Post Editorial

জিডিপি বাড়ছে, সঙ্কটও বাড়ছে জীবনযাত্রায়

সম্পাদকীয় বিভাগ উত্তর সম্পাদকীয়​

ঈশিতা মুখার্জি

২০২৬-২৭ আর্থিক বছরের প্রথম চার মাসের পরিসংখ্যান ভারতের অর্থনীতিকে খাতায় কলমে উন্নতির শিখরে নিয়ে গেছে বলে দেশের প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে জানালেন। কেন্দ্রীয় সরকার সাংবাদিকদের জানালেন এবং ফলাও করে প্রচার করলেন যে, এই অর্থবর্ষ শুরু হয়েছে দেশের সম্বৃদ্ধি দিয়ে। প্রেস ইনফর্মেসন ব্যুরোর সমাচারে পয়লা সেপ্টেম্বর দেশবাসীকে জানানো হয় যে, এপ্রিল থেকে জুলাই মাস পর্যন্ত দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার ৭.৮শতাংশ হয়েছে, এবং ২০২৩-২৪ থেকে কোনোদিন এত বৃদ্ধি হয়নি। এইভাবে নাকি সারা বিশ্বে ভারতই সর্বশ্রেষ্ঠ বলে নিজেকে দাবি করতে পারে। যে অর্থনীতি এত চাঙ্গা সেই অর্থনীতিতে মানুষ কেমন আছে? সমস্যা বা ধাঁধাঁ যাই বলি না কেন, আমাদের দেশের এরকমই পরিসংখ্যান যে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হার খাতায় কলমে বাড়লেও দেশের বেশির ভাগ মানুষের খাবার থালায় ভাত-রুটি-ডাল-সবজি উধাও হয়ে যায়, দেশের বেশির ভাগ মানুষের হাতে কাজ থাকে না, দেশে আর্থিক বৈষম্য চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছায়, কৃষিতে বিপন্নতা অতীতের রেকর্ড ছাপিয়ে যায়। ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি’ কিন্তু সকল দেশের রানি সে হতে পারে না, সে দেশ দারিদ্র, ক্ষুধা, আর্থিক বৈষম্যে অনেক দেশের চেয়ে পিছিয়ে যায়। কেমন করে সম্ভব এই ধাঁধাঁ? দেশের সরকার যা বলছে, দেশের মানুষের প্রতিদিনের বেঁচে থাকার অভিজ্ঞতা ঠিক তার বিপরীত তথ্য দিচ্ছে। জিডিপি বৃদ্ধির হার বাড়ছে, কিন্তু দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবনযাত্রার মান কমছে। এই ধাঁধাঁর উত্তর কি?

এই কয়েক মাসের বৃদ্ধির হার যদি বিশ্বে ভারতকে এক নম্বরে তোলে, তবে বৈষম্য, ক্ষুধায় আর অন্য সূচকে বিশ্বে ভারতের স্থান কেমন? বিশ্ব আর্থিক বৈষম্য রিপোর্টের ২০২৫ সালের তথ্য দেখাচ্ছে যে ভারত সারা বিশ্বে সবচেয়ে আর্থিক বৈষম্যের দেশ। এ দেশে ১শতাংশ ধনীতম মানুষের হাতে দেশের সম্পদের ৪০শতাংশ মালিকানা রয়েছে। ১০শতাংশ ধনীতমদের হাতে রয়েছে দেশের সম্পদের ৬০শতাংশএর মালিকানা। দেশের ৯০শতাংশ -৯৫শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা জিডিপি বৃদ্ধির হার দিয়ে নির্ধারিত হয় না, তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের এই বিষয়ে কোনও উৎসাহ থাকার কথা নয়। ২০১৪ থেকে ২০২৪ ধনী-দরিদ্রের ফারাক বাড়তে বাড়তে চলেছে। গত কয়েক বছরে দেশের সরকার এই বেড়ে যাওয়া আর্থিক বৈষম্য কমানোর কোনও চেষ্টা করেনি, অথবা চেষ্টা করলেও তার কোনও ফল আমরা দেখিনি। বছর বছর দরিদ্র মানুষ আরও দরিদ্র হয়েছে এবং ধনীতমদের হাতে সম্পদের মালিকানা বৃদ্ধি পেয়েছে। দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। 
দেশের সরকার জানাচ্ছে যে, দেশের মানুষের ভোগব্যয় বেড়ে গেছে। কিন্তু দেশে মূল্যবৃদ্ধির হার তো বেড়েছে। সে হিসাবে তো একই পরিমাণ জিনিসের টাকার অঙ্কে দাম বাড়বে, এটাই কি স্বাভাবিক নয়? কিন্তু টাকার অঙ্কে বেশি খরচ হলেও তো প্রকৃত অর্থে কম জিনিস কেনা সম্ভব অঙ্কের হিসাবে। আমাদের দেশে কি এমনটাই ঘটছে না? বাজারে গিয়ে প্রতিদিন আরও বেশি টাকা খরচ করে আরও কম জিনিস কিনে কি আমরা ফিরে আসি না? দিনে দিনে দেশের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা গড়ে সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। এই ভোগ্যপণ্যের উপর ব্যয় নিয়ে বৈষম্যের গিনি সূচক দিয়ে বিশ্বব্যাঙ্ক দেখায় যে ভারতের বৈষম্য কমেছে কিন্তু আয় বা সম্পদের ভিত্তিতে আর্থিক বৈষম্যে ভারতের স্থান বিশ্বে ১৪৭। তা গত বছরের এবং তার আগের বছরের স্থান থেকে নিচে। বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ভারতের স্থান নেমে গেছে ফি বছর। ২০২৫ সালে বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে ১২৩টি দেশের মধ্যে ভারতের স্থান ছিল ১০২। ভারতকে তীব্র ক্ষুধার দেশ বলা হয় এবং দেশের না খেতে পাওয়া মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আশঙ্কার কথা এই যে শিশুদের মধ্যে ক্ষুধার্তের সংখ্যা বাড়ছে। নিঃসন্দেহে সরকার যা নিয়ে গর্ববোধ করছে, তা দেশের আগামী দিনের দেশ গড়বে যারা সেই শিশুদের ভবিষ্যতের তোয়াক্কা না করে।
দেশের জিডিপি’র মধ্যে কৃষি, শিল্প ও অন্যান্য ক্ষেত্রের অবস্থা সম্পর্কে এই পরিসংখ্যান কি জানাচ্ছে? এই জিডিপি বৃদ্ধির কারণ যে মুদ্রাস্ফীতি তা সরকারও মেনে নিয়েছে কারণ মুদ্রাস্ফীতির হার তো সরকারি পরিসংখ্যানেই প্রকাশিত হয়েছে। এই জিডিপি বৃদ্ধির হারের মধ্যে দেখা যায় সবচেয়ে বেশি হারে বৃদ্ধি পেয়েছে আর্থিক পরিষেবা, রিয়েল এস্টেট, তথ্য প্রযুক্তির পরিষেবা যার বৃদ্ধির হার ১২.১শতাংশ এবং তা মোট উৎপাদন মূল্যের ২৭শতাংশ। এর পরের স্থান দেশের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় প্রশাসন, এবং নির্মাণ শিল্প। এই অংশের বৃদ্ধির হার ৮.৫শতাংশ এবং এই অংশ মোট উৎপাদনের ২৩শতাংশ। ব্যবসা-বাণিজ্য, হোটেল, ইত্যাদিতে বৃদ্ধির হার ৬৫শতাংশ এবং মোট উৎপাদনের অংশ ১৫শতাংশ। কৃষিতে নিযুক্ত দেশের বেশির ভাগ মানুষ এবং দেশের সরকারি পরিসংখ্যান পিরিয়ডিক লেবার ফোর্স সার্ভে দেখিয়ে দিয়েছে যে দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকা কৃষির উপর নির্ভরশীল। কিন্তু সেই কৃষিতে বৃদ্ধির হার মাত্র ৩.৬শতাংশ। কৃষিতে বিপন্নতা দেশে সমাধান করতে পারেনি দেশের সরকার। চাষের খরচ বাড়ছে, ওদিকে কৃষক দাম পাচ্ছে না, মধ্যসত্ত্বভোগীদের জন্য, কর্পোরেট, বেসরকারি খুচরো ব্যবসায়ীদের বৃদ্ধির জন্য বাজারে কৃষিপণ্যের দাম বাড়ছে কিন্তু কৃষকের বিপন্নতা কমছে না। এই বিপন্ন কৃষি আরও বিপন্ন হয়েছে প্রতি বছর। কৃষি উৎপাদন তাই কোনোভাবেই এই জিডিপি বৃদ্ধির কারণ নয়। খনিজ শিল্পে বৃদ্ধির হার কমে গেছে। অসংগঠিত এবং ইনফরমাল শিল্পে বৃদ্ধির হার কমে গেছে। তাহলে শ্রমজীবী, কৃষিজীবীদের বিপন্নতা সরকারি পরিসংখ্যানেই গোপন করা হয়নি। এই জিডিপি বৃদ্ধির হার এবং সরকারি পরিসংখ্যানকে মেনে নিলেও বলা যায় যে এই তথ্যই দেখিয়ে দিচ্ছে যে মোট উৎপাদন বৃদ্ধির ৬৫শতাংশ-এর সঙ্গে দেশের বেশির ভাগ মানুষের জীবন-জীবিকার সংযোগ নেই। যদি জিডিপি বৃদ্ধির এই হার যে তথ্য দিচ্ছে তা সঠিক বলে মেনে নিই তাহলে এই বৃদ্ধির হার শহরকে ঝাঁ চকচকে করার কাজে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে বলে বোঝা যায়। এ ছাড়াও স্বাভাবিকভাবেই সরকারি প্রশাসনের ব্যয় বৃদ্ধিও আরেকটি কারণ। ধাঁধাঁর কিছুটা উত্তর বোধহয় এইভাবে দেওয়া যেতে পারে।
দেশের এবং বিদেশের বেশ কয়েকজন অর্থনীতিবিদ এবং পরিসংখ্যানবিদ অবশ্য অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন যেভাবে এই জিডিপি বৃদ্ধির হার মাপা হয়েছে তা নিয়ে। ২০২৫ সালের টাকার অঙ্কের জিডিপি’র সাপেক্ষে এই হার মাপা হলে এবং মুদ্রস্ফীতির হার যখন বেশি থাকে সেই সময়ের নিরিখে বিচার করলে এই হারকে বেশি দেখানো সম্ভব এবং সেইভাবেই এই হারকে বেশি দেখিয়েছে সরকার। যদি অতীতের অর্থাৎ আগের বছরগুলির ত্রৈমাসিকের জিডিপি’র টাকার অঙ্কের পরিসংখ্যানের সাথে তুলনা করা যায় তখন এই জিডিপি বৃদ্ধির হার দাঁড়ায় ২.৭শতাংশ। বারেবারেই মুদ্রাস্ফীতির হারকে ব্যবহার করে টাকার অঙ্কে জিডিপি-কে মেপে তার সাপেক্ষে পরিসংখ্যানের সার্কাস করে সত্যকে চাপা দিয়ে জিডিপি বৃদ্ধির হারকে বাড়িয়ে দেখিয়েছে সরকার, এটাই দেশের অনেক বিশেষজ্ঞের অভিমত। সেই কারণেই আন্তর্জাতিক আর্থিক পরিসংখ্যানের ক্ষেত্রে ভারতের জিডিপি’র পরিসংখ্যানের তথ্য নির্ভরযোগ্য নয় বলেই বলা হয়। ভারতের সরকারি পরিসংখ্যানের গুরুত্ব বিশ্বের পরিসংখ্যানে বিশেষ নেই বললেই চলে। এই পরিসংখ্যানের ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’ -র কথা আজ সারা বিশ্বের বিশেষজ্ঞ মহল জানে। এই কারণেই এই বৃদ্ধির হার দেখালেও এদেশে বিনিয়োগের হার বৃদ্ধি পায় না, এ দেশে শিল্পোৎপাদনে চোখে পড়ার মতো ঘটনা ঘটে না। এই পরিসংখ্যান এক উত্তর সত্যের পরিসংখ্যান, যা সত্য নয় এবং যা ঘিরে নতুন সত্যের নির্মাণ হচ্ছে, যা একেবারেই কাল্পনিক। 
দেশের সরকার কেন সরকারি পরিসংখ্যান মাপার পদ্ধতি ঘনঘন পরিবর্তন করেছে ২০১৪ সাল থেকে? তার কারণ এমনভাবে নতুন পদ্ধতি দিয়ে মাপা সরকার চেয়েছিল যাতে দেশের জিডিপি বৃদ্ধির হারকে বেশি দেখানো যায় এবং মানুষ তথা বিশ্বের খাতায় দেশকে গৌরবান্বিত করা যায়। কিন্তু বিশ্বের সর্বত্র আজ এই প্রশ্ন উঠে গেছে যে এই বৃদ্ধির হার সত্ত্বেও কেন দেশের মানুষের জীবনযাত্রায় সঙ্কট, কেন বিশ্বের নানা সূচকে ভারত পিছিয়ে রয়েছে? এর কোনও উত্তর পাওয়া যায় না, পাওয়া সম্ভব নয় সরকারি পরিসংখ্যানে।
দেশের সরকারি পরিসংখ্যানের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা দেশের পক্ষে গৌরবের নয়, দেশের অন্যান্য নানা ক্ষেত্রের বিশ্বাসযোগ্যতা এর সঙ্গে যুক্ত। এ ছাড়াও দেশের মানুষের বেঁচে থাকার প্রশ্নকে বাদ দিয়ে দেশের আর্থিক বৃদ্ধিকে বোঝা আর্থিক বৃদ্ধির এক বিকৃত বিবরণ। সরকার কোনোভাবেই কি দেশের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন, কৃষিতে বিপন্নতার প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে এই পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে?

 

Comments :0

Login to leave a comment