NATUNPATA | STORY | MAHANAYAK | SOURISH MISHRA | 29 AUGUST 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | গল্প | মহানায়ক | সৌরীশ মিশ্র | ২৯ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  STORY  MAHANAYAK  SOURISH MISHRA  29 AUGUST 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

গল্প 

মহানায়ক

সৌরীশ মিশ্র 

২৯ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

 

"বাবা, ও তো উত্তম কুমার, না?" আমার হাতে ধরা ক্রোড়পত্রটার কভারের দিকে ইশারা করে বলল আমার সাত বছরের মেয়ে কুঁড়ি। 
উত্তম কুমারকে চেনে কিন্তু আমার মেয়ে। তবু, ওর এই প্রশ্ন করার মোক্ষম কারণ আছে একটা। ক্রোড়পত্রটির প্রচ্ছদের ছবিটা উত্তম কুমারের এক্কেবারে প্রথম দিকের। বুঝতে পারলাম, তাই হয়তো বা একটুখানি কনফিউজ়ড ও।
"হুঁ, উত্তম কুমার। তবে, ও বলে না মা, বলতে হয় উনি।" শুধরে দিয়ে বলি মেয়েকে আমি।
"স্যরি, উনি, উনি। কতোবার বলেছো তুমি! তবু ভুলেই যাই বারে বারে।" বলে মেয়ে।
রবিবারের বিকেল। ক'দিন আগে হাতে এসেছে "মহানায়ক"-কে নিয়ে একটা বিশেষ ক্রোড়পত্র। "স্পেশাল পুলআউট"-টা পেয়েছি একটা বাংলা দৈনিকের সাথে। অনেক ক'টা লেখা ছিল সেটায়। ক'টা পড়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। যে ক'টা পড়া হয়নি তারই একটা পড়ছিলাম দোতলার ব্যালকনিতে বসে। 
তখনই কুঁড়ি বারান্দায় এসে কথাখানা বলল। এতোক্ষণ ঘুমোচ্ছিল ও। বুঝলাম, ঘুম ভাঙতেই উঠে এসেছে।
"তুমি উনিকে দেখেছো বাবা?" বেতের যে চারটে চেয়ার রাখা থাকে এই ব্যালকনিতে, তারই একটায় বসতে বসতে বলল মেয়ে।
"উনিকে নয় মা, বলতে হয় ওনাকে।" বাধ্য হয়েই ফের শুধরোতে হয় মেয়েকে। তারপর বলি, "না রে, আমি দেখিনি। উনি তো আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আমার জন্মের আগেই। তবে তোর ঠাকুরদা দেখেছিল তাঁকে।" হাতে ধরা "স্পেশাল পুলআউট"-টা সামনের ছোট্ট বেতের টেবিলটায় রেখে বললাম আমি।
"ঠাকুরদা দেখেছিল!" বিস্ময় মাখানো কণ্ঠে বলে কুঁড়ি।
"হ্যাঁ রে, দেখেছিল। একবার।" বলি আমি।
"বাবা, বলো না কোথায় দেখেছিল ঠাকুরদা ওনাকে, বলো না, বলো না..."
বুঝতে পারি মেয়ে ছাড়বে না গল্পটা না শুনে। তাছাড়া এই গল্পটা কাউকে বলতে বেশ ভালোই লাগে আমার। আমার বাবা উত্তম কুমারকে দেখেছে, কথাটা বলতেও কেমন যেন গর্ব গর্ব ফিলিংস হয় একটা। বাবার মুখে আমি উত্তম কুমারকে চাক্ষুষ দেখার গল্প কতোবার যে শুনেছি তার ইয়ত্তা নেই। সেই গল্পটাই মেয়েকে বলতে শুরু করলাম এইবার জমিয়ে।
"তখন তোর ঠাকুরদা কলেজে পড়ছে, বুঝলি। হঠাৎই এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলো উত্তম কুমার আসছেন ক'দিন বাদেই একটা অনুষ্ঠানে স্টার থিয়েটারে। স্টার থিয়েটারটা মনে আছে তোর? আগের বছর হাতিবাগানে পুজোর মার্কেটিং করতে গিয়ে দেখালাম তোকে, মনে আছে?" মেয়েকে শুধোই।
"হুঁ হুঁ, মনে আছে।" সাথে সাথে বলে মেয়ে আমার।
"তা, বাবার তো অনেকদিন ধরেই ইচ্ছা ছিল খুব, উত্তম কুমারকে সামনা-সামনি দেখবে, তাই বাবা খবরটা পেয়েই সোজা চলে গেল স্টার থিয়েটারে এক্কেবারে সক্কাল-সক্কাল যেদিন থেকে টিকিট বিক্রি শুরু হওয়ার কথা সেইদিনই। সেখানে গিয়ে তো দেখে বাবা, টিকিট কাউন্টারের সামনে বি-শা-ল লাইন। বাবা এক্সপেক্টও করেছিল এই ধরনের লাইনই হবে। বাবা লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। কাউন্টার খুলতে তখনো দেরী আছে বেশ কিছুটা। হঠাৎ দেখে, অনুপ কুমার এলেন আর সোজা ঢুকে গেলেন স্টার থিয়েটারের টিকিট কাউন্টারে।"
"অনুপ কুমার কে বাবা?" মেয়ে শুধোয় আমায়।
"উনিও খুব বড় অভিনেতা। তুই দেখেছিস নিশ্চয়ই সিনেমায়। নামটা জানিস না, তাই বুঝতে পারছিস না। আমি পরে ইন্টারনেট থেকে ওনার ছবি দেখিয়ে দেবো তোকে।" বলি আমি। তারপর কয়েকক্ষণের একটা বিরতি নিয়ে ফের শুরু করি বলতে। "তা যা বলছিলাম। সেদিন অনুপ কুমারই টিকিট দিয়েছিলেন সবাইকে কাউন্টার থেকে। বাবা তো খুব খুশি। প্রথমতঃ, উত্তম কুমার আসবেন যে অনুষ্ঠানে তার টিকিট পাওয়া গেছে। তার উপর আবার, অনুপ কুমারের হাত থেকে টিকিট পেয়েছে। আনন্দ হবে না! 
যাই হোক। দেখতে-দেখতে অনুষ্ঠানের দিন চলে এলো। বাবা-রা তখন থাকতো বেলেঘাটায়। অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার অনেক আগেই পৌঁছে গেল বাবা স্টার থিয়েটারে। লোকে-লোকারণ্য ঐ অঞ্চল। গাড়ি চলাচল-ও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পুলিশে-পুলিশে ছয়লাপ চারদিক। হবেই তো। উত্তম কুমার আসছেন বলে কথা। বাবার তো টিকিট ছিল, তাই স্টার থিয়েটারের চত্বরে ঢুকে গেল বাবা। তবে বুদ্ধি করে, ঢুকেই সোজা অডিটোরিয়ামের ভিতরে চলে গেলো না। দাঁড়াল গিয়ে স্টার থিয়েটারের সেই প্যাসেজে যেখান দিয়ে উত্তম কুমারের গাড়ি ঢুকবে।
বাবা অপেক্ষা করতে থাকে প্যাসেজের এক কোণায় দাঁড়িয়ে। একটু একটু করে সময় এগোতে থাকে। ঘন্টা দুয়েক মতোন কেটে গেছে। ততক্ষণে ঐ প্যাসেজেও বেশ কিছু লোক এসে জড়ো হয়েছে। হঠাৎই স্টার থিয়েটারের বাইরে একটা শোরগোল উঠল জোর। আর তার পর মুহূর্তেই উত্তম কুমারের বিশাল গাড়িটা ঢুকে পড়ল স্টার থিয়েটারের গেট দিয়ে ঐ প্যাসেজে। আর বাবার ভাগ্য সেদিন এতোই ভালো ছিল যে, গাড়িটা এসে থামল বাবা যেখানে দাঁড়িয়েছিল তা থেকে মাত্র কয়েক হাত দূরে। 
ততক্ষণে তো ঐ প্যাসেজও ভিড়ে ভিড়াক্কার। রীতিমত ধাক্কাধাক্কিই শুরু হয়ে গেছে। তারই মধ্যে তোর ঠাকুরদাও দাঁড়িয়ে আছে কোনোমতে। তবে বেশিক্ষণ ঐভাবে থাকতে হয়নি। কারণ, পুলিশ অডিটোরিয়ামে ঢোকার গেটটা একটু ফাঁকা করতেই উত্তম কুমার নেমেছিলেন তাঁর গাড়ি থেকে। আর নেমেই সোজা ঢুকে গিয়েছিলেন ভিতরে। ধুতি-পাঞ্জাবি পড়েছিলেন সেইদিন উত্তম কুমার। বাবা বলতো, যখন ঢুকছেন উত্তম কুমার, তাঁর ধুতির কোঁচাটা নাকি মাটিতে পুরো লুটোচ্ছিল! 
সেইদিন উত্তম কুমার যখন অডিটোরিয়ামের স্টেজে উঠেছিলেন তখনও তো ওনাকে দেখেছিল বাবা, কিন্তু, সে অনেকটা দূর থেকে। প্যাসেজের মতোন কয়েক হাত দূর থেকে তো নয়। তাই, বাবা উত্তম কুমারকে দেখার গল্প যাকেই যখনই বলতো, দেখেছি, উত্তম কুমারকে স্টার থিয়েটারের প্যাসেজে দেখার গল্পটাই বলতো সবার আগে, তারপর তাঁকে অডিটোরিয়ামের স্টেজে দেখার গল্পটা।" বাবার উত্তম কুমারকে দেখার গল্প শেষ করে থামি এবার আমি। এতোক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে একমনে গল্পটা শুনছিল কুঁড়ি। আমার দিক থেকে এইবারে চোখ সড়ালো সে। কুঁড়ি এখন অপলকে দেখছে সামনের টেবিলটার উপর রাখা উত্তম কুমারকে নিয়ে সেই বিশেষ ক্রোড়পত্রটার কভারটা। প্রচ্ছদটায় উত্তম কুমারের একটা ক্লোজ় আপ ফটো। ভুবনভোলানো হাসি লেগে "মহানায়ক"-এর ঠোঁটে।


 

Comments :0

Login to leave a comment