ভয়াবহ বন্যার নেপথ্যে থাকা হিমবাহ ও পাহাড়ের বিশাল অংশ ধসে পড়ার মুহূর্ত ধরা পড়লো ড্রোন ক্যামেরায়। গত সপ্তাহে নেপাল ও তিব্বতে ভয়াবহ বন্যায় শত শত মানুষের মৃত্যুর পর প্রকাশ্যে এসেছে সেই ঘটনার চাঞ্চল্যকর ছবি।
চিনের এক ফটোগ্রাফারের ড্রোনে ধরা পড়া ফুটেজে দেখা যাচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৭,২০০ মিটারেরও বেশি উচ্চতায় অবস্থিত লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের কাছে পাহাড়ের ঢাল থেকে বিপুল পরিমাণ পাথর ও হিমবাহের বরফ ভেঙে নীচে নেমে আসছে। মুহূর্তের মধ্যে পাহাড়জুড়ে ধুলোর বিশাল মেঘ তৈরি হয়।
এরপর বরফ, পাথর, কাদা ও ধ্বংসাবশেষের সেই বিশাল স্রোত প্রায় ১,২০০ মিটার নীচের উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এর জেরেই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা বা ফ্ল্যাশ ফ্লাডের সৃষ্টি হয়। ফুলেফেঁপে ওঠে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী। গত ২৬ অগস্টের এই বিপর্যয়ে নেপালে ৯০৩ জন এবং তিব্বতে ১৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। এখনও নিখোঁজ ৪,৫০০-রও বেশি মানুষ, যাঁদের অধিকাংশই নেপালের বাসিন্দা।
নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ পরিস্থিতিকে ‘অকল্পনীয় ও হৃদয়বিদারক’ প্রাকৃতিক বিপর্যয় বলে বর্ণনা করেছেন। রবিবার রাতে সমাজমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে ভয়াবহ বন্যার কারণে প্রাণহানি, সম্পত্তি ও পরিকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণ হিসাব তৈরি করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রতিকূল আবহাওয়া, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা এবং এখনও চলতে থাকা বিপদের কারণে উদ্ধার ও ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণের কাজ ব্যাহত হচ্ছে বলেও জানান তিনি। তবে নাগরিকদের জীবন রক্ষায় প্রশাসন সর্বশক্তি দিয়ে কাজ করছে বলে জানিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী।
বিশেষজ্ঞদের কাছে এই ধরনের ঘটনা নতুন নয়। গত কয়েক বছরে হিমালয় এবং বিশ্বের অন্যান্য পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ, বরফ ও পাথরের ধস থেকে ভয়াবহ বন্যা ও ধ্বংসের একাধিক ঘটনা ঘটেছে।
২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডে রন্তি শৃঙ্গ থেকে প্রায় ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট পাথর ও বরফ নীচে নেমে এসেছিল। এর প্রায় ৮০ শতাংশ ছিল পাথর এবং ২০ শতাংশ বরফ। সেই ঘটনায় একটি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হয় এবং প্রায় ২০০ জনের মৃত্যু বা নিখোঁজ হওয়ার খবর পাওয়া যায়।
২০২৩ সালে সিকিমে দক্ষিণ লোনাক হ্রদের কাছে পারমাফ্রস্ট বা চিরস্থায়ী জমাট মাটি গলে পাহাড়ের একটি অংশ ধসে পড়ে। এর ফলে হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ জলস্রোত নীচে নেমে আসে। কয়েকশো কোটি গ্যালন জল পাহাড় বেয়ে নেমে গিয়ে একাধিক বাঁধ, ২৫ হাজারেরও বেশি বাড়ি ও ৩০টির বেশি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এরপর ২০২৫ সালে সুইস আল্পসে বার্চ হিমবাহ থেকে প্রায় ৩৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট পাথর ও বরফ ধসে পড়ে। বরফ-পাথরের সেই ধসের নীচে চাপা পড়ে যায় ব্ল্যাটেন গ্রামের অধিকাংশ অংশ।
ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন, হিমবাহ গলে যাওয়া এবং পার্বত্য অঞ্চলের ভূপ্রকৃতির পরিবর্তনের ফলে এই ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে কি না, তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের ড্রোন ফুটেজ সেই আশঙ্কাকেই আরও একবার সামনে নিয়ে এলো।
Nepal Flash Flood
ড্রোনে ধরা পড়লো হিমবাহ ধসের ভয়াবহ মুহূর্ত
×
Comments :0