এক মাসের মধ্যেই বক্সার জঙ্গলে বাঘ আনার পরিকল্পনা। তার আগে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এরিয়া থেকে জয়ন্তীর বনবস্তিগুলি সরিয়ে পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে প্রশাসন। জঙ্গলের বাসিন্দাদের নতুন ঠিকানা হতে চলেছে কালচিনি ব্লকের বনছায়া সংলগ্ন হরিপুর এলাকা। প্রতিটি পরিবারকে ১৫ লক্ষ টাকা এবং ৮ ডেসিমেল জমি দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু নতুন পুনর্বাসন পরিকল্পনার আগেই বনছায়ায় দু’বছর আগে স্থানান্তরিত পরিবারগুলির অভিজ্ঞতা প্রশাসনের সামনে বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছে।
২০২৪ সালের মার্চ মাসে বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের কোর এলাকা থেকে গাঙ্গুটিয়া ও ভুটিয়া বস্তির পরিবারগুলিকে বনছায়ায় পুনর্বাসন দেওয়া হয়েছিল। পথঘাট, বিদ্যুৎ ও পানীয় জলের কিছু ব্যবস্থা হলেও দু’বছর পেরিয়ে আজও সেখানে গড়ে ওঠেনি অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয় কিংবা স্থায়ী স্বাস্থ্য পরিষেবা কেন্দ্র। শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন বনছায়ার বাসিন্দারা।
স্থানান্তরিত এক বাসিন্দার আক্ষেপ, ‘‘আমরা ভুল করেছি। টাকা পেলেও এখন আর কিছু অবশিষ্ট নেই। আগে জঙ্গলের আশপাশে কাজ পাওয়া যেত, এখন পরিবারের সদস্যদের কাজের খোঁজে বাইরে যেতে হচ্ছে।’’ কয়েকটি পরিবারকে হোম-স্টে চালানোর অনুমতি দেওয়া হলেও পর্যটকের অভাবে সেই ব্যবসাও পর্যাপ্ত আয়ের পথ হয়ে উঠতে পারেনি।
এবার জয়ন্তীর বাসিন্দাদের পুনর্বাসনের প্রক্রিয়া শুরু হতেই নিজেদের অধিকার আদায়ে একজোট হয়েছেন গাঙ্গুটিয়ার ৬৬টি ও ভুটিয়া বস্তির ১৭টি পরিবার। তাঁরা অভিযোগ করে বলেন, তাদের যেসব সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অনেক কিছুই এখনও প্রদান করা হয়নি। রাস্তাঘাট, বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করা হলেও, ওই এলাকায় এখনও কোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। স্থানীয় বাসিন্দারা তাঁদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। তাঁরা বিডিওর কাছে দাবিপত্র জমা দিয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন- প্রতিশ্রুতি নয়, এবার চাই বাস্তব পরিষেবা। বনছায়ার বাসিন্দা সরস্বতী ছেত্রির প্রশ্ন, ‘‘জঙ্গলের জীবন ছেড়ে সমাজের মূল স্রোতে ফিরে কী লাভ হলো আমাদের?’’ আরেক বাসিন্দা মনি লামা সংবাদ মাধ্যমের সামনে বলেন, আমরা দুই বছর ধরে চুপ করে আছি। আমাদের মৌলিক সুযোগ-সুবিধার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু এখনও কোনো স্কুল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র গড়ে ওঠেনি। জয়ন্তীর বাসিন্দাদেরও এখন এখানে সরিয়ে আনা হচ্ছে, অথচ এখানে একটা স্কুলও নেই।’’ আরেক বাসিন্দা সরস্বতী ছেত্রী জানান, নিকটতম অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অন্তত ১২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। তিনি প্রশ্ন তোলেন, ‘‘আমাদের শিশুরা কি শিক্ষার সুযোগ পাবে না? আমরা কি স্বাস্থ্যসেবা পাব না?’’
বক্সায় বাঘ ফেরানো নিঃসন্দেহে পরিবেশ ও বন সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—বাঘের জন্য জঙ্গল প্রস্তুত করার আগে, জঙ্গল ছেড়ে আসা মানুষগুলির জীবন কি প্রস্তুত করা হয়েছে? পুনর্বাসন শুধু টাকা ও জমির হিসাব নয়; শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও মর্যাদার নিশ্চয়তাও তার অবিচ্ছেদ্য অংশ। সেই নিশ্চয়তা না থাকলে উন্নয়নের এই পরিকল্পনা বনবাসীদের কাছে নতুন জীবনের স্বপ্ন নয়, হয়ে উঠতে পারে নতুন অনিশ্চয়তার গল্প।
Comments :0