Post Editorial

সরকার বদলেছে, শাসনের অভিমুখ নয়

সম্পাদকীয় বিভাগ

অমিয় পাত্র

৩১ আগস্ট আমাদের কাছে শুধু একটি তারিখ নয়। ১৯৫৯ সালের এই দিনটি বাংলার গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে রক্তে লেখা এক অধ্যায়ের স্মারক। খাদ্যের দাবিতে কলকাতার রাজপথে নেমেছিলেন হাজার হাজার মানুষ।  সেই ভুখা মিছিলে শামিল হওয়া অগণিত মানুষ খাদ্য চেয়েছিলেন ব্রিটিশ আমলের লাটসাহেবের কাছে নয়, একটি স্বাধীন, গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচিত সরকারের নিকট। খাদ্যের বেআইনি মজুত এবং কালোবাজারিই তীব্র খাদ্যাভাবের অন্যতম কারণ ছিল। তাই রাজ্যজুড়ে লক্ষ লক্ষ অভুক্ত, নিরন্ন মানুষের পক্ষে সরকারের কাছে প্রতিকার চাওয়া, বাঁচার জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করার দাবি জানানোর মধ্যে অন্যায় কিছুই ছিল না। এই নিরন্ন মানুষজন শান্তিপূর্ণভাবেই তাদের দাবি মুখ্যমন্ত্রীর নজরে আনতে চেয়েছিলেন। সরকার প্রতিহিংসার পথে গিয়েছিল। রক্তাক্ত হয়েছিল সে মিছিল, শাসকের হাতিয়ার মৃত্যুমিছিলে পরিণত করেছিল সেই আন্দোলনকে। ক্ষুধার্ত জনতার উপর তৎকালীন রাজ্য সরকারের বর্বরোচিত হামলার বিরুদ্ধে, মানুষের গর্জে ওঠা ছাড়া পথ ছিল না। সেই হিংস্রতার দিনটি আজ থেকে ৬৭ বছর (১৯৫৯) আগের, শহীদের রক্তরঞ্জিত এক ইতিহাসকে ফিরে দেখার দিন-  ৩১শে আগস্ট। 
সময়ের সঙ্গে পৃথিবী বদলেছে, ভারত, পশ্চিমবঙ্গও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি উৎপাদনের ক্ষমতা বাড়িয়েছে, খাদ্য উৎপাদন ও সরবরাহের ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে। সেদিনের খাদ্যের দাবি ২০১৩ সালে মান্যতা পেয়েছে। দেশে জাতীয় খাদ্য সুরক্ষা আইন হয়েছে। খাদ্যে ভরতুকি চালু হয়েছে। সকলের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থাকে সরকার মান্যতা দিয়েছে। তাই ১৯৪৩-এর মতো দুর্ভিক্ষের পুনরাবৃত্তি আজ একই চেহারায় হবে—এমন ভাবার কারণ নেই।
পঞ্চাশের মন্বন্তরের সময় কালোবাজারি, মজুতদারি, ভেজাল কারবারিদের মুনাফার পাহাড় গড়তে দেখা গেছে। নামমাত্র মুল্যে কৃষকের জমি আত্মস্যাৎ করেছিল জমিদার, মহাজনেরা। অতিমারীতে অন্য চেহারায় তারই পুনরাবৃত্তি দেখা গেল। ভারতে লকডাউনের সুযোগে, সরকার ও মিডিয়ার প্রত্যক্ষ সহায়তায় বিপুল মুনাফা কামিয়েছে আদানি গোষ্ঠী, আম্বানি গোষ্ঠী, বৃহৎ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি, ইলেক্ট্রনিক ডিভাইসের সংস্থা এবং ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলো। এখন বিশ্বায়িত পৃথিবী, তাই লুটের এলাকাও বিশ্বজোড়া। সেই সময়ে অভাবের তাড়নায় জমি জিরেত জলের দামে বিক্রি করতে কৃষক বাধ্য হয়েছে। লকডাউনে কাজের হাহাকার সস্তা শ্রমের বাজারকে স্ফীত করেছে। প্রযুক্তি ও আধুনিক প্রকৌশল নির্ভর শোষণের ব্যবস্থা কায়েম হয়েছে শ্রম নির্ভর প্রতিটি শাখা-প্রশাখায়। আকাল ফিরে আসছে ভিন্ন রূপে, আরও গভীর, আরও সুদুরপ্রসারি  অভিঘাত নিয়ে। 
আজকের দিনে আকাল
বিশ্ব অর্থনীতিতে পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং বৃহৎ কর্পোরেট পুঁজির ক্রমবর্ধমান আধিপত্য অর্থনীতির নীতি ও অগ্রাধিকারের উপর গভীর প্রভাব ফেলছে। মুনাফার সর্বাধিকীকরণই যখন প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, তখন উৎপাদন কত মানুষের প্রয়োজন মেটাবে তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে কত দ্রুত এবং কত বেশি মুনাফা করা যাবে। প্রযুক্তির দ্রুত প্রসার ও উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তন নতুন সম্ভাবনা তৈরি করলেও তার সঙ্গে স্থায়ী কর্মসংস্থান বাড়ছে না; বরং শ্রমের প্রয়োজন কমছে, কাজ-অনিশ্চিত ও চুক্তিভিত্তিক। নিরাপদ কাজ নেই; থাকলেও কাজের নিশ্চয়তা নেই; উৎপাদন বাড়ছে, কিন্তু তার সুফল সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
এই বিশ্বব্যবস্থার অভিঘাত থেকে ভারতও মুক্ত নয়। একদিকে সম্পদ ও আয় ক্রমশ অল্প কয়েকটি হাতে কেন্দ্রীভূত হচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা নিম্নগামী। লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি সেই সঙ্কটকে আরও তীব্র করছে। কৃষক উৎপাদন করছেন, অথচ উৎপাদনের খরচ, বাজারদর ও ন্যায্য পারিশ্রমিকে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। শিক্ষা ও চিকিৎসার ক্রমবর্ধমান ব্যয় সেগুলিকে অনেকের কাছে ক্রমশ দুর্লভ করে তুলছে। ফলে আজকের আকাল শুধু খাদ্যের অভাব নয়—আয় কমে যাওয়া, কাজের অনিশ্চয়তা, মজুরির অবমূল্যায়ন, মূল্যবৃদ্ধি এবং ক্রয়ক্ষমতার সঙ্কট মিলিয়ে তৈরি হওয়া এক বহুমাত্রিক আকাল।
আর এই সঙ্কটকে নিয়ন্ত্রণ করার বদলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির অগ্রাধিকার যদি ক্রমশ বৃহৎ পুঁজির স্বার্থের দিকে ঝুঁকে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের দুর্দশা আরও গভীর হয়। বাজারের ওঠানামা তখন শুধু অর্থনীতির পরিসংখ্যান থাকে না; তা সরাসরি মানুষের হাঁড়িতে, সংসারের খরচে, কর্মসংস্থানে এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে নিরাপত্তাবোধে আঘাত করে। এই কারণেই আজকের আকালকে শুধু খাদ্যের প্রশ্ন হিসাবে দেখলে তার প্রকৃত চরিত্র ধরা পড়বে না।
খাদ্যের সঙ্গে কাজের অধিকার
১৯৫৯ সালের খাদ্য আন্দোলনের শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। খাদ্যের প্রশ্ন কখনও শুধু খাদ্যের দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না।  খাদ্য বলতে কাজ, মজুরি, ক্রয়ক্ষমতা; কৃষকের জন্য জমি, উৎপাদন ও ন্যায্য দাম। অর্থাৎ ক্ষুধার বিরুদ্ধে লড়াই শেষ পর্যন্ত মানুষের মতো করে বাঁচার অধিকারের লড়াই।
এই কারণেই খাদ্য ও কাজের প্রশ্ন আলাদা নয়। কাজ না থাকলে আয় নেই, আয় না থাকলে জীবন চলে না। বাজারে খাদ্য থাকা সত্ত্বেও তা কেনার সামর্থ্য না থাকলে মানুষের ক্ষুধার নিবৃত্তি হয় না। দীর্ঘ সংগ্রামের ফলেই গ্রামীণ মানুষের কাজের দাবির একটি আইনি স্বীকৃতি এসেছিল মহাত্মা গান্ধী জাতীয় গ্রামীণ কর্মসংস্থান নিশ্চয়তা আইন—MGNREGA-তে। এই আইনের তাৎপর্য শুধু ১০০ দিনের কাজের মধ্যে ছিল না। এর মূল শক্তি ছিল—কাজ চাওয়ার অধিকার। কাজের আবেদন করলে সরকারকে তার ব্যবস্থা করার দায় নিতে হতো।
আজ সেই কাঠামো বদলে VB-GRAM G চালু হয়েছে। নতুন আইনে কর্মসংস্থানের গ্যারান্টি ১০০ থেকে বাড়িয়ে ১২৫ দিন করা হয়েছে। কিন্তু দিনের সংখ্যা বাড়লেই কাজের অধিকার শক্তিশালী হয় না। কেন্দ্র ও রাজ্যের অর্থের অংশীদারিত্ব এবং কেন্দ্রের নির্ধারিত অর্থবরাদ্দের সীমা নতুন ব্যবস্থা সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। ফলে  শুধু ১২৫ দিন নিয়ে আশঙ্কা নয়—মানুষ যখন কাজ চাইবে, তখন কাজ পাওয়ার নিশ্চয়তা কতটা থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর ভবিষ্যতের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতেই বিচার হবে। কিন্তু এখন মানুষের জানার প্রবল আগ্রহ—কেন দেশে-বিদেশে বহু প্রশংসিত রেগা বাতিল হলো? এই আইনে এমন কী ত্রুটি ছিল, যার জন্য নতুন আইন আনতে হলো? ১০০ দিনের পরিবর্তে ১২৫ দিন করতে হলে আইনের সংশোধনই যথেষ্ট ছিল। রেগা সীমিত পরিসরে হলেও কাজের অধিকারকে আইনি স্বীকৃতি দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ ছিল। নতুন আইনে সেই অধিকার কতটা ক্ষুণ্ণ হলো, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
তবুও একটি নীতিগত সত্য অটুট রয়েছে: কাজ কোনও দয়া নয়। শ্রমের বিনিময়ে মজুরি কোনও অনুদান নয়। মানুষের শ্রমের ন্যায্য মূল্য তার অধিকার।
এখানেই ভারতের গণতন্ত্রের একটি মৌলিক বৈপরীত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কাজ ছাড়া অর্থনৈতিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়; কাজ ছাড়া ব্যক্তির মর্যাদাও সুরক্ষিত হয় না। তাই কাজের অধিকার কেবল একটি শ্রমনীতি বা দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচির প্রশ্ন নয়; এটি সংবিধানের ঘোষিত আদর্শ বাস্তবায়নের প্রশ্ন।
সরকার বদলায়, প্রশ্ন থেকে যায়
পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটেছে। দেড় দশকের তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের পর ২০২৬ সালে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে। সরকার বদল গণতন্ত্রের স্বাভাবিক নিয়ম। মানুষ ভোট দিয়ে সরকার গড়বেন, আবার ভোট দিয়েই তাকে সরাবেন— এটাই গণতন্ত্র।
কিন্তু ৩১ আগস্টের ইতিহাস আমাদের আরও একটি প্রশ্ন করতে শেখায়—শাসকের দল বদলালেই কি শাসনের অভিমুখ বদলায়? এই প্রশ্ন কোনও একটি দলের বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়। এটি রাষ্ট্রক্ষমতার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের প্রশ্ন।
১৯৫৯ সালে ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্য চেয়েছিলেন। তাঁদের দাবি মেটানোর পরিবর্তে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রশক্তি ব্যবহার করে সেই আন্দোলন দমন করেছিল। পরবর্তী সময়ে পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে— কংগ্রেসের পর বামফ্রন্ট, বামফ্রন্টের পর তৃণমূল কংগ্রেস, এখন বিজেপি। রাজনৈতিক পতাকা বদলেছে, শাসকের ভাষা বদলেছে, অগ্রাধিকারের কথাও বদলেছে। কিন্তু মানুষের দাবি, প্রশ্ন ও প্রতিবাদের প্রতি রাষ্ট্রের মনোভাব কখন, কীভাবে, কতটা বদলেছে— সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।
এই প্রশ্নের আর একটি দিক হলো মানুষের অধিকারকে রাষ্ট্র কীভাবে দেখে। অধিকারকে যদি সরকারের অনুগ্রহ হিসাবে প্রচার করা হয়, তাহলে নাগরিকের অবস্থানও বদলে যায়। অধিকারসম্পন্ন মানুষ হয়ে ওঠেন কোনও প্রকল্পের প্রাপক। দাবি জানানোর পরিবর্তে তাঁকে কৃতজ্ঞ থাকতে বলা হয়। প্রশ্ন করার পরিবর্তে অপেক্ষা করতে বলা হয়। প্রতিবাদের পরিবর্তে প্রশ্নহীন আনুগত্য প্রত্যাশা করা হয়। শাসনের অভিমুখ বিচার করতে হলে তাই দেখতে হবে—মানুষ কি অধিকার নিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন? বিরোধিতা কি গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে স্বীকৃত হয়? প্রশাসন কি দলীয় আনুগত্যের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে কাজ করে? সরকার কি নাগরিককে অধিকার সম্পন্ন মানুষ হিসাবে দেখে, নাকি সুবিধাপ্রাপক বা উপভোক্তা হিসাবে? মোদ্দা কথা-সরকারের রং বদলালেই এই প্রশ্নগুলির উত্তর ইতিবাচক হয়ে যায় না।
মাথা উঁচু করে বাঁচার শিক্ষা
১৯৫৯-এর খাদ্য আন্দোলন কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছিল না। খাদ্যের দাবির সঙ্গে কাজ, মজুরি, জমি, রিলিফ ও কৃষকের অধিকারের প্রশ্ন ক্রমশ যুক্ত হয়েছিল। গ্রামবাংলার দরিদ্র মানুষের এই ধারাবাহিক সংগ্রাম শুধু তাঁদের তাৎক্ষণিক দাবি আদায়ের লড়াই ছিল না; এর মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল অধিকার সম্পর্কে সচেতন এক সামাজিক শক্তি। এই দীর্ঘ সংগ্রামেরই একটি রাজনৈতিক পরিণতি ছিল ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের প্রতিষ্ঠা।
পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এমন একটি সময়ও এসেছে যখন গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে শুধু সাহায্যপ্রার্থী হিসাবে দেখা হয়নি। ভূমি সংস্কার, বর্গাদারদের অধিকার নথিভুক্ত করা, খাস জমি বণ্টন, কাজের বিনিময়ে খাদ্য, মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন এবং পঞ্চায়েত ব্যবস্থার বিকাশ— এই উদ্যোগগুলির মধ্য দিয়ে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে উৎপাদন ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী হিসাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়েছিল।
এই নীতিগুলির গুরুত্ব শুধু কত একর জমি বণ্টিত হয়েছে, কতজন বর্গাদারের অধিকার নথিভুক্ত হয়েছে কিংবা প্রসারিত গণতন্ত্রের স্বাদ কত মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হলো—তার পরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ নয়। এর সবচেয়ে বড় তাৎপর্য ছিল মানুষের সামাজিক অবস্থান ও আত্মমর্যাদার পরিবর্তনে। একসময় যে মানুষ রিলিফের লাইনে অপেক্ষা করতেন, তিনিই যখন বলতে শুরু করলেন—“কাজ চাই, খেটে খাব; দয়া চাই না”—তখন সেটি শুধু একটি অর্থনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষণ ছিল না। এটি ছিল আত্মমর্যাদার উত্থান। মানুষ বুঝতে শিখেছিলেন, রাষ্ট্রের কাছে তাঁর দাবি আছে; তিনি শুধু সাহায্যের প্রার্থী নন।
কাজের অধিকার, জমির অধিকার, খাদ্যের অধিকার এবং স্থানীয় প্রশাসনে অংশগ্রহণ—এসব মানুষকে সরকারের করুণার উপর নির্ভরশীল না করে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করেছিল। পঞ্চায়েতের মাধ্যমে সাধারণ মানুষ উন্নয়ন ও প্রশাসনের কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছিলেন। অর্থাৎ নীতির অভিমুখ ছিল মানুষকে শাসিতের অবস্থান থেকে অংশগ্রহণকারীর অবস্থানে নিয়ে আসা। এই শিক্ষা আজও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গণতন্ত্রের শক্তি শুধু ভোটে নয়; অধিকার সম্পর্কে সচেতন, প্রশ্ন করতে সক্ষম এবং মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে এমন মানুষের মধ্যেই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি নিহিত। 
আজকের প্রশ্ন তাই শুধু কে সরকারে আছে, তা নয়। সরকার মানুষের জন্য কী করছে—তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ, সরকার মানুষকে কী হিসাবে দেখছে? অধিকার সম্পন্ন নাগরিক হিসাবে, না অনুগ্রহের প্রাপক হিসাবে?
লড়াইটা নীতি পরিবর্তনের জন্য
১৯৫৯-এর শহীদরা খাদ্যের দাবিতে লড়েছিলেন। তাঁরা জানতেন না ভবিষ্যতে সরকারের রং কতবার বদলাবে। কিন্তু তাঁরা জানতেন—ক্ষুধার্ত মানুষের মাথা নত করে বেঁচে থাকা কোনও সমাধান নয়। তাঁদের সংগ্রামের মধ্য দিয়ে একটি সত্য স্পষ্ট হয়েছিল— মানুষের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার মানুষেরও আছে; রাষ্ট্রের কাছে দাবি জানানো তার নাগরিক অধিকার।
আজকের প্রশ্নও সেখানেই। দেড়-দু’হাজার টাকার ভাতার বিনিময়ে নিজের প্রশ্ন করার অধিকার, নিজের পঞ্চায়েতে অংশগ্রহণের অধিকার, নিজের সন্তানের শিক্ষা, নিজের হকের মজুরি— এসব বন্ধক রাখা যায় কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। লড়াই ভাতার বিরুদ্ধে নয়; লড়াই ভাতাকে অধিকারের বিকল্প হিসাবে দেখানোর বিরুদ্ধে। অধিকারকে অনুগ্রহে বদলে দিয়ে, সেই অনুগ্রহের বিনিময়ে মানুষের আনুগত্য কেনার রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াই।
৩১ আগস্ট তাই শুধু অতীত স্মরণের দিন নয়। এটি মনে করিয়ে দেওয়ার দিন যে সরকার পরিবর্তন গণতন্ত্রের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু তার সার্থকতা তখনই, যখন মানুষের জীবন ও অধিকারকে ঘিরে রাষ্ট্রের নীতি ও আচরণেও পরিবর্তন আসে। আগের সরকারের সময়ে যে বৈষম্য, বঞ্চনা ও অনুগ্রহ নির্ভরতার প্রবণতা তৈরি হয়েছিল, নতুন সরকার এসে তার সবটাই বদলে দেবে— এমন নিশ্চয়তা এখনও দেখা যাচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে পুরানো প্রবণতাই নতুন রূপে ফিরে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তাই এবারের শহীদ দিবসে অঙ্গীকার হোক— ভিন্ন রূপে ফিরে আসা আকালের বিরুদ্ধে, অধিকারকে অনুগ্রহে পরিণত করার বিরুদ্ধে এবং প্রশ্নহীন আনুগত্যের রাজনীতির বিরুদ্ধে লড়াইকে আরও সংগঠিত করা। কারণ সরকার বদলানোই শেষ কথা নয়; মানুষের জীবন ও অধিকারের পক্ষে শাসনের অভিমুখ বদলানোই আসল দাবি।

Comments :0

Login to leave a comment