Post Editorial

গুন্ডা দমন আইন, অশনি সংকেত যেখানে

সম্পাদকীয় বিভাগ

অসীমেশ গোস্বামী

এই রাজ্যে বিজেপি সরকার হঠাৎ একটা নতুন আইনে আনছে বা আনল বলা যেতে পারে এই আইনের নাম হচ্ছে পাবলিক অ্যাপটি অ্যা ন্ড কন্ট্রোল অব অ্যা ন্টি সোশাল একটিভিটিস বিল অথবা সংক্ষেপে গুন্ডা দমন আইন। এই আইন প্রচলন করার উদ্দেশ্য কি ? এই আইনের কোনও প্রয়োজন ছিল কি আদৌ? প্রচলিত যে আইনগুলি ফৌজদারি কার্যবিধিতে রয়েছে যেমন পুরানো ক্রিমিনাল প্রসিডিওর কোড যা বর্তমানে বিএনএসএস ২০২৩ এই আইনে একই রকম সমস্ত পদ্ধতি বলে দেওয়া আছে এর ভিত্তিতেই চিরটা কাল ধরে পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য সরকার চালিয়ে এসেছেন ডাঃ বিধান রায় থেকে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য পর্যন্ত। অবশ্য ১৯৭১ থেকে ১৯৭৬ এই সময়টা ব্যতিক্রমী। ঐ সময় অসংখ্য সাজানো এনকাউন্টার দেখা গেছে। মিসার মতো কুখ্যাত আটক আইন‌ও ছিল। ঐ সময়টা ছেড়ে দিয়ে বলা যায় যে বাকি সময়কালে সরকারগুলো প্রচলিত আইনের সাহায্যে প্রশাসন চালিয়েছিল।
আইনের প্রধান উদ্দেশ্য শান্তি শৃঙ্খলা রক্ষা করা। এই কর্তব্যে সরকারগুলি কতটা সফল হয়েছে সেটা অন্য কথা। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই যথাসম্ভব সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ভারসাম্য বজায় থেকেছে। নতুন কোনও বিনা বিচারে আটক আইন যা ব্রিটিশ আমলের ছিল সেই আইনের কোন প্রয়োজন পূর্বতন শাসকেরা বোধ করেননি। কিন্তু বর্তমানে এই বাংলার শাসকরা এই আইনটি নিয়ে আসছেন কেন,আসল উদ্দেশ্য কি ,সেটাই আমাদের আলোচ্য।
আগেকার আইনে  ছিল, যদি কোন ব্যক্তি কগ্নাইজেবল অফেনস  সংগঠিত করার মতো অবস্থায় থাকেন তাহলে তাকে পুরানো ফৌজদারি কার্যবিধি আইনের ১৫১ ধারায় গ্রেপ্তার করা হতো,  সেই ধারাটি এখন পরিবর্তিত হয়ে ১৭০ ধারা হয়েছে। এইরকমই অপরাধ প্রবণ খারাপ মানুষদের যারা সমাজের পক্ষে ,শান্তি শৃঙ্খলার পক্ষে বিপজ্জনক বলে প্রশাসন মনে করেছে তাদের জন্য পুরানো ফৌজদারি আইনে ১০৭ ধারা থেকে একশো দশ ধারা পর্যন্ত প্রভিশন ছিল যার দ্বারা সেই ব্যক্তিকে যার অপরাধ প্রবণতা রয়েছে তাকে পুলিশের কাছে ও কোর্টের কাছে কোর্টের আদেশ অনুযায়ী ভালো ভাবে থাকার জন্য গুড বিহেভিয়ার বন্ড দিতে হতো এবং এই এই বন্ড ছমাসের জন্য মেয়াদি থাকতো। এর দ্বারাই যারা সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক তাদের সরকার বা প্রশাসন তাদের ব্যবস্থা করত। বিএমএসএস অনুযায়ী এই ধারাগুলি পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে ১২৬ ১২৭-১২৯,  সুতরাং দেখা যাচ্ছে যে, যদি প্রশাসন মনে করে কেউ বিপজ্জনক ব্যক্তি তাকে প্রশাসন মুচলেকা দিতে বাধ্য করতে পারে কিন্তু সব সময় আদালতের অনুমতি নিতে হয় অর্থাৎ একটা বিচার ব্যবস্থা আছে যাকে অস্বীকার করে শুধু পুলিশ সেটা করতে পারে না। এটাই যুক্তিঙ্গত এবং আমাদের সংবিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্য পূর্ণ ।
শোনা যাচ্ছে গুন্ডা দমন আইন এমনভাবে প্রয়োগ করা হবে যে প্রশাসন যাকে মনে করবে সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক তাকেই ধরতে পারবে অর্থাৎ গ্রেপ্তার করতে পারবে এবং তারপর তাকে বিনা বিচারে এক বছর পর্যন্ত আটক করে রাখতে পারবে। এই ধরনের ক্ষমতা  সমাজের পক্ষে বিপজ্জনক। এর দ্বারা বিচার ব্যবস্থাকে অস্বীকার করা হচ্ছে। এটা কখনোই যুক্তিযুক্ত নয়। এই ধরনের ব্যবস্থা সংবিধান বিরোধী ।
এবার সংবিধানের কয়েকটা ধারা নিয়ে এবং সুপ্রিম কোর্ট প্রদত্ত বিভিন্ন মামলার সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনা করা যাক।
সংবিধানের ২২ নম্বর অনুচ্ছেদের দু’নাম্বারে বলা হয়েছে যে গ্রেপ্তার এবং আটক করলে পুলিশ তাকে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিকটতম ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে হাজির করাবে এবং ম্যাজিস্ট্রেট ঠিক করবেন যে সেই ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হবে না পুলিশ হেপাজতে দেওয়া হবে কিংবা জেল হেপাজতে পাঠানো হবে অর্থাৎ এটা আদালতের আয়ত্তে রয়েছে। এই ক্ষেত্রে আসামি, যাকে গ্রেপ্তার বা আটক করা হয়েছে, তার অধিকার আছে আইনজীবী নিযুক্ত করার। কিন্তু যদি আদালতে অগ্রাহ্য করে প্রশাসন কাউকে বিপজ্জনক বলে আখ্যা দিয়ে সরাসরি আটক করে জেলে পাঠিয়ে দিলে তাহলে সেটা সম্পূর্ণভাবে সংবিধান বিরোধী হবে এবং মানব অধিকার বিরোধী হবে এমনকি সংবিধানে 21 অনুচ্ছেদে যে রাইট টু লাইফ দেওয়া আছে সেটাও ভঙ্গ হবে এটা খুবই অনুচিত এবং বেআইনি এতে কোনও সন্দেহ নেই।
এই সরকারের হালচাল মোটেই মানব অধিকার বা গণতন্ত্রের পক্ষে নয় দেখা যাচ্ছে। যেমন যাকে প্রশাসন গ্রেপ্তার করছে তাকে প্রকাশ্যে হ্যান্ডকাফ লাগাচ্ছে। কোমরে দড়ি দিয়ে মানুষের সামনে রাস্তায় প্যারেড করাচ্ছে। এটা সংবিধান বিরোধী কাজ। সুপ্রিম কোর্টে বহু আগেই এই সম্পর্কে সতর্কতা জানিয়ে সিদ্ধান্ত ঘোষিত হয়েছে যেমন, প্রেম সংকর শুক্লা বনাম দিল্লি প্রশাসন। ১৯৮০ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই রায় দিয়েছেন। এরপর বহু মামলায় একই ধরনের রায় দেওয়া হয়েছে এবং সব রায়ের মূল অভিন্ন শর্ত হচ্ছে যে সাধারণত কাউকেই হাতকড়া লাগানো যাবে না একমাত্র এক্সট্রা অর্ডিনারি ক্ষেত্রে যেমন, জঙ্গিদের ক্ষেত্রে। এ রাজ্যে সাধারণ নাগরিকের ক্ষেত্রে এই ধরনের আচরণ পুলিশ করতে পারে না,এটাই দেশের আইন। সুপ্রিম কোর্ট এবং ভারতীয় সংবিধান সেই কথাই বলে কিন্তু ক্রমাগত  সরকার লঙ্ঘন করে চলেছে।
কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে আসামিকে বা অভিযুক্ত ব্যক্তিকে জোর করে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দেওয়ার জন্য চাপ দেওয়া  হচ্ছে, এটাও সংবিধান বিরোধী সংবিধানের কুড়ি নম্বর তিন ধারায় বলা হয়েছে যে কোনও অভিযুক্তকে থেকে নিজের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে বাধ্য করা যাবে না ,২০১০ সালে সুপ্রিম কোর্ট সেলভি বনাম স্টেট অফ কর্নাটক কেসে এই রায় দিয়েছে।
কয়েকটি রাজ্যে মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে যে পুলিশ হেপাজতে থাকাকালীন কোনও অভিযুক্তের মৃত্যু হচ্ছে যাকে বলা হয় custodial death, এই ক্ষেত্রে সুপ্রিম কোর্ট বহু দিন ধরে বলে আসছেন যে যারা অর্থাৎ যে সমস্ত পুলিশ আধিকারিকরা এই মৃত্যুর জন্য দায়ী হবে তাদের বিচার করতে হবে এবং দোষ প্রমাণ হলে সাজা দিতে হবে। কিন্তু শুধু তাই নয় ,যিনি এই কেসের শিকার বা ভিকটিম তার পরিবারকে যথাযথ কম্পেন্সেশন বা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। এই রায় সুপ্রিম কোর্ট বার বার  দিয়েছেন । বিখ্যাত রায় হচ্ছে রোদুল শাহ বনাম বিহার রাজ্য সরকার ,১৯৮৩ সালে। আরও একটি বলা যেতে পারে সেটাও খুব বিখ্যাত ।সুপ্রিম কোর্ট ১৯৮৬ সালে ভীম সিং এমএলএ বনাম জম্মু কাশ্মীর প্রশাসন এই মামলাতে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে। custordial death সম্পর্কে আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি .
আলোচ্য গুন্ডাদমন আইনে একটি ভয়ানক ক্ষতিকারক মানবাধিকার হানিকারক দিক রয়েছে। তা হলো প্রশাসনের চোখে যাকে বিপজ্জনক বলে মনে হবে তাতেই আটক করা যাবে এবং বিনা বিচারে সে বন্দি থাকবে এক বছর। এই জিনিস স্বাধীন ভারতে চলতে পারে না। আদালতকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা সমর্থন করা যায় না। এই আইন ব্রিটিশ আমলের ১৯১৯ সালে কুখ্যাত রাওলাট আইনের মতো। রাওলাট আইনে বলা হয়েছিল যে প্রশাসন বিপজ্জনক ব্যক্তিকে দু’বছর আটক করে রাখতে পারবে বিনা বিচারে। বর্তমান আইনের সঙ্গে তফাৎ এইটুকুই বর্তমান আইন দু'বছর মেয়াদ কমিয়ে এক বছর মেয়াদ করেছে। মেয়াদ যাই হোক এটা সংবিধান বিরোধী। বিচার বিভাগকে উপেক্ষা করার শামিল মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন রাইট টু লাইফকে অস্বীকার করা। এই আইনে পশ্চিমবঙ্গের ভালো কখনোই হবে না। কোনও অবস্থাতেই আদালতকে অস্বীকার করা যাবে না এটা করলে তা হবে সংবিধান বিরোধী। এই অশনি সংকেত এখন দেখা যাচ্ছে। কোনও গণতান্ত্রিক সমাজে এটা চলতে পারে না। মনে হয় এর প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে বিরোধী পক্ষের কণ্ঠস্বর রোধ করা এবং একচ্ছত্র শাসন প্রতিষ্ঠা করা। এটা শুধু স্বৈরাচার নয়,নয়া ধরনের ফ্যাসিবাদ। এই ফ্যাসিবাদকে সমর্থন করা যাবে না। যদি আজকে কেউ চুপ করে থাকেন তাহলে তাকেও ভুগতে হবে ভবিষ্যতে। তাই এই আইনের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠার সময় এবং এই কারণে যারা গণতন্ত্র মানুষ ,মানবাধিকার প্রিয় মানুষ তারা ঐক্যবদ্ধ ভাবে প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ না করলে খুবই ক্ষতি হয়ে যাবে। আদালত ও সংবিধানের মৌলিক চাহিদা ও দৃষ্টিভঙ্গি লংঘনকারী আইন প্রত্যাহার দাবি করতে হবে। ন‌ইলে সৃষ্টি হবে ভয় ও সন্ত্রাসের রাজত্ব।
 

Comments :0

Login to leave a comment