শমীক লাহিড়ী
রাত যত গভীর হয়, শহর তত নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। কিন্তু সেই নীরবতার মধ্যেই কোনও কোনও রাতে ইতিহাসের পাতায় রাতের চেয়েও গভীর অন্ধকার নেমে আসে বুলডোজারের গর্জনে।
কেউ তখন ঘুমোচ্ছে। কেউ পরদিনের দোকানের জন্য মাল গুছিয়ে রাখছে। কেউ হয়তো ভাবছে, ভোরবেলা প্রথম ট্রেনের যাত্রীদের হাতে এক কাপ চা তুলে দিয়ে দিনের প্রথম আয়টা করবে। কিন্তু হঠাৎ আলো ঝলসে ওঠে। আসে পুলিশ, আসে বুলডোজার। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই মুছে যায় পঞ্চাশ বছরের সংসার। কেউ কাঁদতে কাঁদতে বলে, “স্যার, পায়ে পড়ছি, দোকানটা ভাঙবেন না।” কেউ বলে, “বাড়িতে ছেলে-মেয়ে আছে। কাল থেকে তারা খাবে কী?” কিন্তু মানুষের আর্তচিৎকার শোনার হৃদয় লুটেরা পুঁজির থাকে না।
আজ বলা হচ্ছে রেলস্টেশন হবে জাপানের মতো। হবে দুবাইয়ের মতো। হবে ইউরোপের মতো চকচকে। স্টেশনে থাকবে বড় বড় ব্র্যান্ড, ঝকঝকে শোরুম, এয়ারকন্ডিশন্ড ফুড কোর্ট। ভালো প্রস্তাব। খুবই ভালো।
ঠিক এমনই প্রস্তাব এসেছিল নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময় থেকে বিমানবন্দর আধুনিকীকরণের ক্ষেত্রেও। ছোট এয়ারপোর্টের অস্বস্তি কাটিয়ে ঝাঁ-চকচকে চোখ ধাঁধানো বিমানবন্দর দেখে আমরা অনেকেই মুগ্ধ হয়ে পড়েছিলাম। অসাধারণ কাচের স্থাপত্য, স্ফটিকের মতো মেঝে, ঝলমলে আলো। আহা! সেই বিমানবন্দরে আজ স্টারবাকস্, কেএফসি, ওয়াও মোমো ইত্যাদি নামী-দামি ব্র্যান্ডের গন্ধ ম-ম করছে। কিন্তু এক কাপ কফির দাম ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা। সাধারণ যাত্রীর চা-কফির নেশা, পেটের খিদেই ছুটে যায় দামের তালিকায় চোখ রাখলে।
এরকমই হবে দমদম, বারাসত, বারুইপুর, মেচেদা কিংবা বাংলার আরও বহু স্টেশনে। পাহাড় থেকে শিলিগুড়ি হয়ে নামা মধ্যবিত্ত বা নিম্ন-মধ্যবিত্ত যাত্রীদের তখন আর স্টেশনে চা-কফি খাওয়ার সামর্থ্য থাকবে না। ‘দর্শনং ভোজনং’ ভেবেই পেটে গামছা বেঁধে বসে থাকতে হবে।
কিন্তু এর সঙ্গেই আরও কয়েকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকে যায়।
জাপানের মতো স্টেশন চাই, খুব ভালো কথা। কিন্তু জাপানের মতো সময়ানুবর্তী ট্রেন কবে পাবে তো যাত্রীরা? ইউরোপের মতো অবকাঠামো চাই, ভালো কথা। কিন্তু ইউরোপের মতো যাত্রী নিরাপত্তা কবে পাব? দুবাইয়ের মতো শপিং আর্কেড চাই, তাতেও আপত্তি নেই। কিন্তু সাধারণ মানুষের জন্য সাশ্রয়ী খাবার, পরিষ্কার শৌচালয় এবং নির্ভরযোগ্য পরিষেবা কবে নিশ্চিত হবে?
রেলের জমিতে চা বিক্রি করা যদি অপরাধ হয়, তাহলে বছরের পর বছর ঘণ্টার পর ঘণ্টা ট্রেন দেরিতে চালানো কি যাত্রীদের প্রতি অন্যায় নয়? যে মানুষ বৈধ টিকিট কেটে ট্রেনে ওঠে, অথচ ভিড়ের চাপে নিজের রিজার্ভ আসন ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়, তার অধিকার রক্ষা করা কি রেলের দায়িত্ব নয়? যে মা রাতের ট্রেনে মেয়েকে নিয়ে যেতে ভয় পায়, যে যাত্রী মোবাইল বা মানিব্যাগ চুরি যাওয়ার আতঙ্কে ঘুমোতে পারে না, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা কি উন্নয়নের অংশ নয়?
আরও একটি প্রশ্ন স্বাভাবিক ভাবেই উঠে আসে। যে মানুষটিকে আজ অবৈধ দখলদার বলে দেখানো হচ্ছে, সে কি গতকাল হঠাৎ আকাশ থেকে নেমে এসেছে? পঞ্চাশ-ষাট বছর ধরে স্টেশনের পাশে দোকান চালানো মানুষগুলো কি রেলের অজান্তে সেখানে ছিল? যে চায়ের দোকান থেকে প্রতিদিন রেলকর্মী, পুলিশ, যাত্রী—সকলেই চা খেয়েছেন, সেই দোকান কি একদিনেই কোনও এক শাসকের ইচ্ছায় বেআইনি হয়ে গেল?
আসলে সমস্যা বেআইনি দখল নয়। সমস্যা হলো, সেই জমির বাজারদর বেড়ে গেছে। আগে যেখানে একজন চায়ের দোকানদার বা হকার কোনোরকমে সংসার চালাতো, সেখানে এখন একটি বড় কর্পোরেট সংস্থা লক্ষ লক্ষ টাকা মুনাফা করতে পারে। তাই জায়গা একই আছে, বদলে যাচ্ছে শুধু মালিকানা।
ইতিহাস সাক্ষী দেয়, পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই একই ঘটনা ঘটেছে। গরিব মানুষের বসতি উচ্ছেদ করে, ছোট ব্যবসাকে ধ্বংস করে, বড় পুঁজির জন্য জায়গা তৈরি করা হয়েছে। একে বলা হয়েছে আধুনিকীকরণ। কিন্তু আধুনিকীকরণের নামে যখন জীবিকা ধ্বংস হয়, তখন তার নাম উন্নয়ন নয়, নৃশংস অমানবিক উচ্ছেদ।
ভারতীয় রেলের ইতিহাস কিন্তু অন্য কথা বলে।
রেল শুধু একটি পরিবহণ ব্যবস্থা নয়। রেলকে ঘিরে গড়ে উঠেছে এক বিশাল জীবিকা-নির্ভর অর্থনীতি। চা-ওয়ালা, বইওয়ালা, কুলি, ফল বিক্রেতা, খাবারের দোকান, ছোট হোটেল, লজ, সাইকেল স্ট্যান্ড— লক্ষ লক্ষ মানুষ রেলকে কেন্দ্র করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। স্টেশন কেবল যাত্রী ওঠানামার জায়গা নয়। এটি একটি জীবন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চল। সেই অঞ্চলকে ভেঙে যদি কেবল কর্পোরেট ব্র্যান্ডের জন্য জায়গা তৈরি করা হয়, তাহলে স্টেশনের রং বদলাবে ঠিকই, কিন্তু সমাজের বৈষম্য আরও গভীর হবে।
আজ উন্নয়নের সংজ্ঞাটাকেই বদলে দেওয়া হচ্ছে। অর্থনীতিতে উন্নয়ন মানে— কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কৃষি ও মানুষের আয় বৃদ্ধি। এখন লুটেরা পুঁজি আর রাষ্ট্রের মেলবন্ধনে উন্নয়নের সংজ্ঞা হয়েছে— কাচের দেওয়াল, এলইডি স্ক্রিন, এসি লাউঞ্জ, ফুড কোর্ট। মানুষের আয় না বাড়লেও চলবে। বেকারত্ব বাড়লেও চলবে। কৃষক ঋণে ডুবে থাকলেও চলবে। শুধু চারপাশটা চকচকে দেখাতে হবে। রাষ্ট্র যেন বলছে — ‘তোমার পকেটে টাকা না থাকলেও সমস্যা নেই, তুমি অন্তত সুন্দর একটা স্টেশন তো দেখতে পাচ্ছো।’ কিন্তু শুধু সৌন্দর্য দেখে মানুষ বাঁচে না। মানুষ বাঁচে রুটি, রুজি এবং মর্যাদায়।
আজ যারা বলছেন,‘‘স্টেশন পরিষ্কার করতে হলে উচ্ছেদ তো করতেই হবে’, তাদের কাছে একটি প্রশ্ন আছে। জাপান, জার্মানি কিংবা চীনে যখন বড় অবকাঠামো তৈরির প্রকল্প হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনও বাধ্যতামূলক। সেখানে কোনও প্রকল্প বাস্তবায়িত করার আগে দেখা হয়— কত মানুষ কাজ হারাবে? তাদের বিকল্প কর্মসংস্থান কী হবে? ক্ষতিপূরণ কত দেওয়া হবে? কিন্তু মোদীর ভারতবর্ষে সে প্রশ্ন করা হয় না। কারণ এখানে গরিব মানুষের জীবনকে আয়ের খাতায় ধরা হয় না। কর্পোরেট সংস্থার এক দিনের লোকসান সংবাদমাধ্যমের প্রথম পাতায় জায়গা পায়। কিন্তু কয়েক লক্ষ দোকানদারের ভবিষ্যৎ অন্ধকারে চলে গেলে তা কেবল একটি প্রশাসনিক বিজ্ঞপ্তি হয়েই থাকে। অদ্ভুত এক সময়ে আমরা বাস করছি! যেখানে প্ল্যাটফর্মের চায়ের দোকানকে ‘উন্নয়নের পথে বাধা’ বলা হয়, কিন্তু কোটি কোটি টাকার কর্পোরেট সুবিধাকে বলা হয় ‘বিনিয়োগ’। যেখানে গরিব মানুষের জীবিকা অর্জনের রাস্তা বন্ধ করা হয়, ধনী কর্পোরেটদের লুটের রাস্তাকে চওড়া করার প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য। স্টেশনের সৌন্দর্য নিয়ে বড় বড় আলোচনা চলছে, কিন্তু উচ্ছেদ হওয়া মানুষের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আলোচনা হয় না। এখানেই আসল বৈষম্য।
একদিকে হাজার হাজার কোটি টাকার ঋণখেলাপিরা ব্যাঙ্কের সঙ্গে সমঝোতা করে, সাধারণ মানুষের আমানতের টাকা লুট করে নিচ্ছে– তাতে উন্নয়ন ব্যাহত হয় না, কিন্তু দশ ফুট বাই আট ফুটের একটি দোকান নিয়ে বসে থাকা মানুষটিকে বলা হয়— ‘তুমি উন্নয়নের পথে বাধা’। একদিকে কর্পোরেটদের জন্য জমি, কর ছাড়, ভর্তুকি এবং বিশেষ সুবিধা। অন্যদিকে সাধারণ হতদরিদ্র মানুষের জন্য বুলডোজার। রাষ্ট্র যখন শক্তিশালীর প্রতি নরম এবং দুর্বলের প্রতি নির্মম হয়ে ওঠে, তখন সেই রাষ্ট্রের অর্থনীতি ক্রমশ কয়েকজন ধনকুবেরের স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে পরিণত হয়।
আজ রেলহকারদের ক্ষেত্রে যা হচ্ছে, কাল অন্যান্য ক্ষেত্রেও তাই হবে। একসময়ে বোঝানো হয়েছিল, রাষ্ট্রায়ত্ত বা সরকারি কারখানায় ছাঁটাই করা, কারখানা বন্ধ করে দেওয়া, বেসরকারি হাতে জলের দরে তুলে দেওয়াটাই নাকি উন্নয়ন! প্রচার হয়, স্থায়ী কর্মচারী বা শ্রমিক রাখলে নাকি দেশ ও দশের ক্ষতি হয়! ফল— আগের প্রজন্ম কারখানায় কাজ করে ২৫ হাজার টাকা স্থায়ীপদে মজুরি পেত। আজ একই কাজ করে অস্থায়ী পদে তাদেরই ছেলেমেয়ে ১৫ হাজার টাকা মজুরি পাচ্ছে, অনেক বেশি শিক্ষিত এবং প্রশিক্ষিত হয়েও। চাষে ব্যবহৃত সার, কীটনাশক, ডিজেল ইত্যাদিতে ভর্তুকি দিলে নাকি দেশ ও দশের ক্ষতি হয়! ফল - ১৫ বছর আগের ১৩ টাকার চাল আজ ৭০ টাকা। বড় বড় মালিকানার সংবাদ মাধ্যম এসব প্রচারে অনেক মানুষকে প্রাথমিকভাবে ভুলও বোঝাতে পেরেছিল। আজও অনেকেই এধরনের প্রচারে হয়তো বিভ্রান্ত হচ্ছেন।
প্রশ্নটা কেবল একটি স্টেশনের নয়। প্রশ্ন হলো— আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলতে চাই? এমন একটি সমাজ, যেখানে মানুষের শ্রমের চেয়ে বড় ব্র্যান্ডের সাইনবোর্ডের মূল্য বেশি হবে? নাকি এমন একটি সমাজ, যেখানে উন্নয়ন হবে, কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকবে মানুষ? কারণ রাষ্ট্র যদি স্টেশনকে শপিং মলে পরিণত করে, আর সাধারণ মানুষকে সেখানে অবাঞ্ছিত করে তোলে, তাহলে স্টেশনের সৌন্দর্য বাড়বে হয়তো, কিন্তু গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ধূলিসাৎ হয়।
প্রশ্নটা আসলে স্টেশন সুন্দর হবে কি হবে না, সেটা নয়। প্রশ্নটা হলো— এই সৌন্দর্যের মূল্য কে দেবে? এসি শোরুমে বসা ব্যবসায়ী নয়। মূল্য দেবে সেই চা-ওয়ালা, যে ভোর চারটায় উঠে গরম জলের কেটলি উনুনে চড়ায়। মূল্য দেবে সেই বইওয়ালা, যে হাজার যাত্রীর হাতে খবরের কাগজ তুলে দেয়। মূল্য দেবে সেই বৃদ্ধ মানুষটি, যার জীবনের শেষ সম্বল ছিল স্টেশনের ছোট্ট দোকানটা। আর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে, সাধারণ রেলযাত্রীদের, যারা এখনও ৫ টাকায় চা খেতে পারেন, ১০ টাকায় মুড়ি-ঘুগনি দিয়ে কাজে যাবার বা ফেরার পথে টিফিন সারেন।
আরও একটি মৌলিক প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া যায় না। একটি রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব কী? মানুষকে কাজের সুযোগ করে দেওয়া, নাকি তার কাজ কেড়ে নেওয়া?
আজও ভারতে কয়েক কোটি শিক্ষিত যুবক স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান দাবি করে, সামগ্রিক বেকারত্বের হার কমেছে, কিন্তু যুবকদের মধ্যে বেকারত্ব এখনও উদ্বেগজনক। আরও বড় বাস্তবতা হলো — কর্মসংস্থান অল্পবিস্তর কোনও কোনও ক্ষেত্রে বাড়লেও তার বড় অংশই অনিশ্চিত, অস্থায়ী এবং স্বল্প আয়ের কাজ। দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ আজও অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্র, ক্ষুদ্র ব্যবসা এবং স্বনিযুক্তির উপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন।
রাষ্ট্রের কাজ তো মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করা। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অন্তত যে মানুষ নিজের সামান্য পুঁজি, নিজের শ্রম আর ঘাম দিয়ে দু’মুঠো অন্নের ব্যবস্থা করেছে, তার জীবিকায় আঘাত করার অধিকার রাষ্ট্র কোথা থেকে পায়? যে চা-ওয়ালা কোনও কর্পোরেট ঋণ মকুবের সুবিধা পায়নি, যে হকার কোনো ভরতুকি চায়নি, যে ছোট দোকানদার রাষ্ট্রের কাছে হাত না পেতে নিজের পরিশ্রমে সংসার চালিয়েছে, তাকে উচ্ছেদ করার নৈতিক অধিকার কারও থাকতে পারে না। অদ্ভুত বৈপরীত্য হলো— যে রাষ্ট্র কোটি কোটি মানুষের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে পারে না, সেই রাষ্ট্রই আবার খেটে খাওয়া মানুষগুলোর রুজির উপর বুলডোজার চালিয়ে নিজেদের দম্ভ দেখাচ্ছে।
বেড়েই চলেছে সারাদিনের জীবনযাত্রার ব্যয়। রান্নার গ্যাস, খাদ্যপণ্য, চিকিৎসা, শিক্ষা— প্রায় সব ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষের খরচ বেড়েছে। কিন্তু আয় বাড়েনি সেই অনুপাতে। ফলে একটি ছোট দোকান, একটি চায়ের স্টল, একটি বইয়ের স্টল বা একটি ফলের দোকান অনেক পরিবারের কাছে শুধু ব্যবসা নয়, বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। তাই এই উচ্ছেদ কেবল কয়েকটি দোকান ভাঙার ঘটনা নয়। এটি এমন এক সময়ে মানুষের জীবিকার উপর আঘাত, যখন কাজের নিরাপত্তা কমছে, জীবনের খরচ বাড়ছে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্রমশ গভীর হচ্ছে।
উন্নয়ন অবশ্যই দরকার। কিন্তু উন্নয়ন যদি মানুষের মাথা ভেঙে দেয়, যদি লক্ষ মানুষের রুজি কেড়ে নিয়ে কয়েকটি বড় ব্র্যান্ডের জন্য ব্যবসার জায়গা তৈরি করে, যদি স্টেশনকে সুন্দর করে, অথচ মানুষের জীবনকেই ধ্বংস করে— তাহলে তাকে উন্নয়ন বলা যায় না। তাকে বলা হয় লুটেরা পুঁজির লুটের রাস্তাকে প্রশস্ত করা। মনে রাখা দরকার— এসব উচ্ছেদ সাধারণ যাত্রীদের চলাচলের সুবিধার জন্য করা হচ্ছে না, বরং এটা করা হচ্ছে গুটিকয়েক বৃহৎ কর্পোরেটের মুনাফার পথ আরও প্রশস্ত করার জন্যই। এই সৌন্দর্যায়ন আসলে এক ভয়ঙ্কর বৈষম্যের স্থাপত্য।
একটি সভ্য রাষ্ট্রের সাফল্য তার স্টেশনের মার্বেল পাথরে মাপা হয় না। মাপা হয় সেই রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিকে কতটা মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং বেঁচে থাকার অধিকার দিতে পারল, তার মাধ্যমে। কারণ স্টেশন শুধু ইট, সিমেন্ট আর কাচের নির্মাণ নয়। রেলের স্টেশন মানে মানুষের বেঁচে থাকার কাহিনি। স্টেশন মানে জীবিকা। স্টেশন মানে কয়েক লক্ষ সাধারণ মানুষের জীবন সংগ্রাম। আর যে উন্নয়ন মানুষের জীবন মুছে দিয়ে শুরু হয়, ইতিহাস তাকে কখনও ক্ষমা করে না।
দমদম লড়েছে, পারেনি মানে কোনোদিন পারবে না, তা নয়। যাদবপুর আপাতত রুখে দিয়েছে। আরও বহু জায়গায় লড়াই চলছে। রুটি-রুজির লড়াই শেষ হয়ে যায় না। ইতিহাসের প্রতিটি পরিবর্তনের শুরু হয়েছে মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্নকে ঘিরেই। তাই এই লড়াইও শেষ লড়াই নয়, বরং নতুন সরকারের দানবীয় পদক্ষেপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের শুরু, অশ্লীল রকমের ধনী কর্পোরেটের পা-চাটা সরকারগুলো হয়তো আজ নিজেদের প্রভুদের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত। কিন্তু ইতিহাসের শেষ বিচার কখনও বুলডোজার করে না, করে মানুষ।
আর সেই বিচার একদিন হবেই।
Comments :0