নতুনপাতা
জানা অজানা
রাখীবন্ধন
তপন কুমার বৈরাগ্য
২৮ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
১৫২৭খ্রিস্টাব্দের ৬ই মার্চ বাবরের সাথে রানা সাঙ্গা বা
সংগ্রামসিংহের যুদ্ধ হয়।এই যুদ্ধে সংগ্রামসিংহ পরাজিত
হয়।তিনি এই যুদ্ধে খুবই আহত হয়। রানি কর্ণাবতীর
সেবায় তিনি আস্তে আস্তে ভালো হয়ে ওঠেন।
কিন্তু রানির জীবনে নেমে আসে ঘোর পরিণতি।
রানা সাঙ্গাকে তাঁর বিশ্বস্ত অনুচর দ্বারা ৩রা জানুয়ারী
১৫২৮খ্রিস্টাব্দে বিষ প্রয়োগ করে মেরে ফেলা হয়।
রানি কর্ণাবতী পড়েন মহাফাঁপরে।কিভাবে তিনি নাবালক পুত্র রতনসিংহ ,বিক্রমজিৎ সিংহ এবং উদয় সিংহকে নিয়ে চিতোর রাজ্য চালাবেন? প্রথমে রতন সিংহ সিংহাসনে বসলেন। তিনি ১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে মারা গেলেন।তখন তিনি দ্বিতীয় পুত্র
বিক্রমজিৎ সিংহকে সিংহাসনে বসালেন।চিতোর সামরিক দিক দিয়ে ক্রমশঃ দুর্বল হয়ে পড়তে লাগল। গুজরাটের সুলতান
বহুদিন ধরে চেষ্টা করে যাচ্ছিল চিতোর জয় করার জন্য।
কিন্তু সংগ্রাম সিংহ জীবিত থাকতে তাঁর সেই স্বপ্ন সফল
হয়নি।এখন মাওয়ারের রাজধানী চিতোরের সিংহাসেন
সব দুর্বল নাবালক শাসক। এই সুযোগ কখনো হাত ছাড়া
করা যায় না। তিনি বিপুল সৈন্য নিয়ে চিতোর আক্রমণ
করলেন।রানি কর্ণাবতী পড়লেন মহাবিপদে।কিভাবে
তিনি তাঁর সামান্য সেন্যবাহিনী নিয়ে চিতোরকে রক্ষা
করবেন। তিনি নাবালক পুত্রদের কিভাবে রক্ষা করবেন।
এদিকে সুলতান বাহাদুর শাহের সৈন্যগণ চিতোর দুর্গ
আক্রমণ করে চলেছে।ব্যথায় কর্ণাবতীর বুক ফেটে যাচ্ছে।
সামান্য কয়েকজন সৈন্য দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য
লড়াই করে যাচ্ছে। মনে পড়ল মহানুভব হুমায়ুনের কথা।
যিনি বাবরের পুত্র ছিলেন। ১৫৩০খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির
সিংহাসনে বসে মুঘল সম্রাট হন। রানি হুমায়ুনের
মহানুভবতার কথা শুনেছেন। হোক তিনি মুসলমান।
তাঁকে মনে মনে ভাই বলে মনে করলেন। আপন ভাইয়ের
মতন তাঁকে অন্তর দিয়ে ভালোবেসে ফেললেন।
ভাইকে চিঠি লিখলেন।
ভাইজান ,
তোমার বোন রাজপুত রানি আজ দারুণ সংকটে।
গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহ চিতোর আক্রমণ
করেছে।আমার নাবালক পুত্রদের ওই শয়তান মেরে
ফেলবে।আমাদের রাজপুত নারীদেরও সম্ভ্রম রক্ষা করা
যাবে না। ভাইজান আমার নিজের হাতের তৈরি রাখি
পাঠালাম। এই রাখি ভাই আর বোনের পারস্পরিক দৃঢ়
বন্ধন।ভালোবাসার এক প্রতীক। তুমি তোমার বোনকে
রক্ষা করতে ছুটে এসো ভাইজান।
হুমায়ুন রানির বিশ্বস্ত অনুচর দ্বারা এই চিঠি এবং রাখি
পাওয়ার পর এক মূহূর্ত দেরি করেন নি।বোনের দেওয়া
রাখিটা সযত্নে ডানহাতে পরলেন।তাঁর অন্তরাত্মা বোনের
জন্য কেঁদে উঠল।নিজের জীবনের বিনিময়েও তিনি
চিতোর রক্ষা করবেন।সাথে তাঁর বোনকে। দিল্লি থেকে
চিতোর অনেক দূরে।তীব্র বেগে সৈন্যরা এগিয়ে চলল।
বোনকে কোনোদিন তিনি স্বচক্ষে দেখেন নি।
আজ বোনকে স্বচক্ষে দেখবেন।হুমায়ুনের হৃদয়টা
কিছুক্ষণের জন্য আনন্দে নেচে উঠল।কিন্তু এই
আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। চিতোরে পৌঁছে তিনি
দেখলেন চারিদিকে শুধু মৃত্যুর লাশ আর শ্মশানের
নিস্তব্ধতা। বাহাদুর শাহ তখন চিতোর দুর্গে প্রবেশ করতে
যাচ্ছিলেন।হুমায়ুন তাঁকে রুখে দাঁড়ালেন।
হুমায়ুনের সাথে বাহাদুর শাহের যুদ্ধ হলো।বাহাদুর
শাহ এই যুদ্ধে পরাজিত হয়ে সৈন্য-সামন্ত নিয়ে
পালিয়ে গেলেন।
হুমায়ুন এবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।এবার
ভাইবোনের প্রথম সাক্ষাৎ হবে। তিনি চিতোর দুর্গে
প্রবেশ করলেন। দেখলেন সব শেষ।বাহাদুর শাহের
বাহিনীর হাত থেকে সম্ভ্রম বাঁচাতে রানি কর্ণাবতী
জহর ব্রত পালন করেছেন।কর্ণাবতীর ঝলসে যাওয়া
দেহটা দেখে হুমায়ুন শিশুর মতন কাঁদতে কাঁদতে
বলে উঠলেন--আমি বোন তোমাকে বাঁচাতে পারলাম
না।তুমি বোন আর একটু অপেক্ষা করলে না কেন?
আমি তো বোন তোমার সম্ভ্রম বাঁচাতে ছুটে এসেছি।
এ তুমি কি করলে বোন।কর্ণাবতীর মৃতদেহের উপর
হুমায়ুনের চোখ থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়তে
লাগল। এই করুণ দৃশ্যর মধ্যে ভাই-বোনের
রাখি-বন্ধন চির অক্ষয় হয়ে থাকল।
Comments :0