কৌশিক দাম: ধূপগুড়ি
খবরের কাগজে আর টিভির পর্দায় যখন ডবল ইঞ্জিন সরকারের ‘উন্নয়নের জোয়ারের’ ঢাক পিটানো হচ্ছে, ঠিক তখনই জলপাইগুড়ি জেলার ধূপগুড়ি ব্লকের প্রান্তিক আদিবাসী মহল্লা ‘মুন্ডাপাড়া’ যেন এক মধ্যযুগীয় অন্ধকারে দিন কাটাচ্ছে। খাতায়-কলমে জলপাইগুড়ি জেলার অংশ হলেও, ডুডুয়া নদীর ওপারে অবস্থিত এই জনপদ আদতে এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ। স্বাধীনতার সাড়ে সাত দশক পার হলেও, আদিবাসী মুন্ডা সম্প্রদায়ের এই শ্রমজীবী মানুষের কাছে শিক্ষার আলো কিংবা ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবা আজও পৌঁছায়নি। সবকিছুর জন্যই তাঁদের চাতকের মতো চেয়ে থাকতে হয় প্রতিবেশী আলিপুরদুয়ার জেলার ফালাকাটা ব্লকের ধনীরমপুর-২ অঞ্চলের দিকে। জলপাইগুড়ির মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যোগাযোগের কোনো রাস্তা নেই। ‘উন্নয়ন’ শব্দটাই এই তল্লাটের প্রান্তিক মানুষের কাছে আজ এক নিষ্ঠুর রসিকতা। মুন্ডাপাড়ায় পৌঁছানো যেন এক অগ্নিপরীক্ষা। ধূপগুড়ি ব্লকের গাদং ১ গ্রাম পঞ্চায়েতের শিলবাড়িঘাট দিয়ে ডুডুয়া সেতু পেরিয়ে ফালাকাটা ব্লকের খগেনহাটের পথে প্রায় দেড় কিলোমিটার যাওয়ার পর, ডানদিকের কাঁচা আলপথে নামতে হয়। বড় রাস্তা থেকে টোটো চড়ে এই মেঠো পথটুকু পার হতেই পকেট থেকে ৫০ টাকা খসে যায়। মূল ভূখণ্ড থেকে এই এলাকাকে আড়াআড়ি ভাগ করে রেখেছে সিঙ্গিমারি নদী। গ্রামবাসীদের নিজেদের পকেটের টাকায় তৈরি একটি নড়বড়ে বাঁশের সাঁকোই নদী পারাপারের একমাত্র ভরসা। বছরের পর বছর দাবি জানিয়েও সিঙ্গিমারি নদীর ওপর একটা পাকা সেতু জোটেনি। ভাঙা সাঁকো দিয়ে বৃদ্ধা শাশুড়িকে ধরে ধরে পার করাচ্ছিলেন এলাকার গৃহবধূ মণি মুন্ডা। ক্ষোভ উগরে দিয়ে তিনি বললেন, ‘‘এখানে সহজে আমাদের ছেলেমেয়েদের বিয়ে হতে চায় না। একবার যাঁরা সম্বন্ধ দেখতে এসে রাস্তাঘাটের এই হাল দেখেন, তাঁরা আর ফিরে তাকান না। এভাবেই নরককুণ্ডে বাঁচতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি আমরা। ভোট আসে, ভোট যায়, আমরা আর কাউকেই বিশ্বাস করি না।’’
ধূপগুড়ি ব্লকের ১৫/২২৬ নম্বর বুথের এই আদিবাসী মহল্লায় শেষ দেড় দশকে এক কোদাল মাটিও পড়েনি রাস্তায়। ইঁট বিছানো পাকা রাস্তার দাবি তো বহু দূরের কথা। পঞ্চায়েত থেকে প্রশাসন চরম উদাসীন। জন প্রতিনিধিদের দেখা মেলে শুধু ভোটের মরশুমে, ভোট ফুরোলেই তাঁরা গায়েব। গত পাঁচ বছরে জনপ্রতিনিধিকে ক’বার এলাকায় দেখা গেছে, তা মনেই করতে পারেন না বাসিন্দারা। গ্রাম থেকে তিন কিলোমিটার দূরে ফালাকাটার মন্টুর মোড়ে পৌঁছালে তবেই মেলে বাজারহাট বা সামান্য বাস-অটোর সুবিধা।
বর্ষা এলে মুন্ডাপাড়ার দুঃখ দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়ায়। একদিকে সিঙ্গিমারি নদীর পাড় ভাঙন, অন্যদিকে ডুডুয়া নদীর বানের জলে প্লাবিত হয় গোটা গ্রাম। তখন পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায় এই আদিবাসী অঞ্চলের জীবনযাত্রা। নদীর পাড়ে কোনোমতে টিকে থাকা বাঁশের সাঁকোর পাশে বসে পারাপারের জন্য কারও সাহায্যের অপেক্ষা করছিলেন বৃদ্ধা পরাণি মুন্ডা। ছলছল চোখে তাঁর আকুতি, ‘‘পাকা রাস্তা,পানীয় জল কিছুই চাই না বাবু। শুধু পথটুকু একটু চলার যোগ্য করে দিক। ঘরে পড়ে থেকে বিনা চিকিৎসায় মানুষের এই মরণ আর দেখতে পারি না।’’
ঠিক তখনই আকাশ থেকে ঝিরঝির করে নামছিল বৃষ্টি। সিঙ্গিমারি নদীর গ্রাসে হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ছিল পাড়ের মাটি। পরাণি মুন্ডাদের অপেক্ষার অবসান ঘটে না। বর্তমান ডবল ইঞ্জিন সরকারের ফাঁকা স্লোগানের আড়ালে মুন্ডাপাড়া আজও এক বড় প্রশ্নচিহ্ন এ জন্মে আদৌ কি শেষ হবে তাঁদের এই বঞ্চনার অন্ধকার? স্থানীয় মানুষ অবশ্য আর হাত গুটিয়ে বসে থাকতে রাজি নন, বঞ্চনার অধিকার বুঝে নিতে এখন আন্দোলনের পথেই সমাধান খুঁজছেন তাঁরা।
Comments :0