নতুনপাতা
মণ্ডা মিঠাই
রাখিবন্ধন
রাজ মন্ডল
৩০ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
ভারতবর্ষ উৎসবের দেশ। এখানে সারা বছর নানা ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব পালিত হয়। এই সকল উৎসবের মধ্যে রাখিবন্ধন একটি অত্যন্ত জনপ্রিয় ও তাৎপর্যপূর্ণ উৎসব। এটি মূলত ভাই-বোনের স্নেহ, ভালোবাসা, বিশ্বাস ও দায়িত্ববোধের প্রতীক। প্রতি বছর শ্রাবণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে এই উৎসব পালিত হয়। ছোট-বড় সকলের কাছেই রাখিবন্ধন একটি আনন্দময় ও আবেগঘন দিন।
‘রাখি’ শব্দের অর্থ রক্ষাসূত্র এবং ‘বন্ধন’ শব্দের অর্থ সম্পর্কের বন্ধন। তাই রাখিবন্ধন বলতে এমন একটি পবিত্র বন্ধনকে বোঝায়, যা ভালোবাসা, সুরক্ষা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। এই দিনে বোনেরা ভাইয়ের হাতে রাখি বেঁধে তার সুখ, সমৃদ্ধি ও দীর্ঘায়ু কামনা করে। ভাইয়েরাও বোনদের সুরক্ষা ও পাশে থাকার অঙ্গীকার করে। এই প্রথা বহু যুগ ধরে ভারতীয় সমাজে প্রচলিত রয়েছে।
রাখিবন্ধনের ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। হিন্দু পুরাণে এর নানা উল্লেখ পাওয়া যায়। একটি কাহিনি অনুযায়ী, দেবরাজ ইন্দ্র যখন অসুরদের সঙ্গে যুদ্ধে বিপদের সম্মুখীন হন, তখন তাঁর স্ত্রী ইন্দ্রাণী তাঁর হাতে একটি পবিত্র রক্ষাসূত্র বেঁধে দেন। সেই রক্ষাসূত্রের আশীর্বাদে ইন্দ্র যুদ্ধে বিজয় লাভ করেন। অনেকেই এই ঘটনাকে রাখিবন্ধনের প্রাচীন উৎস বলে মনে করেন।
ঐতিহাসিকভাবেও রাখিবন্ধনের গুরুত্ব রয়েছে। রাজপুত রানি কর্ণাবতী গুজরাটের সুলতান বাহাদুর শাহের আক্রমণের সময় মুঘল সম্রাট হুমায়ুনের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে একটি রাখি পাঠিয়েছিলেন। হুমায়ুন সেই রাখির সম্মান রক্ষা করার জন্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। এই ঘটনা রাখিবন্ধনের সামাজিক ও মানবিক গুরুত্বকে আরও উজ্জ্বল করে তোলে।
রাখিবন্ধনের দিন ঘরে ঘরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়। সকালে স্নান সেরে সবাই নতুন পোশাক পরে। বোনেরা একটি থালায় রাখি, চন্দন, ধূপ, প্রদীপ, ফুল ও মিষ্টি সাজিয়ে রাখে। এরপর ভাইয়ের কপালে তিলক এঁকে রাখি বাঁধা হয়। ভাইকে মিষ্টি খাওয়ানো হয় এবং তার মঙ্গল কামনা করা হয়। ভাইও বোনকে উপহার দেয় এবং তার প্রতি ভালোবাসা ও দায়িত্বের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে। পরিবারের সকল সদস্য এই আনন্দঘন মুহূর্তে অংশগ্রহণ করে।
বর্তমান যুগে রাখিবন্ধনের অর্থ আরও বিস্তৃত হয়েছে। এখন এটি শুধু ভাই-বোনের সম্পর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বন্ধু, প্রতিবেশী কিংবা সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষও পরস্পরের হাতে রাখি বেঁধে ভ্রাতৃত্ব, সম্প্রীতি ও ঐক্যের বার্তা দেয়। অনেক বিদ্যালয়, সামাজিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনও রাখিবন্ধন উৎসব পালন করে। এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ভালোবাসা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায়।
রাখিবন্ধন আমাদের শেখায় যে সম্পর্কের প্রকৃত ভিত্তি হলো বিশ্বাস, ভালোবাসা ও দায়িত্ববোধ। শুধু রক্তের সম্পর্ক নয়, মানবতার বন্ধনও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই উৎসব সমাজে সৌহার্দ্য, সহমর্মিতা ও ঐক্যের বার্তা ছড়িয়ে দেয়। বর্তমান সময়ে যখন মানুষ নানা বিভেদে বিভক্ত, তখন রাখিবন্ধনের আদর্শ আমাদের একে অপরের কাছাকাছি আসতে সাহায্য করে।
পরিশেষে বলা যায়, রাখিবন্ধন ভারতীয় সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। এটি ভাই-বোনের মধুর সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করে এবং সমাজে ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও মানবিকতার শিক্ষা দেয়। এই উৎসবের মূল বার্তা হলো— পারস্পরিক সম্মান, স্নেহ ও বিশ্বাসের মাধ্যমে সুন্দর সম্পর্ক গড়ে তোলা। তাই রাখিবন্ধন কেবল একটি উৎসব নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধের এক উজ্জ্বল প্রতীক।
সপ্তম শ্রেণী
কল্যাণ নগর বিদ্যাপীঠ খড়দহ উত্তর ২৪ পরগণা
কল্যাণ নগর, খড়দহ
Comments :0