TMC Split

মতাদর্শহীন রাজনীতির ঘরে ভাঙন

স্পটলাইট

প্রতীম দে
গত দেড় দশকে পশ্চিমবঙ্গে যে ‘দল ভাঙানোর রাজনীতি’ প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, তার প্রধান কারিগর ছিলেন মমতা ব্যানার্জি। মুকুল রায় থেকে শুভেন্দু অধিকারী যারা এই কাজে তাঁর দক্ষ সেনাপতি ছিলেন, তাঁরাও এক সময়ে দল বদলেছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দল থেকে নেতা-কর্মীদের তৃণমূলে নিয়ে আসার মাধ্যমে সংগঠন বিস্তারের কৌশল নিয়েছিল তৃণমূল। নির্বাচনী সাফল্যের জন্য এই কৌশল কার্যকর হলেও দীর্ঘমেয়াদে তার ফল কী হতে পারে তাও এখন দেখা যাচ্ছে। তৃণমূল দলটা ৮০টি বিধানসভা আসনে জেতার পরেও কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে। বিধানসভায় ৬০ জন বিধায়কই এখন বিজেপি নিয়ন্ত্রিত শিবিরে ঢুকে পড়েছেন। 
রাজনীতিতে মতাদর্শগত দৃঢ়তা না থাকলে দলের প্রতি আনুগত্যও থাকে না। বহু নেতা যারা ব্যক্তিগত স্বার্থ, অর্থ, ক্ষমতা কিংবা সুযোগের জন্য একটি দলে যোগ দেন, পরিস্থিতি বদলালে তাঁরাই অন্য দলে চলে যেতে পারেন। তৃণমূলের বর্তমান সঙ্কটকে অনেকেই সেই বাস্তবতার প্রতিফলন হিসাবে দেখছেন।
মতাদর্শহীন নেতাদের দলে নিয়ে ক্ষমতা কায়েম রাখার যে রাজনীতি মমতা ব্যানার্জি তৃণমূলে করেছেন তাতে বিজেপি’র উত্থানের পথই প্রশস্ত হয়েছে। ২০১১ সালে তৃণমূল সরকারে আসার পর প্রধান রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল সিপিআই (এম) ও বাম আন্দোলনের সাংগঠনিক শক্তিকে দুর্বল করা। গ্রাম পঞ্চায়েত থেকে শুরু করে কলেজ ক্যাম্পাস, শ্রমিক সংগঠন থেকে কৃষক আন্দোলন— সর্বত্র বামপন্থী কর্মীদের উপর হামলা, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং গণতান্ত্রিক পরিসর সঙ্কুচিত করার অভিযোগ বারবার উঠেছে। এই আক্রমণের ফলে একদিকে যেমন বামপন্থী সংগঠনগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অন্যদিকে রাজ্যের প্রধান বিরোধী শক্তি হিসাবে বিজেপি ক্রমশ জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি’র উত্থান এবং ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে প্রধান বিরোধী দলের মর্যাদা অর্জন সেই প্রক্রিয়ারই ফল বলে মনে করেন অনেক পর্যবেক্ষক। বামপন্থীদের বক্তব্য, যদি গণতান্ত্রিক বিরোধী রাজনীতির স্বাভাবিক পরিসরকে দমন করা না হতো, তাহলে বিজেপি’র মতো সাম্প্রদায়িক শক্তির পক্ষে এত দ্রুত জমি তৈরি করা সম্ভব হতো না।
বামপন্থী রাজনীতির আবহের কারণেই পশ্চিমবঙ্গে ‘আয়ারাম গয়ারাম রাজনীতি’র উৎপাত ছিল না। গত দেড় দশক ধরে তৃণমূল সেই রাজনীতিই আমদানি করেছে। টাকার লোভ দেখিয়ে, পুলিশের ভয় দেখিয়ে তারা বিরোধী দলের অনেক জনপ্রতিনিধিদের তৃণমূলে শামিল করেছিল। বাম সমর্থনে বিধানসভার উপনির্বাচনে জয়ী কংগ্রেসের প্রার্থী বাইরন বিশ্বাসকে ভোটের ফল বেরোনোর পরেই তৃণমূলে টেনেছিলেন মমতা ব্যানার্জি। সাম্প্রদায়িকতায় উসকানি দেওয়া বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয়কে তৃণমূলে টেনে মন্ত্রী করেছিলেন। মুকুল রায় তো কোন দলে আছেন তা ঠাহর করতে না পেরে যাহা তৃণমূল তাহাই বিজেপি বলে দিয়েছিলেন। মতাদর্শগত ভিত্তি দুর্বল হলে সংগঠনের ভিতও দুর্বল হয়। দলের নেতাদের ক্ষমতা ও প্রশাসনিক সুবিধার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ক্ষমতার ভারসাম্য বদলালে সেই সম্পর্কও বদলে যায়। যে নেতা একসময় অন্য দল ছেড়ে তৃণমূলে এসেছিলেন, তিনি আবার অন্যত্র চলে যেতে পারেন। এই বাস্তবতা এখন তৃণমূল ছেড়ে যাওয়াতেও স্পষ্ট হচ্ছে। বেআইনি সম্পত্তি, ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তৃণমূল বিধায়করা দলনেত্রীর ডাকা বৈঠকে যাচ্ছেন না, বিজেপি’র অঙ্গুলিহেলনে নতুন পরিষদীয় দল গড়ছেন। তৃণমূলের উবে যাওয়ার সঙ্কট শুধু একটা দক্ষিণপন্থী দলের অভ্যন্তরীণ সঙ্কটকেই দেখাচ্ছে না, আদর্শভিত্তিক রাজনীতির প্রয়োজনীয়তাকেও আবার সামনে এনে দেখাচ্ছে।

Comments :0

Login to leave a comment