনতার স্বপ্ন।এই একটা দিন ওদের জন্য কোনো আমাদের কোনো অনুশাসন নেই ।নেই বিধিনিষেধ।ওরা সবাই আজ স্বাধীন,মুক্ত বিহঙ্গ,হাতে, মাথায় এঁকে নিয়েছে জাতীয় পতাকা,সবাই পরেছে স্বাধীনতার সাজ ... সেমিনার হলে মুক্তি সংগ্রামের উদ্দীপনামূলক গান বাজছে--
”মুক্তির মন্দির সোপান তলে
কত প্রাণ হলো বলিদান
লেখা আছে অশ্রুজলে .... “
Comments :0