সহজ শর্তে ঋণ মিলছে। বাড়ি বাড়ি ক্ষুদ্রঋণ সংস্থার কর্মীরা পৌঁছে যাচ্ছে। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে নিম্ন ও স্বল্প আয়ের বহু মানুষ সেই ঋণ নিচ্ছেন। কিন্তু আয় ও কাজের সুযোগ না বাড়ায় সেই ঋণের কিস্তিই এখন বহু পরিবারের কাছে গলার কাঁটা। পুরনো ঋণের কিস্তি মেটাতে নতুন করে ঋণ নেওয়ার অভিযোগও উঠছে। কোথাও স্বামী-স্ত্রীর অশান্তি, কোথাও ঋণগ্রহীতা ও সংস্থার কর্মীদের মধ্যে বচসা-ধস্তাধস্তির পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি কিছু ক্ষেত্রে প্রশাসনকেও হস্তক্ষেপ করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশের দাবি, ধূপগুড়ি ব্লকের প্রায় ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পরিবার কোনও না কোনও ভাবে ক্ষুদ্রঋণের সঙ্গে যুক্ত। নিম্ন ও স্বল্প আয়ের পরিবারের মানুষ রান্নাঘর তৈরি, আসবাবপত্র কেনা, মেয়ের বিয়ে কিংবা সংসারের দৈনন্দিন খরচ বিভিন্ন প্রয়োজনে ঋণ নিচ্ছেন। ঋণ পাওয়া সহজ হলেও নির্দিষ্ট সময় অন্তর কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে বিপাকে পড়ছেন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, একদিকে কাজের অনিশ্চয়তা ও অনিয়মিত আয়, অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধি। ফলে সংসারের খরচ সামলে সাপ্তাহিক বা মাসিক কিস্তি দেওয়া ক্রমশ কঠিন হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো ঋণের কিস্তি মেটাতে নতুন ঋণ নেওয়ার ফলে ঋণের চক্র আরও গভীর হচ্ছে।
ঝাড় আলতা-২ গ্রাম পঞ্চায়েতের বাসিন্দা রত্না রায় রান্নাঘর তৈরির জন্য ঋণ নিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ, কাজ শেষ হওয়ার আগেই কিস্তি পরিশোধের চাপ শুরু হয়। স্বামীর অনিয়মিত দিনমজুরির আয়ে সংসার চালানো কঠিন হওয়ায় কিস্তি মেটাতে ফের ঋণ নিতে হয়েছে। ঋণ আদায়ে সংস্থার কর্মীরা বাড়িতে এসে চাপ সৃষ্টি করেন বলেও অভিযোগ। গাদং এলাকার কৃষক জামালউদ্দিন মেয়ের বিয়ের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন তাঁর দাবি, সেই ঋণের কিস্তি মেটাতে গিয়ে এখন ভিটেমাটি হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। গীতা বর্মণের অভিযোগ, কিস্তি আদায়ের জন্য কর্মীরা বাড়িতে এসে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করেন। ফলে পরিবারের মধ্যে আতঙ্ক ও অশান্তির পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
তবে কিস্তি আদায়কারী কর্মীরাও যে চাপের মধ্যে রয়েছেন, সেই অভিযোগও উঠেছে। সংস্থার কর্মী সমীর দাসের দাবি, গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা আদায় করতে না পারলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের চাপ থাকে। অন্য কর্মী তাপস রায়ের অভিযোগ, বকেয়া রেখে অফিসে ফিরলে জবাবদিহি করতে হয়। তাঁর দাবি, সেই কারণেই অনেক সময় রাতেও গ্রাহকের বাড়িতে যেতে হয়।
পরিস্থিতি নিয়ে সিপিআই(এম) নেতা মুকুলেশ রায় সরকার বলেন, ‘‘এ ধরনের সমস্যা মাঝেমধ্যেই হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে সরকারকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে। পাশাপাশি সমবায় গুলিকে সচল ও শক্তিশালী করার উদ্যোগ প্রয়োজন।’’
সহজে ঋণ পাওয়ার সুযোগের আড়ালে নিম্ন আয়ের মানুষের ঋণনির্ভরতা কতটা বাড়ছে, কিস্তি আদায়ের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নিয়মনীতি মানা হচ্ছে কি না এবং ঋণগ্রহীতাদের সুরক্ষায় প্রশাসনের ভূমিকা কী—এই প্রশ্নই এখন সামনে। এই ঋণের ফাঁদে শুধু নিম্নবিত্ত নয়, নিম্ন মধ্যবিত্ত এবং মধ্যবিত্তরাও আটকা পড়ে যাচ্ছে। প্রচলিত ব্যাংকের সুদ হার কম হলেও সেখান থেকে ঋণ পাওয়া সহজ নয়। ফলে তার উচ্চ সূদ হারে অপ্রচলিত, ব্যক্তিখাত এবং এনজিও থেকে ঋণ নিচ্ছেন। ওই ঋণের সুদ আর কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে দিশেহারা হতে হচ্ছে। স্থানীয়দের বক্তব্য, মানুষের আয় ও কাজের সুযোগ না বাড়িয়ে ঋণনির্ভরতা বাড়তে থাকলে কিস্তির এই চাপ আগামী দিনে আরও গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারে।
বাসিন্দাদের একাংশের কথায় ঋণের ফাঁদের বিপদ শুধু দেনার টাকার মধ্যেই সীমাবধ্য নয়, বরং এটি মানসিক ও আর্থিক চাপ সৃষ্টি করে। ঋণের ফাঁদে আটকে পড়া অনেকে সঞ্চয় করতে, ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে বা নিজেদের লক্ষ্য অর্জন করেতে অক্ষম হয়ে পড়েন।
Debt Trap
সহজ ঋণের ফাঁদে ধূপগুড়ির বহু পরিবার
×
Comments :0