যে ডাবল ইঞ্জিনের ধ্বজা উড়িয়ে কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা দখল করেছিল বিজেপি সেই ডাবল ইঞ্জিনই কার্যত মুখ থুবড়ে পড়েছে রাজস্থানের পৌর নির্বাচনে। ৩০৯টি পৌরসভা এলাকার মধ্যে থাকা রাজস্থানের শহরবাসীরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন মোদী-শাহ’দের চোখ ধাঁধানো প্রচার আর প্রতিশ্রুতি থেকে। অভিজ্ঞতা থেকে তারা বুঝেছেন ওটা আসলে কথার কথা, কাজের কথা নয়। ডাবল ইঞ্জিনের মাহাত্ম্যের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে সাধারণ মানুষরে রুটি-রুজি, লাগাতার জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, কাজের ভয়ানক অভাব, তার চেয়ে বেশি অভাব ন্যায্য মজুরি। সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়া তো ফাঁকা। অথচ নির্বাচনী প্রচারে দাপিয়ে বেড়িয়েছে ধর্মান্তরকরণ, লাভ জেহাদ, অনুপ্রবেশ, মুসলিম বিদ্বেষের মতো অনাবশ্যক বিভাজনের রাজনৈতিক অ্যাজেন্ডা। রাজস্থানের শহরবাসী এসব ভালোভাবে নেননি। তারই তাৎপর্যপূর্ণ প্রতিফলন ঘটেছে পৌর নির্বাচনের ফলাফলে। ডাবল ইঞ্জিনের সরকার যে আদৌ কোনও কাজে আসেনি সেটা স্পষ্ট হয়েছে ভোটের ফলে।
মোট ৩০৯টি পৌরসভার ১০ হাজার ২৪৪ ওয়ার্ডের মধ্যে ডাবল ইঞ্জিনের বিজেপি’র জুটেছে মাত্র ৪ হাজার ১৬৬টি। বিপরীতে কংগ্রেস জিতেছে ৩ হাজার ৫৯৭টি ওয়ার্ডে এবং সিপিআই(এম) জিতেছে ৩৮ওয়ার্ডে। বিকাশের জেলার নোখা পৌরসভায় ৪৫টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৯টি-তে জিতে বোর্ড দখল করেছে সিপিআই(এম)। নির্দল প্রার্থীরা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ওয়ার্ডে জেতার ফলে বিজেপি বিরোধীরা মোটামুটি ৬০ শতাংশ আসনে জয়ী হয়েছে। অথচ আগের নির্বাচনে বিজেপি জিতেছিল হইহই করে। সিংহভাগ পৌরসভাই ছিল তাদের দখলে। এবার শহরাঞ্চলে তাদের সমর্থনের ভিত্তিটাই নড়বড়ে হয়েছে। সাধারণ মানুষের আস্থা হারিয়েছে বিজেপি। ১০টি কর্পোরেশনের মধ্যে ৪টি-তে কোনোরকমে ক্ষমতা ধরে রাখতে পেরেছে। একটিতে কংগ্রেস জিতেছে। একটিতে নির্দলরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। বাস্তবে একটা বিরাট সংখ্যক পৌরসভায় বোর্ড দখল করতে হলে বিজেপি-কে নির্দল কাউন্সিলর কিনতে হবে কোটি কোটি টাকা খরচ করে।
দু’বছর পর রাজস্থানে বিধানসভা নির্বাচন। তিন বছর পর লোকসভা নির্বাচন। তার আগে পৌর নির্বাচনে শহরবাসী শাসক বিজেপি-কে হলুদ কার্ড দেখিয়ে সতর্ক করে দিয়েছে যে ডাবল ইঞ্জিনের শাসনে তারা মোটেই খুশি নন। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য দিল্লির যন্তর মন্তরে জেন-জি’র বিক্ষোভের পর মোটের উপর এটাই ছিল প্রথম বড়সড় নির্বাচন। তার ফল নিঃসন্দেহে মোদী-শাহ’দের রক্তচাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। নতুন প্রজন্মের ছাত্র-যুব সমাজের ক্ষোভের তীব্রতা যন্তর মন্তরে দেশ-দুনিয়া প্রত্যক্ষ করেছে। সেই ক্ষুব্ধ জেন-জি’র আন্দোলন রাজস্থানে কতটা প্রচার ফেলেছে সেটাই এখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের প্রধান বিষয়। তবে যন্তর মন্তরের আন্দোলনে রাজস্থান থেকেও বহু ছেলেমেয়ে অংশ নিয়েছিল। তার প্রভাব অস্বীকার করার উপায় নেই। তেমনি শিক্ষায় খরচ বৃদ্ধি, অনিশ্চয়তা, কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি না হওয়া, সরকারি চাকরি কার্যত উঠে যাওয়া, ক্রমাগত জিনিসপত্রের দাম বেড়ে চলা, অথচ মানুষের আয় না বাড়া সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়েছে। মানুষ বুঝেছেন এই সরকার তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারবে না।
মানুষের এমন মনোভাব বিজেপি নেতারা আন্দাজ করতে পারেনি তা নয়। পেরেছে বলেই একতরফাভাবে ঢালাও আসন পুনর্বিন্যাস করে জয়ের রাস্তা প্রশস্ত করার চেষ্টা করেছিল। পাশাপাশি মানুষের মূল সমস্যাগুলি চাপা দিতে সামনে হাজির করে মুসলিম বিদ্বেষ, অনুপ্রবেশ, লাভ জেহাদ, ধর্মান্তরকরণ ইত্যাদি হিন্দুত্ব বিভাজনের ইস্যুগুলিকে। কিন্তু কোনোটাই কাজে আসেনি।
Rajasthan City Poll
নতুন বার্তা রাজস্থানে
×
Comments :0