pregnant minors in Birbhum

চার মাসে বীরভূমে ৪১৮১ নাবালিকা গর্ভবতীর সন্ধান, শুধু আইন যথেষ্ট নয়, দরকার সচেতনতা প্রসার

রাজ্য জেলা

রণদীপ মিত্র: সিউড়ি

শারীরিক অসুস্থতার কারণে বছর ষোলোর এক বিবাহিত নাবালিকা এসেছিল সিউড়ি সদর হাসপাতালে। স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ধরা পড়ে ওই বিবাহিতা নাবালিকা গর্ভবতী। সদ্য বাল্য বিবাহ ও নাবালিকা গর্ভধারণ রুখতে আইনি পদক্ষেপের বার্তা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। স্বাভাবিকভাবেই এমন ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় হাসপাতালের পক্ষ থেকে জানানো হয় পুলিশকে। পুলিশ হাসপাতালে গিয়ে নাবালিকার বয়ান নেয় এবং তার ভিত্তিতেই পকসো আইনে গ্রেপ্তার করা হয় স্বামীকে। মঙ্গলবার বীরভূমের সিউড়ি থানার এক গ্রামে এই ঘটনা ঘটেছে। 
এ সূত্রেই জেলা প্রশাসনের কাছে জমা পড়া তথ্য তুলে ধরেছে ভয়াবহ পরিস্থিতি। এক স্বাস্থ্য আধিকারিকের কথায়, ‘আইন দরকার। আইনের প্রয়োগ দরকার। তবে তার থেকেও বেশি প্রয়োজন সামাজিক সচেতনতা। নিরবিচ্ছিন্ন প্রচার। আইন প্রয়োগে গ্রেপ্তারির সংখ্যা বাড়লে হয়তো মানুষের মধ্যে ভীতির সঞ্চার হবে ঠিকই। কিন্তু তার নেতিবাচক প্রভাবও পড়তে পারে। দেখা যাবে গর্ভবতী নাবালিকারা আর স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাচ্ছেই না। আমাদের আশঙ্কা, গোপনে ঘরোয়া পদ্ধতিতে প্রসবের দিকেই ফের ঝুঁকবেন তাঁরা। তা হবে আরো বিপজ্জনক।’
বীরভূম জেলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য দপ্তর বলছে, এই মুহূর্তে জেলায় প্রায় ৯৯ শতাংশ প্রাতিষ্ঠানিক প্রসব হচ্ছে। আবার এই সময়েই নাবালিকা গর্ভবতী হওয়ার চিত্রও উদ্বেগজনক। উল্টেদিকে বাল্য বিবাহ রোধের পরিসংখ্যান হতাশাজনক। বীরভূম জেলা প্রশাসনের এক কর্তা জানিয়েছেন, ‘কোনও ব্লক থেকে বাল্য বিবাহের খবরই এসে পৌঁছাচ্ছে না। অথচ শতাংশের বিচারে নাবালিকা গর্ভবতীর সংখ্যায় সেই ব্লকই শীর্ষে। যেমন ধরুন, বীরভূমের মহম্মদ বাজার ব্লকে গত এপ্রিল থেকে জুলাই, এই চারমাসে নাবালিকা বিয়ে আটকানো গেছে মাত্র ১টি। এই ব্লকে ওই চারমাসেই নাবালিকা গর্ভবতীর সংখ্যা ২৭৫। মোট অন্তঃসত্ত্বার ২৫ শতাংশ।’ এখানে উল্লেখ করতে হয়, এই ব্লকের মধ্যেই পড়ে পাঁচামী। মহম্মদ বাজার ব্লকের গর্ভবতী নাবালিকার বড় অংশই  পাঁচামীতে। যে পাঁচামীতে কয়লা খনি গড়া নিয়ে বিগত সরকারের বাগাঢম্বরের অন্ত ছিল না। বর্তমান সরকারের মুখ্যমন্ত্রীও শীঘ্রই পাঁচামীর ভবিষ্যত রূপরেখা ঘোষণা করবেন বলে জানিয়ে দিয়েছেন।  
নাবালিকা গর্ভবতীর প্রশ্নে চলতি আর্থিক বর্ষের এপ্রিল থেকে জুলাই— এই চারমাসে বীরভূম জেলার পরিসংখ্যান কপালের ভাঁজ রীতিমত চওড়া করেছে। এই চারমাসে জেলা শিশু সুরক্ষা দপ্তরের তরফ থেকে বাল্য বিবাহের খবর পেয়ে অভিযান চালানো হয়েছে ১১৪টি। বাল্য বিবাহ রোধ করা গেছে ১১৩টি। আর স্বাস্থ্য দপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে, এই চারমাসে বীরভূম জেলায় মোট নাবালিকা গর্ভবতীর সংখ্যা ৪১৮১। শতাংশের বিচারে সরকারিভাবে সমগ্র বীরভূম জেলায় নিবন্ধিত মোট গর্ভবতীর ১৮ শতাংশই নাবালিকা। স্বাস্থ্য প্রশাসনের নিরীখে বীরভূমে রয়েছে দুটি স্বাস্থ্য জেলা রয়েছে, বীরভূম ও রামপুরহাট স্বাস্থ্য জেলা। বীরভূম স্বাস্থ্য জেলায় মোট নাবালিকা গর্ভবতীর সংখ্যা ১৯৩০। শীর্ষে রয়েছে মহম্মদ বাজার। অপরদিকে রামপুরহাট স্বাস্থ্য জেলার নলহাটি ১ও ২ এবং মুরারই ১ও ২নং ব্লকে মোট গর্ভবতীর কুড়ি থেকে বাইশ শতাংশই নাবালিকা। 
কোথায় রয়েছে ফাঁক? জেলা প্রশাসনের এক কর্তার ব্যাখ্যা, ‘গ্রাম সংসদ থেকে জেলাস্তর পর্যন্ত শিশু সুরক্ষা কমিটি রয়েছে। কিন্তু সেই কমিটি থেকে গিয়েছে স্রেফ কাগজে কলমেই। গ্রাম সংসদ স্তরে থাকা কমিটির ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। যেখানে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার প্রতিনিধি, অঙ্গনওয়াড়ি, আশাকর্মী, ছাত্র-ছাত্রী প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি রয়েছে। কিন্তু বাল্য বিবাহের খবর পেলেও পারিপার্শিকতার চাপে কমিটি সক্রিয় হয় না। ফলে বাল্য বিবাহের খবরই এসে পৌঁছায় না যে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।’ এ ব্যাপারে পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শুভাশিস গড়াইয়ের মত, ‘বাল্য বিবাহ রোধে আইন প্রয়োগের সদিচ্ছা ইদানীং চোখে পড়েছে ভালো বিষয়। তবে আইন প্রয়োগ কিংবা কয়েকটি সচেতনতার প্রচার অভিযান চালিয়ে এই সামাজিক ব্যাধি নিরাময় সম্ভব নয়। ব্যাধির মূল কারণগুলি অনুসন্ধানে উদ্যোগ এবং সচেতনতার ক্ষেত্রে শারীরবিজ্ঞানের উপর বেশি জোর দেওয়া প্রয়োজন।’

Comments :0

Login to leave a comment