অরিজিৎ মণ্ডল: কল্যাণী
যারা লাথি মারে ইতিহাস তাদের মুছে দেয়। আর যারা লাথি খায় তারা হাত মুঠো করে রুখে দাঁড়ায়। বামপন্থীরা শিক্ষা-কাজ, ফসলের দাম, মজুরির দাবিতে লড়াই জারি রাখবে।
রবিবার কল্যাণীতে সমাবেশে একথা বলেছেন সিপিআই(এম) রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম। রাজ্য কমিটির বর্ধিত অধিবেশনের পর আয়োজিত সমাবেশে একথা বলেন তিনি। বক্তব্য রেখেছেন সিপিআই(এম) সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মীনাক্ষী মুখার্জি। সভাপতিত্ব করেছেন পার্টির নদীয়া জেলা সম্পাদক মেঘলাল শেখ। (বিধানসভায় থাকলেই বিরোধী হওয়া যায় না, মেহনতির পক্ষে যারা কথা বলে তারাই আসল বিরোধী : মীনাক্ষী/ বিজেপিকে জনবিচ্ছিন্ন করতে হবে, তাদের হারাতে হবে : বেবি)
হুমকি উড়িয়ে এদিন সমাবেশে এসেছেন বহু অংশের মানুষ। স্লোগানে, মিছিলে সরব থেকেছে সমাবেশ। নিয়েছেন লড়াইয়ের অঙ্গীকারও। বৃষ্টির পূর্বাভাস ছিল। তার চেয়েও বড় ছিল বিজেপি’র হুমকি। কিন্তু সব বাধা হটিয়ে একদিকে করিমপুর, আরেকদিকে চাকদা, পলাশী থেকে এসেছেন মানুষ। এদিন মাঠ ছাপিয়ে সমাবেশ চলে যায় রেল স্টেশন পর্যন্ত। প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে বহু মানুষ ভাষণ শুনেছেন। মঞ্চ থেকে সমাবেশকে দেখতে গ্যালারির মতো লাগছিল। সেলিম সে কথা বলেছেনও। কাদা-জল উপেক্ষা করে ঠায় মাঠে বসে থেকেছেন সিপিআই(এম) কর্মী-সমর্থকরা। কেবল নদীয়া নয়। মুর্শিদাবাদ বা উত্তর চব্বিশ পরগনা থেকেও লাল ঝান্ডা নিয়ে এসেছেন বহু সিপিআই(এম) কর্মী-সমর্থক।
সেলিম বলেছেন, ফ্যাসিস্টরা ভয় দেখাতে চায়। আমরা ভয় পাচ্ছি না। অন্যায়ের বিরুদ্ধে, অপশাসনের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্রের পক্ষে লড়াই জোরদার হবে। আজ বাম বনাম দক্ষিণ সরাসরি লড়াই। তৃণমূল নামের পর্দা উঠে গিয়েছে। ফলে কৃষকের ফসলের দাম, স্কুলের দাবি, বেকারের হাতে কাজ, গরিবের কাজ-আবাসের টাকা, ভোটের অধিকার, মেয়েদের সম্মানের দাবিতে লড়াই তীব্রতর হবে।
কল্যাণী সমাবেশের হল কেবল নয় সমাবেশ করতেও বাধা দিয়েছে বিজেপি। সেলিম জানান, যে মাঠে সমাবেশ করার কথা ছিল প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজে লাগিয়ে তা করতে দেয়নি। দ্রুত বিকল্প মাঠে সভা করতে হয়েছে।
সেলিম বলেন, তৃণমূলের পথে চলছে বিজেপি। তৃণমূলকে দেখে শিক্ষা নেয়নি। তৃণমূল সব দখল করেছিল, বালিঘাট থেকে কালীঘাট। মানুষ তাই তাদের সরিয়ে দিয়েছে। আজ বিজেপি মনে করছে তারা মালিক। গণতন্ত্রে সরকার গড়লে কেউ মালিক হয় না।
সেলিম মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুকে হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, শুভেন্দু তৃণমূলের পতাকা নিয়ে বলেছিল লাল ঝান্ডা কেন রুমালও থাকবে না। এখন সেই পতাকা দিয়ে অমিত শাহের চেয়ার মোছা হচ্ছে। তৃণমূলের ঝাণ্ডা নেই। লাল ঝাণ্ডা ছিল, আছে, থাকবে। কারণ লাল ঝাণ্ডা চিট ফান্ড, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতির টাকায় হয় না। মেহনতি মানুষের ঘাম ঝরানো পয়সায়, লড়াইয়ে টিকে থাকে।
সেলিম সমাবেশকে দেখিয়ে বলেন, অদ্ভূত অবস্থা চলছে পশ্চিমবঙ্গ এবং দেশে। যাদের চেয়ার আছে তাদের বসার লোক নেই। যাদের আচ্ছাদন আছে, তারা লোক জোগার করতে পারছে না। আর এখানে আচ্ছাদন নেই, দ্রুত ব্যবস্থা করতে হয়েছে, তবু এসেছেন বহু মানুষ।
সেলিম বলেন, বিজেপি’র মতো দক্ষিণপন্থী শক্তি আচ্ছাদন কেড়ে নিচ্ছে বুলডোজার দিয়ে। ভোটের সময় বলেছিল ‘মোদী কি গ্যারান্টি’। সেখানে ‘তাণ্ডব করব’ বলেছিল? ‘তাণ্ডব’ করার কথা যাদবপুরে তো বলেছে বিজেপি। তা’হলে হেডলাইনে ‘তাণ্ডব’ লিখলে মামলার মুখে পড়বে কেন সংবাদপত্র? তার কারণ, সংবাদের শিরোনাম আরএসএস’র পছন্দ হয়নি।
সেলিম বলেন, মমতা ব্যানার্জি ঠিক করেছিলেন কোন কাগজ লাইব্রেরিতে থাকবে, কোন কাগজ থাকবে না। আর আমেদাবাদে আনা ফ্রাঙ্কের বই, আফগানিস্তানের মালালার বই পড়ার জন্য হামলা করছে বিজেপি’র সঙ্গে থাকা শক্তি। কলেজ স্ট্রিটে ফতোয়া দিয়েছে বাংলাদেশ থেকে বই আসবে না। তা’হলে বাঙালি মারাঠি পড়বে, গুজরাটি পড়বে, বাংলা পড়তে পারবে না! আর এসব কথা বললেই বলছে ‘দেশদ্রোহী’। মানুষের কথা বললে, ঐক্যের কথা বললে, বিভাজনের বিরুদ্ধে কথা বললে কিসের দেশদ্রোহ?
সেলিম বলেন, কোচবিহারে মিন্টু মিঞাকে খুন করেছে গোরক্ষার নামে। এফআইআর হয়নি। মীনাক্ষী গিয়েছিল। ওরা গাড়িতে ডিম ছুঁড়েছে। মিড ডে মিলের পাত থেকে ওরাই ডিম তুলে নিচ্ছে। ভোটের আগে ফুল খেলা খেলল। ভোটের পর ডিম নিয়ে খেলছে। আমাদের কাছে রাজনীতি ফুল খেলা বা ডিম খেলা নয়। মানুষের জীবন নিয়ে, তার রোজগার নিয়ে। তিনি বলেন, পেঁয়াজের দামে চোখে জল, উৎসবের আগে বিজেপি চিনির দাম বাড়িয়ে দিল। ইথানল বানাবে আখ দিয়ে। আর চিনির দাম বেড়ে গেল। সুভাষ চন্দ্র, বিজয় মালিয়ারা ব্যাঙ্কের টাকা লুটছে। এদের বলে ‘ফোর টুয়েন্টি’। আর বিজেপি সরকার হয়েছে ‘ই টুয়েন্টি’।
সেলিম বলেন, আমরা নতুন কিছু বলছি না। ওদের সঙ্কল্প পত্রে যা বলেছিল তার দাবি জানাচ্ছি। তাতেই ওদের রাগ হয়ে যাচ্ছে কেন? লাল ঝাণ্ডা মানুষকে সংগঠিত করে সরকারের কাছে প্রশ্ন তোলে। তাই লাল ঝাণ্ডাকে সভা করতে বাধা দেয়। তিনি বলেন, লাখ লাখ লোকের ভোট কেটেছে। আদিবাসী, মতুয়া, নমশূদ্র, বিশেষত মহিলাদের নাম বাদ গিয়েছে। বামপন্থীরা বলি সর্বজনীন ভোটাধিকার। দক্ষিণপন্থীরা সর্বজনীনতার নীতির বিপক্ষে। বামপন্থীরা সকলের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রেশনের পক্ষে। দক্ষিণপন্থীরা নাম বাদ দিতে চায়। তাই হিন্দু-মুসলমান করে। আসলে হিন্দু বা মুসলমান বিষয় নয়। দক্ষিণপন্থীরা কাউকে না কাউকে, আলাদা করে দেখিয়ে আক্রমণের লক্ষ্য করে। আমেরিকায় যেমন চাকরির সঙ্কটের জন্য মেক্সিকোর অভিবাসীদের দেখায়। এখানে চাকরি দিতে পারছে না, বাংলাদেশি দেখাচ্ছে। মণিপুরে মেইতেই আর নাগা কুকির সংঘাত বাঁধাচ্ছে। সেখানে মুসলিমের বিষয় নেই। আসলে মন্দির বা মসজিদের কোনও বিরোধ নেই। যারা দাঙ্গা করতে চায় তারা সংঘাত বাঁধায়। কাজী নজরুল ইসলাম এই নদীয়ার মাটিতে একশো বছর আগে ‘কান্ডারী হুঁশিয়ার’ লিখেছিলেন। লিখেছিলেন ‘হিন্দু না ওরা মুসলিম এই জিজ্ঞাসে কোন জন’।
সেলিম বলেন, দেশের মানুষ বিজেপি-কে পছন্দ করছেন না। নতুন প্রজন্ম ক্ষোভ জানাচ্ছে। বাংলাও মেনে নেবে না। মনে রাখতে হবে, আমরা ধর্মের বিরোধী না। ধর্মকে নিয়ে রাজনীতির বিরোধী। ধর্মযুদ্ধের নামে খালিস্তানিরা আমাদের ১১২ কমিউনিস্টকে শহীদ করেছে পাঞ্জাবে। আমরা বলেছি হিন্দুরাষ্ট্র বা খালিস্তান রাষ্ট্র কোনোটিই চাই না। আমরা চাই সবার সমান অধিকার, সমান মর্যাদা।
সেলিম বলেন, কেউ কেউ ভেবেছিল তৃণমূলকে শায়েস্তা করবে বিজেপি-কে এনে। তারপর দেখলাম। ডজন ডজন দল বেঁধে তৃণমূল থেকে বিজেপি-তে গেল। বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য প্রথমে বললেন, বিজেপি-র তৃণমূলীকরণ করতে দেব না। দ্বিতীয় সপ্তাহে বললেন, ভালো তৃণমূল নেব। তিনি বলেন, সব চোর, মন্ত্রী, কাউন্সিলররা দল বেঁধে বিজেপি-তে। সিপিআই(এম) বলেছিল ‘চোর ধর, জেলে ভরো‘। আর বিজেপি বলছে চোর ধরো, দলে টানো। পুরনো বিজেপি রেগে যাচ্ছে।
Comments :0