বিশ্বজিৎ দাস: গুয়াহাটি
দু’দিন আগেও ১০০টি আসন নিয়ে বিজেপি-জোটের প্রত্যাবর্তন ঘটবে বলে সদম্ভে বলে বেড়াচ্ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী হিমন্তবিশ্ব শর্মা। কিন্তু বিদেশে বিপুল সম্পত্তি ও তাঁর স্ত্রীর নামে তিন দেশের পাসপোর্ট থাকার খবর ফাঁস হতেই ঢোক গিলতে শুরু করেছেন তিনি। এখন বলছেন ৬৫ আসন নিয়েও সরকার গড়বে বিজেপি। আসামে মোট আসন ১২৬টি। মঙ্গলবার বিকেলে আসামে ভোট-প্রচার শেষ হয়েছে। আগামী বৃহস্পতিবার রাজ্যে এক দফায় ভোটগ্রহণ হবে। ভোটের আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে হিমন্তবিশ্ব শর্মার গলায় আত্মবিশ্বাসের সেই চেনা সূর আর শোনা যাচ্ছে না। দুর্নীতির অভিযোগ ধামাচাপা দিতে কখনো কংগ্রেস নেতা পবন খেরাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে তাঁর দিল্লির বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে দিচ্ছেন। কখনো বলছেন, বিদেশে তাঁর কোনও সম্পত্তি যে নেই, তা প্রমাণ করতে শঙ্করদেবের জন্মস্থান বটদ্রবা আশ্রমে বসে ভাগবত ছুঁয়ে তিনি কসম খেতে প্রস্তুত। যদি তা মিথ্যা হয়,তাহলে বাহাত্তর ঘণ্টার মধ্যে তাঁর মৃত্যু ঘটবে। এরকম মন্তব্য করতে হচ্ছে।
টানা দশ বছর ক্ষমতায় থাকার পর আসামে বিজেপি এবার কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। যে পাঁচটি রাজ্যে নির্বাচন হচ্ছে, এরমধ্যে একটি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। বাকি চারটি রাজ্যে বিরোধীদের সরকার। বিরোধীদের হাত থেকে একটিও ছিনিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়, তা বুঝে গেছেন মোদি-শাহ। উলটে আসামের ক্ষমতা যদি হাতছাড়া হয়, বিরোধী শিবির উজ্জীবিত হবে। তাই আসামকে ধরে রাখতে সর্বশক্তি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। হিমন্তবিশ্ব শর্মার কাছে এবারের নির্বাচন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, এই প্রথম তাঁর নেতৃত্বে ভোটে লড়ছে দল। কিন্তু এবারের পরিস্থিতি ২০১৬ বা ২০২১ এর মতো যে নয়, তা হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন মোদী-হিমন্ত। কংগ্রেসের পনেরো বছরের শাসনের ব্যর্থতা, কংগ্রেসের কোন্দল ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রাজনীতি চাঙ্গা করে ২০১৬ তে প্রথমবার আসামের ক্ষমতায় আসে বিজেপি। ২০২১ এ মুসলিম বিদ্বেষ চাঙা করে দ্বিতীয়বার ক্ষমতা দখল করে। কিন্তু দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় এসে মুখ্যমন্ত্রী বদল করে সর্বানন্দ সনোয়ালের জায়গায় হিমন্তবিশ্ব শর্মাকে গদিতে বসান অমিত শাহ। হিমন্তবিশ্বের নেতৃত্বাধীন সরকার খোলস ছেড়ে দাঁত-নখ বের করে দিয়েছে। আসামকে পুঁজিপতিদের অবাধ লুটের মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত করতে আমজনতার উপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস নামিয়ে এনেছে। বিগত পাঁচ বছর আসামে সাধারণ মানুষের উপর বুলডোজার চালিয়ে লুটতরাজ কায়েম করেছেন হিমন্তবিশ্ব শর্মা। হিন্দু-মুসলিম, অসমিয়া-বাঙালি বিভাজনের রাজনীতি চাঙা করে আদানি-আম্বানি-রামদেবকেই সেবা করছে বিজেপি সরকার। তা জনগণের কাছে স্পষ্ট হয়ে গেছে। দুর্নীতিতে আগের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে হিমন্তবিশ্ব শর্মা সরকার। মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রীদের দেশবিদেশে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি। পাহাড় প্রমাণ কালো টাকার মালিক। ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার। পুলিশকে দলদাসে পরিণত করা। সরকারি প্রশাসন যন্ত্রকে বিকল করে বিজেপি দপ্তরে সমান্তরাল প্রশাসন যন্ত্র গড়ে তোলা। এসব কর্মকাণ্ডে মানুষের মধ্যে বিজেপি-র বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। উপরন্তু সঙ্গীতশিল্পী জুবিন গর্গের রহস্য মৃত্যুর ঘটনায় বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে শিল্পীর অনুরাগীরা ক্ষুব্ধ।
আসন পুনর্বিন্যাসের নামে নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে হিন্দু-মুসলিম সমীকরণে নতুন করে আসন পুনর্বিন্যাস করলেও আদতে এর ফায়দা তোলা বিজেপি-র জন্য কঠিন হব। সংখ্যাগুরু অসমিয়া ভাষী নিবিড় উজান আসামে বিজেপি-র অবস্থা নড়বড়ে হয়ে গেছে। জোরহাট, গোলাঘাট, ধেমাজি, লখিমুপর ও শিবসাগর এই পাঁচটি জেলায় বিজেপি কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে। ডিব্রুগড়, ধেমাজি, মাজুলি ও শোনিতপুর জেলায় বিরোধীদের সঙ্গে মুখোমুখি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। নিম্ন আসামের বরপেটা, ধুবড়ি জেলায় বিজেপি-র পিছিয়ে আছে। পাহাড়ি কার্বি আংলঙে অর্ধেকের বেশি আসনে বিরোধীরা এগিয়ে। বরাক উপত্যকায় ১৩ টি আসনের মধ্যে মধ্যে ৭টির বেশি জয়ের সম্ভাবনা দেখছে না বিজেপি-র। বরাকে দুটি বিধানসভা আসন হ্রাস করা, করিমগঞ্জ জেলাকে কেটে ছোট করা, কাছাড় জেলার ১৯টি গ্রামকে কেটে ডিমাহাসাওয়ের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া, সর্বোপরি বরাকের প্রতি বঞ্চনাকে কেন্দ্র করে বিজেপি-র বিরুদ্ধে ক্ষোভ তীব্র আকার নিয়েছে। ভোটের বাক্সে এর প্রতিফলন ঘটার সম্ভাবনা রয়েছে। কংগ্রেসকে দুর্বল করতে দলের কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ভাঙিয়ে বিজেপি-তে নিলেও ভোটারদের মধ্যে এর তেমন প্রভাব পড়েনি। হিমন্তবিশ্ব শর্মার মন্ত্রীসভার এক সদস্য, মোদীর মন্ত্রীসভার প্রাক্তন এক সদস্য সহ দলের একাধিক শীর্ষ নেতা বিজেপি ছেড়ে কংগ্রেস অন্য বিরোধী দলে যোগ দিয়েছেন।
অন্যদিকে, বিজেপি-বিরোধী ভোট ভাগাভাগি রুখতে দেরিতে হলেও ছয়টি প্রধান বিরোধী দল ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। ফলে বিরোধী ভোট ভাগাভাগির সুযোগ নেই। বিরোধীদের প্রচারে ব্যাপক সাড়া লক্ষ্য করা গেছে। গোপনে বিজেপি-র হয়ে কাজ করা বদরুদ্দীন আজমলের ইউডিএফ এবারের নির্বাচনে প্রায় ব্রাত্য। তাতে বিজেপি-র পক্ষে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ তীব্র করা সহজে হচ্ছে না। এই রাজনৈতিক চিত্রে আসামে প্রত্যাবর্তন নয়, পরিবর্তনের হাওয়া তুঙ্গে। ফলে চিন্তার ভাঁজ হিমন্তের কপালে।
Vote Assam 2026
ভোটের মুখে সুর নামিয়ে হিমন্ত এখন বলছেন ৬৫ আসনের কথা
×
Comments :0