২০ জুলাইয়ের সংসদ চলো কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত ও বেআইনি বলপ্রয়োগের অভিযোগ উড়িয়ে দিল দিল্লি পুলিশ। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে জমা দেওয়া হলফনামায় পুলিশের দাবি, আন্দোলনকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করার পর পরিস্থিতি হিংসাত্মক হয়ে ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ ধাপে ধাপে বলপ্রয়োগ করেছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
ডেপুটি কমিশনার অফ পুলিশ সচিন শর্মার দেওয়া এই হলফনামা আদালতে দায়ের করা হয়েছে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিচারবিভাগীয় নজরদারিতে তদন্ত চেয়ে করা একাধিক আবেদনের প্রেক্ষিতে। চারটি সংযুক্ত মামলায় এটিকেই পুলিশের অভিন্ন জবাব হিসেবে পেশ করা হয়েছে।
দিল্লি পুলিশের দাবি, ওইদিন প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ জমায়েত করেছিলেন। পরিস্থিতি সামাল দিতে প্রায় ৫ হাজার পুলিশকর্মী মোতায়েন করা হয়েছিল। পরে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় এবং দু’পক্ষেরই অনেকে আহত হন।
হলফনামা অনুযায়ী, ২৪০ জনের বেশি পুলিশকর্মী ও ইউনিফর্ম পরিহিত আধিকারিক আহত হন। প্রায় ২০০ আন্দোলনকারী ও সাধারণ মানুষের মেডিকো-লিগ্যাল পরীক্ষা করা হয়। পুলিশের বক্তব্য, এত বড় জমায়েতের চরিত্র ও পরিস্থিতি বিবেচনা করেই সেদিনের ঘটনাকে বিচার করতে হবে। তাদের দাবি, ভিড়ের মধ্যে সমাজবিরোধী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও ঢুকে পড়েছিলেন।
দিল্লি পুলিশের দাবি, সংসদ ভবন পর্যন্ত মিছিল করার কোনও অনুমতি দেওয়া হয়নি। নিউ দিল্লি জেলায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা জারি থাকা অবস্থায় জমায়েতটিকে বেআইনি বলে দাবি করেছে পুলিশ। পুলিশের বক্তব্য, বারবার সতর্ক করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। এরপর একাধিক স্তরের ব্যারিকেড ভেঙে সংসদের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়।
পুলিশের আরও অভিযোগ, এরপর কিছু আন্দোলনকারী পুলিশকর্মীদের উপর হামলা চালান এবং সরকারি সম্পত্তির ক্ষতি করেন। ফলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয় পুলিশ।
আন্দোলনকারীদের আবেদনের সঙ্গে জমা দেওয়া ছবি, আংশিক ভিডিও এবং সংবাদমাধ্যম ও সমাজমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে দিল্লি পুলিশ। তাদের বক্তব্য, ওইসব ফুটেজে ঘটনার সম্পূর্ণ ধারাবাহিকতা ধরা পড়েনি এবং সেগুলির সত্যতা যাচাইও করা হয়নি।
পুলিশের বিরুদ্ধে পেরেক লাগানো লাঠি ব্যবহারের অভিযোগও অস্বীকার করেছে দিল্লি পুলিশ। হলফনামায় দাবি করা হয়েছে, এমন একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেলেও সেটি পুলিশের লাঠি নয়। বরং এক আন্দোলনকারীর হাতে থাকা জাতীয় পতাকাযুক্ত একটি লাঠি ছিল সেটি।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জের কথা স্বীকার করেছে পুলিশ। তবে তাদের দাবি, প্রথমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের অন্যান্য উপায় প্রয়োগ করা হয়েছিল। সেগুলি ব্যর্থ হওয়ার পরই অনুমোদিত ভিড় নিয়ন্ত্রণের পদ্ধতি হিসেবে কাঁদানে গ্যাস ও সীমিত লাঠিচার্জ করা হয়।
হলফনামায় বলা হয়েছে, হিংসা নিয়ন্ত্রণে সব পদক্ষেপই অনুমোদিত পদ্ধতি মেনেই নেওয়া হয়েছিল।
আন্দোলনের মধ্যে সাদা পোশাকে লাঠি হাতে থাকা কয়েকজনকে দেখা যাওয়ার বিষয়টিও ব্যাখ্যা করেছে পুলিশ। তাদের দাবি, ওই ব্যক্তিরা ‘স্পটার’ হিসেবে মোতায়েন ছিলেন। ভিড়ের মধ্যে থেকে পরিস্থিতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই তাদের রাখা হয়েছিল।
স্পেশাল ব্রাঞ্চ, স্পেশাল সেল, ক্রাইম ব্রাঞ্চ এবং স্থানীয় থানার পুলিশকর্মীদের আন্দোলনকারীদের মধ্যে মোতায়েন করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। বড় জনসমাবেশে এই ধরনের ব্যবস্থা নতুন নয় বলেও দাবি করা হয়েছে। স্বাধীনতা দিবস ও প্রজাতন্ত্র দিবসের মতো বড় অনুষ্ঠানেও একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে আদালতকে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ।
পুলিশের অভিযোগ, ব্যারিকেড ভাঙার পর তাদের উপর লাগাতার হামলা চালানো হয়। ভিডিও ফুটেজে কয়েকজন পুলিশকর্মীকে ঘিরে ধরে তাঁদের প্রতিরক্ষামূলক সরঞ্জাম খুলে নেওয়া, টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া এবং পাথর বাঁধানো রাস্তায় ফেলে দেওয়ার দৃশ্য রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
হলফনামায় দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, অভিযানের সময় শনাক্ত হওয়া ২,৮৭৩ জনের বিরুদ্ধে আগে থেকেই ফৌজদারি মামলা রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে খুন, খুনের চেষ্টা, ডাকাতি, ধর্ষণ এবং পকসো আইনের মতো গুরুতর ধারায় মামলা রয়েছে বলে দাবি পুলিশের।
দিল্লির পুলিশ কমিশনারের গঠিত বিশেষ তদন্তকারী দল ওই ব্যক্তিদের অপরাধমূলক অতীত খতিয়ে দেখবে বলেও জানানো হয়েছে।
একই সঙ্গে পুলিশের প্রতিক্রিয়া প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ছিল কি না, সেই প্রশ্নও আদালত চাইলে কোনও কমিটির মাধ্যমে পরীক্ষা করা যেতে পারে বলে জানিয়েছে দিল্লি পুলিশ। তদন্ত হলে তাতে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছে তারা।
সংসদ চলো কর্মসূচিতে ফেসিয়াল রেকগনিশন প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগও খারিজ করেছে পুলিশ। তাদের দাবি, এটি নির্বিচারে নজরদারি নয়, বরং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য একটি আনুপাতিক ব্যবস্থা।
পুলিশের বক্তব্য, প্রযুক্তির মাধ্যমে আন্দোলনে উপস্থিত প্রত্যেক ব্যক্তির স্বয়ংক্রিয় প্রোফাইল তৈরি করা হয়নি। শান্তিপূর্ণ আন্দোলনকারীদের ব্যক্তিগত তথ্যও নির্বিচারে সংগ্রহ করা হয়নি।
ফেসিয়াল রেকগনিশন সিস্টেমে কোনও ব্যক্তির সঙ্গে অপরাধের রেকর্ডের মিল পাওয়া গেলেই সেটিকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হয়নি বলেও জানিয়েছে পুলিশ। মাঠপর্যায়ে যাচাই করে ওই ব্যক্তি সত্যিই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন কি না, তা নিশ্চিত করার পরই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
পুলিশের দাবি, প্রযুক্তিটি মূলত গুরুতর অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে ব্যবহার করা হয়েছিল। ট্রাফিক চালানের মতো ছোটখাটো মামলায় যুক্ত ব্যক্তিদের নিশানা করা হয়নি। শনাক্ত হওয়া ২,৮৭৩ জনের মধ্যে ৯২ জনের বিরুদ্ধে ১০টিরও বেশি মামলা রয়েছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
২০ জুলাই সিজেপির ডাকে সংসদ চলো কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লির যন্তর মন্তর ও সংলগ্ন এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে নিরাপত্তারক্ষীদের সংঘর্ষ বাধে। নিট প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগের প্রতিবাদে এই কর্মসূচির ডাক দেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিও তুলেছিলেন আন্দোলনকারীরা।
দিল্লি পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে ৬৫ জনের বেশি আন্দোলনকারী এবং ২০০-রও বেশি পুলিশকর্মী আহত হন। পুলিশের বিরুদ্ধে প্লাস্টিক পেলেট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেও চলে আসে। কয়েকজন আন্দোলনকারী গুরুতর আহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছিল।
এখন সেই অভিযোগ ও পুলিশের পাল্টা বক্তব্যের প্রেক্ষিতে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। পুলিশের প্রতিক্রিয়া কতটা আনুপাতিক ছিল এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে আইন ও নির্ধারিত বিধি যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না, আদালতের পরবর্তী শুনানিতে সেই প্রশ্নগুলিই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
Delhi Police
সংসদ অভিযান ঘিরে হিংসা: পুলিশের বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগের অভিযোগ খারিজ দিল্লি পুলিশের
×
Comments :0