তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আত্মসহায়ক সুমিত রায়ের জিজ্ঞাসাবাদের সমস্ত নথি রাজ্য সরকারের কাছে চাইল সুপ্রিম কোর্ট। শালবনি জমি দখল মামলায় তদন্তকারীরা তাকে মূল অভিযোগ নিয়ে প্রায় কোনও প্রশ্নই করেননি সুমিত রায়ের এই দাবির পর সোমবার শীর্ষ আদালত জিজ্ঞাসাবাদের ট্রান্সক্রিপ্ট, অডিও ও ভিডিও রেকর্ড দেখতে চেয়েছে। একই সঙ্গে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর পরবর্তী শুনানি পর্যন্ত সুমিত রায়ের গ্রেপ্তারির ওপর সুরক্ষাও বহাল রেখেছে আদালত।
প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী এবং বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চে মামলাটির শুনানি হয়। কলকাতা হাই কোর্টের ৬ অগস্টের নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুমিত রায়ের করা আবেদনের ভিত্তিতেই শুনানি চলছিল। ওই মামলায় ৬ অগস্ট সুপ্রিম কোর্ট তার গ্রেপ্তারির ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছিল।
সুমিত রায়ের হয়ে সওয়াল করেন প্রবীণ আইনজীবী গোপাল শঙ্করনারায়ণন। তিনি জানান, পুরো জিজ্ঞাসাবাদই ভিডিও রেকর্ড করা হয়েছে এবং তার মক্কেল তদন্তকারীদের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এর আগে সুমিত রায় আত্মপক্ষ সমর্থনে প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকার করেছিলেন বলে যে বক্তব্য দেওয়া হয়েছিল, তা সংশোধন করে আইনজীবী জানান, অতিরিক্ত হলফনামায় স্পষ্ট করা হয়েছে যে সুমিত রায় আত্মদোষ স্বীকারের বিরুদ্ধে সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগ করেননি এবং তদন্তে সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেছেন।
তবে তদন্তকারীদের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ তোলেন তার আইনজীবী। তার দাবি, জমি দখলের অভিযোগের বদলে সুমিত রায়কে মূলত তার পরিবার, তৃণমূল কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাজকর্ম, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং দলের অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে।
আইনজীবীর দাবি, প্রতিদিন আট থেকে নয় ঘণ্টা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে সুমিত রায়কে। বিভিন্ন এফআইআর-এর জন্য তাকে পালা করে ডাকা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগ বলতে ১০ লক্ষ টাকার একটি লেনদেনের কথা বলা হলেও, ১১ দিন ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পরেও ওই নির্দিষ্ট লেনদেন নিয়ে তাকে একটি প্রশ্নও করা হয়নি বলে আদালতে দাবি করেন আইনজীবী।
তবে প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, মামলাটি শুধুমাত্র ১০ লক্ষ টাকার একটি লেনদেনে সীমাবদ্ধ নয়। তদন্তের আওতায় সরকারি বা ভেস্টেড জমি ব্যক্তিগত জমিতে রূপান্তরের বৃহত্তর অভিযোগ রয়েছে এবং সেখানে বিপুল অঙ্কের লেনদেনের বিষয়ও রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণ করেন তিনি।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের হয়ে সওয়াল করতে গিয়ে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা অবশ্য তদন্তকারীরা প্রাসঙ্গিক বিষয়ে প্রশ্ন করেননি এই দাবি খারিজ করেন। তিনি জিজ্ঞাসাবাদের নথির উল্লেখ করে জানান, সুমিত রায় তার ব্যক্তিগত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে নগদ টাকা জমা করেছিলেন কি না, সেই প্রশ্নও তাকে করা হয়েছিল।
তুষার মেহতার দাবি, পরবর্তী তদন্তে আরও কিছু নগদ জমার তথ্য পাওয়া গিয়েছে। তদন্তকারীদের সন্দেহ, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে যে অর্থের হদিস মিলেছে, তা কথিত দুর্নীতির সম্পূর্ণ অর্থের সামান্য অংশ মাত্র। তার কথায়, “এটি হিমশৈলের চূড়ামাত্র বলে মনে হচ্ছে।”
এরপরই বেঞ্চ জানতে চায়, ৬০ লক্ষ, ২০ লক্ষ এবং ৪০ লক্ষ টাকার মতো বিভিন্ন লেনদেন ও নগদ জমার উৎস নিয়ে সুমিত রায়কে নির্দিষ্টভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল কি না। প্রধান বিচারপতি জানতে চান, জিজ্ঞাসাবাদের ট্রান্সক্রিপ্টের পাশাপাশি অডিও ও ভিডিও রেকর্ড আদালতে দেওয়া সম্ভব কি না।
সলিসিটর জেনারেল জানান, তদন্তের যে সমস্ত নথি পুলিশের কাছে রয়েছে, তা আদালতের সামনে পেশ করা হবে এবং কোনও তথ্য গোপন করা হবে না।
শুনানিতে একটি রাজনৈতিক দলের অ্যাকাউন্ট থেকে একটি সংস্থার অ্যাকাউন্টে প্রায় ৩০ কোটি টাকা স্থানান্তরের অভিযোগও উঠে আসে। রাজ্য সরকারের দাবি, ওই সংস্থার বিরুদ্ধে অন্য কয়েকটি মামলাতেও তদন্ত চলছে।
এই প্রসঙ্গে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থাগুলির তদন্তের গতি ও পদ্ধতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। ওই সংস্থাকে ঘিরে বিভিন্ন মামলার তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টের একাধিক বিচারপতিও আগে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিলেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তবে সলিসিটর জেনারেল বলেন, অন্য তদন্তকারী সংস্থার তদন্তের গতি বা কার্যকলাপের কারণে রাজ্য পুলিশের নিজস্ব তদন্তে প্রাসঙ্গিক বলে মনে হওয়া লেনদেন খতিয়ে দেখার ক্ষেত্রে বাধা থাকা উচিত নয়।
অন্যদিকে, সুমিত রায়ের আইনজীবী ফের জোর দিয়ে বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের ভিডিও রেকর্ডই পুরো ঘটনার সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ। সেটি দেখলে আদালত নিজেই বুঝতে পারবে, তার মক্কেলকে আসল অভিযোগ নিয়ে আদৌ প্রশ্ন করা হয়েছিল কি না।
শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞাসাবাদের নথি খতিয়ে দেখার সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট। আগামী ৭ সেপ্টেম্বর মামলাটির পরবর্তী শুনানি হবে।
উল্লেখ্য, ৩ অগস্ট কলকাতা হাই কোর্ট কথিত সরকারি জমি জালিয়াতি ও দখলের মামলায় সুমিত রায়ের আগাম জামিনের আবেদন খারিজ করেছিল। মামলাটি প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ, জাল নথি তৈরি, জাল নথি ব্যবহারের পাশাপাশি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ধারায় দায়ের করা হয়েছে। পরে হাই কোর্টের সেই নির্দেশকে চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন সুমিত রায়।
Supreme Court
অভিষেকের আত্মসহায়ক সুমিত রায়ের জিজ্ঞাসাবাদের নথি চাইল সুপ্রিম কোর্ট, ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রেপ্তারি থেকে সুরক্ষা
×
Comments :0