Nepal Flash Flood

মূহুর্তের সিদ্ধান্তে ১,৬৪৩ পড়ুয়ার প্রাণ বাঁচালেন নেপালের শিক্ষক

আন্তর্জাতিক

বুধবার সকাল ৯টা ২০ মিনিট। আচমকাই বন্ধুর ফোন। ওপার থেকে আতঙ্কিত কণ্ঠ—“গ্রামটা আর নেই, নদী নিয়ে চলে গিয়েছে। তুমি দৌড়াও।” মূহুর্তের মধ্যে পরিস্থিতির ভয়াবহতা বুঝে সিদ্ধান্ত নেন নেপালের ত্রিশুলি উপত্যকার ত্রিভুবন ত্রিশুলি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রাজেন্দ্র দাওয়াদি। তার দ্রুত সিদ্ধান্তেই ভয়াবহ হড়পা বানের হাত থেকে প্রাণে বাঁচলো স্কুলের ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া।
নেপালের নুয়াকোট জেলার বন্যাকবলিত এলাকায় সেদিন তিনতলা স্কুল ভবনে পড়ুয়া ও শিক্ষক-কর্মীদের নিয়ে ব্যস্ততা চলছিল। কিন্তু পাহাড়ি নদীগুলিতে হঠাৎ জলস্ফীতি শুরু হতেই কয়েক মিনিটের মধ্যে পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে। হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ভেঙে পড়ে সৃষ্ট ওই হড়পা বানে পাহাড়ি নদীগুলির জলস্রোত সঙ্গে নিয়ে আসে পাথর, বরফ, কাদা ও ধ্বংসাবশেষ। ভেসে যায় বাড়িঘর, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র-সহ একাধিক পরিকাঠামো।
সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নেপালে এই বিপর্যয়ে ৭৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিব্বতে মৃত্যু হয়েছে আরও ১৬ জনের। নেপালে এখনও প্রায় ২,৪৯৮ জন নিখোঁজ, আর তিব্বতের গিয়িরং কাউন্টিতে নিখোঁজ রয়েছেন আরও ৫৪৬ জন।
৪৭ বছরের ইংরেজির শিক্ষক দাওয়াদি প্রথমে ভেবেছিলেন স্কুলটি নিরাপদ। কংক্রিটের তৈরি তিনতলা ভবনটি নদী থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে ছিল। পাশাপাশি থাকা ইস্পাতের সেতুটিও স্কুলের প্রায় সমতলেই ছিল। ফলে প্রথমে বিপদের আশঙ্কা তেমন করেননি তিনি।
কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়। এক অভিভাবক ছুটে এসে তাকে জানান, নদীর জল দ্রুত বাড়ছে। সঙ্গে সঙ্গেই স্কুলের ঘণ্টা বাজিয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের শ্রেণিকক্ষ খালি করার নির্দেশ দেন দাওয়াদি। স্কুলবাসের চালকদেরও ফোন করে পড়ুয়াদের নিয়ে নিরাপদ জায়গায় ফিরে যেতে বলেন।
এর মধ্যেই তিনি দেখতে পান, একটি স্কুলবাস যার চালকের সঙ্গে তিনি যোগাযোগ করতে পারেননি সেতু পার হচ্ছে। তখনই পড়ুয়াদের মধ্যেও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এক ছাত্রী আতঙ্কে অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে মোটরবাইকে করে উঁচু এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। বাকিরা পায়ে হেঁটে নিরাপদ জায়গার দিকে ছুটতে শুরু করে। তাদের পিছনেই ছিলেন দাওয়াদি।
শেষ পর্যন্ত পড়ুয়ারা একটি বোধিবৃক্ষের নিচে আশ্রয় নেয়। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রবল জলস্রোত স্কুলের ভবন ও আশপাশের পরিকাঠামো ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
দাওয়াদির তৎপরতায় ১,৬৪৩ জন পড়ুয়া এবং শিক্ষক-কর্মীদের প্রায় সকলেই প্রাণে বেঁচে যান। তবে স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষক ৩২ বছরের সন্তোষ পারিয়ার বাঁচতে পারেননি। নদীর ধারে ভাড়া বাড়িতে রান্না করতে ফিরে গিয়ে তিনি প্রবল স্রোতে ভেসে যান। স্কুলের কর্মী সুলতান লামাও দরজা বন্ধ করতে ফিরে গিয়ে প্রাণ হারান।
ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দারা দাওয়াদিকে ‘নায়ক’ বলে অভিহিত করছেন। কিন্তু নিজের ভূমিকা নিয়ে তিনি খুব একটা গর্ব করতে রাজি নন। ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া স্কুলের সামনে দাঁড়িয়ে তার কথায়, “আমি আর কী-ই বা করতে পারতাম?”
ভয়াবহ এই বন্যার উৎস ছিল লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের একটি বিশাল বরফ-পাথরের খণ্ড। সেটি পাহাড় থেকে ভেঙে প্রায় ১,২০০ মিটার নিচে লহেন্দে খোলার খাড়া গিরিখাতে গিয়ে পড়ে। তার জেরেই সৃষ্টি হয় প্রবল জলস্রোত। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির ভূ-রূপবিজ্ঞানী ড্যানিয়েল শুগারের অনুমান, ভেঙে পড়া ওই বরফ-পাথরের স্তূপটি প্রায় ৫০ একর এলাকা জুড়ে ছিল লন্ডনের গ্রিন পার্কের প্রায় সমান।
নেপালের এই অঞ্চল অবশ্য নতুন করে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়নি। ২০১৫ সালের এপ্রিলে ৭.৮ মাত্রার ভয়াবহ ভূমিকম্পে দক্ষিণ এশিয়ায় ৮,৯৬২ জনের মৃত্যু হয়েছিল। সেই ভূমিকম্পের জেরে রসুয়া জেলার লাংটাং এলাকায় ভয়াবহ তুষারধস নামে। চাপা পড়ে প্রাণ হারান সেখানে থাকা প্রায় ৩০০ জন বাসিন্দা।
প্রকৃতির ভয়াবহতার মধ্যেও রাজেন্দ্র দাওয়াদির কয়েক মিনিটের দ্রুত সিদ্ধান্ত এ বার ১,৬৪৩টি পরিবারকে ফিরিয়ে দিয়েছে তাদের সন্তানদের। ধ্বংস হয়ে গিয়েছে স্কুল, কিন্তু বেঁচে গিয়েছে পড়ুয়ারা।

Comments :0

Login to leave a comment