অরিজিৎ মন্ডল ও পূজা বোস
গ্রন্থাগারিক নিয়োগ নেই দীর্ঘদিন। রাজা রামমোহন রায় লাইব্রেরী ফাউন্ডেশন এর প্রজেক্ট দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত হয়না ফলে সমস্যায় পড়েছে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা। বামপন্থীদের কাছে বই পাড়া দাবি জানাচ্ছে, দীর্ঘ ৩৪ বছর যেভাবে নিয়মিত বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে বামপন্থীরা যেভাবে বই পাড়ার পাশে থাকতো, সরকারে আসলে সেই ব্যবস্থাকেই যেন নিয়মিত করা হয় সে কথাই বলছেন নবজাতক প্রকাশনের কর্ণধার বুলবুল ইসলাম। বুধবার কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজের সামনে "বইপাড়া বাঁচাও কনক্লেভ" অনুষ্ঠিত করে সিপিআই(এম)। এদিন এই কনক্লেভে বক্তব্য রাখেন সিপিআই(এম) কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী, বিদ্যাসাগর বিধানসভা কেন্দ্রের প্রাক্তন বিধায়ক ও রাজ্যের শ্রমিক আন্দোলনের নেতা অনাদি সাহু, জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী ভরতরাম তিওয়ারি এবং এসএফআই রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে। সভা পরিচালনা করেন সিপিআই(এম) নেতা সংগ্রাম চ্যাটার্জি।
সভায় রাজ্যের প্রাক্তন বাম পরিষদীয় দলনেতা সুজন চক্রবর্তী বলেন, "বই পাড়া বাঁচানোর কথা বামপন্থী সহ সমাজের সকল অংশের মানুষকেই বলতে হবে। বই পাড়ার জন্য বামফ্রন্ট সরকার কলেজস্ট্রিটের উত্তর দিকে বর্ণ পরিচয় মার্কেট তৈরি করেছিল যেখানে বই পাড়ার সমস্ত স্টল স্থায়ীভাবে বসতে পারত। কিন্তু ২০১১-তে তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর বর্ণপরিচয় মার্কেট নিয়ে কোন উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। রাজ্যে দীর্ঘদিন ধরে লাইব্রেরী গুলিতে নিয়োগ নেই। তিন-চারটি করে লাইব্রেরী দায়িত্ব সামলাতে হয় একজন লাইব্রেরিয়ানকে। রাজ্যে আট হাজারের বেশি স্কুল বন্ধ হয়ে গিয়েছে, স্কুলগুলিতে লাইব্রেরিয়ান সহ শিক্ষক নেই। ফলে প্রত্যক্ষভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে বই পাড়াকে ও। বই পাড়াকে বাঁচানো জরুরী আমাদের আগামী প্রজন্মের স্বার্থে। বইপাড়া বাঁচলে শুধু প্রকাশক বা বইয়ের সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকরা বাঁচবে তা নয় আমাদের রাজ্য কৃষ্টিকে বাঁচাতে হলে সাহিত্য সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হলে বইপাড়াকে বাঁচাতেই হবে।
বই পাড়া দীর্ঘ ৭ বছর ধরে ধুকছে। বই ছাপা হচ্ছে কিন্তু বই বিক্রি হচ্ছে না। বইপাড়ার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রজেক্ট এর আওতায় বই কেনার কথা, সেক্ষেত্রে অর্ধেক টাকা দেওয়ার কথা রাজ্য সরকারেরও কিন্তু দীর্ঘদিনধরেই সেই টাকা দেওয়া হচ্ছে না। রাজ্য সরকারের স্কুল শিক্ষা দপ্তরের তরফে বইয়ের অর্ডার দেওয়া হলেও সেই বই কেনা হচ্ছে না। হিন্দু স্কুলে বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থার বই মজুদ করে রাখা হচ্ছে। আজ চার বছর সেই বই বিক্রি হয়নি। মোট প্রায় ১৩০ কোটি টাকার রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন প্রজেক্টে আওতায় বই কেনা স্থগিত হয়ে রয়েছে। এর ফলে যেমন সমস্যায় পড়ছেন প্রকাশনা সংস্থাগুলি সেইসঙ্গে সমস্যায় পড়ছে দপ্তরী পাড়ার বিভিন্ন ছোট ব্যবসায়ী শ্রমিক কর্মচারীরা। বই বিক্রি না হলে স্বাভাবিকভাবেই সেই টাকা শ্রমিক কর্মচারীদের হাতে পৌঁছাবে না। স্বাভাবিকভাবেই তাদের অবস্থাও দুর্বিষহ।"
এই কনফ্লেভে বক্তাদের পাশাপাশি বই পাড়ার বিভিন্ন মানুষ তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। বর্ণপরিচয় মার্কেটের দুরবস্থার কথা বলেন একজন। তিনি বলেন, বর্ষায় একাধিকবার বই পড়ার বিভিন্ন দোকানের ক্ষতি হয়েছে। তাই সব দোকানের বইগুলিকে একটি নির্দিষ্ট জায়গায় রাখার ব্যবস্থা করা হোক। বই বাঁধাই কারখানার এক মালিক জানালেন, বই বাধানোর জন্য শ্রমিকদের আর পাওয়া যাচ্ছে না। তারা অন্য রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হয়ে চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। সেইসঙ্গে, বই পাড়ার নিকাশি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অনেকে। তাঁরা বলেন, শেষ কয়েক বছর একাধিকবার বইপাড়ায় জল জমে কয়েক কোটি টাকার বই নষ্ট হয়েছে। আগেও বই পাড়ায় জল জমতো কিন্তু জল বের করার জন্য কর্মীদের ঠিক সময় পাওয়া যেত। এখন কলকাতা কর্পোরেশনে কর্মী নেই ফলের জল দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকছে। ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন প্রকাশক ও বিক্রেতারা।
অনাদি শাহু বলেন, "নির্বাচন উপলখ্যার এই আলোচনা হচ্ছে তবে এই আলোচনার প্রয়োজন ছিল। নির্বাচন চলে গেলেও এই বইপাড়া থাকবে কিনা, এই বই পাড়ার সঙ্গে বাংলা শিক্ষা এবং সংস্কৃতির জগতে যে লক্ষ লোকও মানুষ জড়িয়ে আছেন এবং বইপড়ার পুরোনো ঐতিহ্য একটা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছে। একসময় শিক্ষার কেন্দ্র হয় উঠেছিল কলকাতার এই বইপাড়া। এই বইপাড়া এবং তাকে কেন্দ্র করে সংস্কৃতিক চর্চার যে কেন্দ্র রয়েছে তা বাংলা কেন ভারতবর্ষের আর কোনও জায়গায়ই খুঁজে পথ যাবে না। এই অঞ্চলের উন্নয়ন তথা শিক্ষা এবং সংস্কৃতির উন্নয়নে বাম সরকার সেই আমলে এই অঞ্চলের জন্য বিভিন্ন সময় অর্থ বিনিয়োগ করেছিল এবং শিক্ষা কে সকলের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলো। বইপড়ার সেই স্বর্ণ যুগকে যদি ফিরিয়ে আনতে হয়, বইপাড়া এবং তারসঙ্গে যুক্ত সমস্ত মানুষকে আমরা বাঁচতে পারবো যদি বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়।"
জোড়াসাঁকো বিধানসভা কেন্দ্রের বামফ্রন্ট মনোনীত সিপিআই(এম) প্রার্থী ভরতরাম তিওয়ারি সভায় বলেন, গোটা দেশ ও রাজ্যের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র হলো এই বইপাড়া। সমস্ত গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও বিকল্প মত যেখানেই তৈরি হয় বইয়ের মাধ্যমে। বামপন্থীরা বই পাড়ার কথা বিধানসভায় তুলে ধরবে এবং বই পাড়ার মানুষের স্বার্থে বামপন্থীরাই আগামী দিনে লড়াই করবে।
Comments :0