Imperialism

সাম্রাজ্য বিস্তারের অবিরাম যুদ্ধ

সম্পাদকীয় বিভাগ

দেবাশিস চক্রবর্তী 
রবিবার ইরানের বন্দর আব্বাস উপকূলের কাছে লারাক দ্বীপে ফের বোমাবর্ষণ করেছে মার্কিন সেনাবাহিনী। একমাস পরে আবার ইরানে সরাসরি বোমাবর্ষণ। ইরান সঙ্গে সঙ্গেই জর্ডনে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ফেলে তার জবাব দিয়েছে। অর্থাৎ, যুদ্ধ চলছেই। ছ’মাস হয়ে গেল ইরানের সঙ্গে আমেরিকা-ইজরায়েলের এই যুদ্ধ চলছে। ইতিমধ্যেই এই যুদ্ধের সাধারণ ছক সকলের জানা হয়ে গিয়েছে। ইজরায়েল-ইরান প্রত্যক্ষ সংঘাতে ইরান ইজরায়েলের বহু শহরে, সামরিক ঘাঁটিতে, বন্দরে গুরুতর প্রত্যাঘাত করেছে। বস্তুত ইজরায়েলকে মাটিতে শুইয়ে দিয়েছে। আমেরিকার ভূখণ্ডে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র পৌঁছাবে না, কিন্তু পশ্চিম এশিয়ায় দেশে দেশে মার্কিন সেনাঘাঁটিতে ইরান আক্রমণ করেছে। জর্ডন, কাতার, ওমান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমীরশাহী কেউ বাদ যায়নি। বার্তা স্পষ্ট: মার্কিন সেনাঘাঁটি হটাও, অন্যথায় কেউ নিশ্চিন্তে থাকবে না। 
এখান থেকেই যদি তাকানো যায়, তাহলে দুনিয়াজুড়ে মার্কিন সাম্রাজ্য স্থাপনের কাঠামো বোঝা যেতে পারে। বিশ্বের ৮০টি দেশে আমেরিকার ৭৫০ থেকে ৮০০ সেনা ঘাঁটি রয়েছে। কোনও কোনও হিসাবে এই সংখ্যা ৯০০-র কাছাকাছি। কোনও সর্বসম্মত সংখ্যা নেই। তার একটি বড় কারণ আমেরিকার গোপন সেনা ঘাঁটি এবং পরিভাষায় ‘ব্ল্যাক সাইট’- যেখানে ঠিক কী হচ্ছে, তা জানা নেই। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের হিসাব, ২০০১ থেকে ২০২৪-এ মার্কিন সামরিক ব্যয় ২১ লক্ষ কোটি ডলার। খরচের ক্রমতালিকায় পরবর্তী ১৮টি দেশের মোট ব্যয়ের থেকে বেশি। ২০২৫সালে বিশ্বের মোট সামরিক ব্যয়ের ৩৩ শতাংশ শুধু আমেরিকার। ২০২৬-এও মার্কিন সামরিক বরাদ্দ ১ লক্ষ কোটি ডলারের বেশি। তার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে আরও প্রায় ১ লক্ষ কোটি ডলার, যা পেন্টাগন চেয়েছে। 
আরও আছে: আমেরিকায় এমন অনেক প্রকল্প আছে, যা আসলে সামরিক প্রকল্প কিন্তু হাজারটা অন্য নামের আড়ালে। সব মিলিয়ে এই যে বিপুল অঙ্ক, তার কিন্তু কোনও হিসাব নেই। ৮ বছর ধরে পেন্টাগনের কোনও অডিট হয়নি। এক অন্ধকার রাষ্ট্র শক্তি ‘বিশ্ব সাম্রাজ্য’ গঠনের লক্ষ্য নিয়ে শুধু দুনিয়ার অন্য দেশে লুট চালাচ্ছে না, নিজের দেশের নাগরিকদের কল্পনারও অতীত এক শোষণের ফাঁদে বেঁধে রেখেছে। 
এখন যে ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাত হচ্ছে, তাদের মোট সামরিক বাজেট আমেরিকার সামরিক বাজেটের ২শতাংশ, মোট ৭৫০ কোটি ডলার। আমেরিকা এ যাবৎ ৭৬ লক্ষ টন বোমা ফেলেছে ইরানে। তবু, ইরান যুদ্ধে এখনও পর্যন্ত আমেরিকা হারছে। ইজরায়েলকে সঙ্গে নিয়েও হারছে। কেন হারছে, তার সামরিক ব্যাখ্যা রয়েছে নানারকম। ইরানের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ভেদ করতে আমেরিকা সক্ষম হয়নি। ইতিমধ্যে যে ক’বার চেষ্টা করছে প্রায় প্রত্যেকবারই অত্যন্ত ব্যয়বহল কিছু বোমারু বিমানকে ওখানের মাটিতে ফেলে আসতে হয়েছে, ক্ষেপণাস্ত্র হানাও মসৃণ হচ্ছে না। 
তার থেকেও অনেক বড় কথা, এই যুদ্ধ আমেরিকা লড়ছে কেন। তেল নিশ্চয়ই একটা বড় কারণ। মধ্য প্রাচ্যের তেলের ওপরে পশ্চিমী বহুজাতিকদের নিয়ন্ত্রণ প্রায় সম্পূর্ণ। ব্যতিক্রম ইরান। উপরন্তু ইরান ও ওমান হরমুজ প্রণালীর বৈধ অধিকারী, যেখান দিয়ে বিশ্বের তেল সরবরাহের বড় অংশই যাতায়াত করে। ইরান এই যুদ্ধের সময়েও হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় শেষ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হয়েছিল পশ্চিমী দেশগুলিকে। ইরান সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, শুধু ডলারের মাধ্যমে তেল কেনাবেচা বন্ধ করে দেবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পেট্রো-ডলারের দাপট মার্কিন অর্থনীতির রমরমার অন্যতম উৎস। এই কাঠামো ভেঙে পড়লে আমেরিকার টালমাটাল অর্থনীতির বড় বিপদ ঘনিয়ে আসবে। রাজনৈতিক কারণ দেখলে বোঝা যায় ইজরায়েলকে সামনে রেখে পশ্চিম এশিয়ায় ভূ-রাজনৈতিক ভারসাম্য যে অভিমুখে নিয়ে যেতে চাইছিল আমেরিকা, তার পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা ইরান। প্যালেস্তাইনকে প্রায় ধ্বংস করা গেছে, সিরিয়ায় শাসন পরিবর্তন করে তাঁবে আনা গেছে, লেবাননে টানা ইজরায়েলী আক্রমণ চলছে। আরব দুনিয়ার অনেক রাষ্ট্রই মার্কিন রণনীতির অংশ। ইজরায়েলকে মান্যতা দিয়ে তথাকথিত আব্রাহাম চুক্তির খসড়া তৈরি হয়ে গেলেও বারংবার তা আটকে যাচ্ছে। ইরানে গণতন্ত্রের প্রশ্নকে সামনে এনে রাংতার মোড়ক লাগানো হয়েছে, ইরানের হাতে পরমাণু অস্ত্রের সমৃদ্ধকরণের উপকরণ মজুত রয়েছে এই কাহিনিও ফেঁসে গেছে। ইরানের একমাত্র অপরাধ তারা মার্কিন তাঁবে নেই, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কক্ষপথে ঘুরতে তারা রাজি নয়। এই ঔদ্ধত্যই মার্কিন সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পথে বড় অন্তরায়। 
ভেনেজুয়েলা 
ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রপতি নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করা হয়েছিল ৩ জানুয়ারি। রাষ্ট্রপতি প্রাসাদে মার্কিন সেনারা ঢুকে তাঁকে অপহরণ করে আমেরিকায় নিয়ে আসে। মাদুরো লাতিন আমেরিকায় মার্কিন দখলদারির পথে অন্তরায় ছিলেন। ভেনেজুয়েলার অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ডেলসি রডরিগুয়েজ প্রতিরোধের পথে যাননি। ভেনেজুয়েলার সেই ক্ষমতা নেই বা রাজনৈতিক অবস্থানে দৃঢ় থাকার অভাব ছিল। মাদুরোকে অপহরণের এক সপ্তাহের মাথায় মার্কিন রাষ্ট্রপতি বলতে থাকেন, ভেনেজুয়েলার তেলের খনি আমেরিকার নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির বদলে সেখানে বেসরকারি সংস্থা তেল কেনাবেচা করবে, নতুন খনিও খুলবে। তা ধীরে ধীরে শুরুও হয়ে যায়। শেভ্রন, শেল, রেপসোল, ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ফের ভেনেজুয়েলায় তেল উত্তোলন ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুরু করে। ব্যবস্থাটি অদ্ভুত। ভেনেজুয়েলার তেল আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রি হচ্ছে অথচ তার রাজস্বের সামান্য অংশ সে দেশের সরকারি তহবিলে ঢুকছে। মার্কিন কোষাগারে সেই তেলের রাজস্ব সঞ্চয় হচ্ছে। অবশেষে ৩০ আগস্ট তা একটি সরকারি সিলমোহর পেয়েছে। ট্রাম্প এবং রডরিগুয়েজ জানিয়েছেন, ভেনেজুয়েলার ৬৫০০ কোটি ব্যারেল তেলের সঞ্চয় নিয়ে একটি চুক্তি হয়েছে। ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী এই তেলের সঞ্চয়ের সংখ্যাগরিষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ আমেরিকার হাতে এসে গেছে। মার্কিন সরকার ও বেসরকারি কোম্পানি এই তেল তুলবে এবং বিক্রি করবে। মার্কিন স্ট্র্যাটেজিক তেলের ভাণ্ডার এতে ভরে উঠবে। ট্রাম্পের ভাষায়, ‘ভেনেজুয়েলার জনগণ আমেরিকাকে এই তেল উপহার দিয়েছে।’ মার্কিন ভাষ্য অনুযায়ী ১০০ বছরের লিজ পাচ্ছে এই বেসরকারি কোম্পানি, রডরিগুয়েজ বলেছেন ২৫ বছরের। এমনকি ফাইনান্সিয়াল টাইমস এই ব্যবস্থাকে ‘প্রায় নয়া উপনিবেশবাদী’ বলে চিহ্নিত করেছে। 
কিউবা
এখন লক্ষ্য কিউবা। টানা মার্কিনী নিষেধাজ্ঞার কবলে থাকা কিউবাকে বহু প্রতিকূল অবস্থার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশ নেওয়া দুস্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিউবার মধ্যে সন্ত্রাসবাদী গোষ্ঠীকে পাঠানো হয়েছে অন্তর্ঘাতের জন্য। অর্থনীতিতে কঠিন অবস্থার মোকাবিলা করতে হলেও কিউবা মানবসম্পদের উন্নতিতে দুনিয়ার নজর কেড়েছে। সম্প্রতি কিউবা অর্থনীতিতে সংস্কারের পদক্ষেপ নিয়েছে। ১৭৬টি ক্ষেত্রে সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বলা যায়, নজিরবিহীন পদক্ষেপ। কিন্তু কিউবার বিরুদ্ধে অভিযানের সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন প্রশাসন। চলতি বছরের মে মাসে মার্কিন রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক নির্দেশে কিউবাকে ‘জাতীয় নিরাপত্তার পক্ষে বিপদ’ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। সন্ত্রাসবাদকে রাষ্ট্রীয় মদত দেবার তালিকায় কিউবাকে পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। কিউবায় অন্তর্ঘাত, সাইবার আক্রমণ ও বিশেষ অভিযান চালানোর জন্য বিশেষ টাস্ক ফোর্স তৈরি করা হয়েছে। এই আগস্টেই কিউবার ৯টি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ও মন্ত্রককে নিষেধাজ্ঞার কবলে আনা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কিউবার নির্মাণ মন্ত্রক। কিউবার খনিজ পদার্থ উত্তোলনের রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। কিউবায় জ্বালানি সরবরাহের ক্ষেত্রে ‘কোয়ারাইন্টাইন’ জারি করা হয়েছে যাতে তৃতীয় কোনও দেশ কিউবায় তা না পাঠাতে পারে। এর জন্য কিউবাকে ঘিরে সমুদ্রে ঘেরাটোপ তৈরি করা হয়েছে। এর ফলে ইতিমধ্যেই কিউবায় বিদ্যুতের সঙ্কট, হাসপাতালে এমনকি জেনারেটর চালানোর সঙ্কট এবং খাদ্য সঙ্কট তৈরি হয়েছে। কিউবার অর্থনীতিকে ভেঙে দেবার জন্য পরিকল্পিত নীতি নিয়ে চলছে ওয়াশিংটন। 
লক্ষণীয়ভাবে, ঠিক এই সময়েই ট্রাম্প প্রশাসন ফের ‘কমিউনিজমের বিরুদ্ধে’ যুদ্ধ ঘোষণার আওয়াজ তুলেছেন। আমেরিকার অভ্যন্তরে ট্রাম্পের নীতির বিরোধী শক্তিকে ‘কমিউনিস্ট’ বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিউ ইয়র্কের মেয়রকে ট্রাম্প প্রায়ই কমিউনিস্ট বলে চিহ্নিত করেন। অতি দক্ষিণপন্থা মার্কিন প্রশাসনের দখল নিয়েছে। তাদের মতাদর্শগত হাতিয়ার হিসাবেই এই কমিউনিজমের ভূতকে ফের ডেকে আনা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে সাম্রাজ্যবাদী অভিযানের মধ্যেই আমেরিকার মধ্যে ফ্যাসিবাদের নির্মাণের অভিযান চলছে। 
কিন্তু ইতিহাস সরলরেখায় চলে না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে এত সামরিক শক্তি নিয়েও আমেরিকা গ্রেনাদা, পানামা, কুয়েত ছাড়া কোনও যুদ্ধে শেষ পর্যন্ত জেতেনি। ১৯৫০-র কোরিয়া যুদ্ধ থেকে ভিয়েতনাম, লিবিয়া আফগানিস্তান ইরাক হয়ে আজকের ইরান— মার্কিন দখলদারি শেষ পর্যন্ত পরাস্ত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ বারবার আক্রমণ করবে কিন্তু বারবার হারবে।

Comments :0

Login to leave a comment