NATUNPATA | BOOKTOPIC | PULIN BIHARI DAS | SHYAMAL CHAKRABORTY | 31 AUGUST 2026 | 4th YEAR

নতুনপাতা | বইকথা | আদর্শায়িত জীবনের অবশ্যপাঠ্য দলিল | শ্যামল চক্রবর্তী | ৩১ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

NATUNPATA  BOOKTOPIC  PULIN BIHARI DAS  SHYAMAL CHAKRABORTY  31 AUGUST 2026  4th YEAR

নতুনপাতা

বইকথা

আদর্শায়িত জীবনের অবশ্যপাঠ্য দলিল

শ্যামল চক্রবর্তী
৩১ আগস্ট ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
 

বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার লোনসিং গ্রামে জন্ম এমন দু’জন সুপরিচিত ব্যক্তিত্বের নাম পুলিন বিহারী দাস ও গোপালচন্দ্র ভট্টাচার্য। গোপালচন্দ্র প্রকৃতিবিজ্ঞানী। একজন উচ্চমানের বিজ্ঞান সাহিত্যিক। দীর্ঘকাল ‘জ্ঞান ও বিজ্ঞান’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন। প্রকৃতিবিজ্ঞানে আগ্রহী বহু মানুষ তাঁর লেকা ‘বাংলার কীটপতঙ্গ’ বইটি পড়েছেন। অন্যদিকে গোপালচন্দ্রে চেয়ে মাত্র একবছরের বড় ছিলেন পুলিন বিহারী দাস। ফরিদপুর জিলা স্কুল ও ঢাকা কলেজের ছাত্র পুলিন বিহারী ঢাকায় বিধ্যাত লাঠিয়ালের কাছে লাঠি ও তরবারি খেলা শেখেন। ঢাকায় অনুশীন সমিতি গড়ে তুলছেন তিনি। ১৯০৮ সালে সমিতি বেআইনি ঘোষিত হওয়ার সময় তাঁর অধীনে প্রায় ৬০০ শাখা ছিল। ১৯১২ সালে সাত বছরের কারাদণ্ড দিয়ে তাঁকে আন্দামান জেলে পাঠানো হয়। ১৯২০ সালে মুক্তিলাভের পর গান্ধীজীর অহিংস পদ্ধতির বিরোধিতা করে সশস্ত্র বিপ্লের আদর্শে দীক্ষিত হয়ে ‘ভারতসেবক সঙ্ঘ’ তৈরি করেন। ১৯২২ সালে তিনি এই সাংগঠনিক কাঠামো ভেঙে দিয়ে বঙ্গীয় ব্যায়াম সমিতি ও নানা শরীরচর্চার কেন্দ্রে লাঠি ও ছোরা খেলার প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন। উত্তর কলিকাতার বিদ্যাসাগর স্ট্রিটে ১৯২৫ সালে তিনি বঙ্গীয় ব্যয়াম সমিতি গড়েছেন। সময়ের বিচারে শতবর্ষ হতে চললেও আজ আর তার কোনও চিহ্ন নেই। তাঁর প্রতিষ্ঠানের কথা দূরে থাকুক, জীবনকথাও কি বাংলার জীবনচর্চায় আলোচিত হয়? স্বাধীনতা সংগ্রামী নলিনীকিশোর গুহ লিখেছেন, ‘পুলিনবাবুর মন্ত্রগুপ্তি সাধনা এবং উহার প্রতিপালনের ব্যবস্থা ছিল অনেকটা আদর্শস্থানীয়। সমিতির কর্মীরাও সেইভাবে গড়ে ওঠেন।’ এমন মানুষ পুলিনবিহারী প্রাথমিক অনাগ্রহ সত্ত্বেও অনুজ সহযোদ্ধাদের অনুরোধে উপরোধে একটি আত্মজীবনী রচনা করেন। সেই আত্মজীবনী ১৯৮৭ সালে প্রথম প্রকশিত হয়েছিল। ২০২৩ সালে নতুন ও পরিপাটি চেহারায় তা আবার পুনঃপ্রকাশিত হয়। এই আত্মকথার ‘ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ’ করেছিলেন বিশিষ্ট ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে। এটি সংযোজনের ফলে বইয়ের নানা ঘটনাবলী হৃদয়ঙ্গম করা পাঠক বন্ধুদের পক্ষে সহজসাধ্য হবে। পুলিনবিহারীর দু’জন নিকট আত্মীয় বইটি সম্পাদনা করেছেন। সেখানে ও আত্মজীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে, চার্লস টেগার্ড পুলিনবিহারীর মতো একজন অস্ত্রশিক্ষায় প্রশিক্ষিত মানুষকে পুলিশের চাকরি দিতে চেয়েছিলেন যা তিনি প্রত্যাখ্যান করেছেন। পুলিনবিহারী লিখেছেন, ‘আবেগ ও উচ্ছ্বাসের বশে প্রাণ ত্যাগ করাতে বিশেষ কোনও ইষ্টসাধন হয় না।’ তিনি আরও লেখেন, ‘বারিন, সাভারকার, উপেন ও হেম দাস প্রত্যেকেই ভিন্নভিন্ন ভাবে ভাবিত যে বুদ্ধিটা  বক্তিগতভাবে কেবলমাত্র তাহারই একচেটিয় এবং যে তাহা মানিবে না, সে নিতান্তই মূর্খ।’ হতে  পারে, এদের পরস্পরবিরোধী চিন্তাধার স্বাধীনতার কর্মপন্থা বিষয়ে তাঁকে নিরুৎসাহিত করেছে ও তিনি দেশের এক স্বাস্থ্যোজ্জ্বল সম্পদ গড়ার কাজে নিজের সময় ব্যয় করেছেন। বড় জমিদারির উত্তরসূরী ছিলেন পুলিনবহারী। বাড়িতে যে উচ্চবিদ্যালয় ছিল তার প্রধান শিক্ষক ছিলেন দ্বারকনাথ গঙ্গোপাধ্যায়। পুলিনবিহারী তাঁর জমিদারীর আয় দশের স্বাধীনতা আর বিপ্লবীদের লালন-পালনে ব্যয় করতেন। ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেট এইচ এল সালকেল্‌ড লিখেছেন, বিপ্লবী ক্ষুদিরামের বোমা নিক্ষেপের দু’বছর আগে পুলিনবিহারী বোমা তৈরি করেছেন। বোমা তৈরিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। ঐতিহাসিক অমলেন্দু দে তাঁর ‘ঐতিহাসিক বিশ্লষণ’ নামাঙ্কিত নিবন্ধে জানিয়েছেন, পুলিনবিহারীর রাজনৈতিক জীবন চৌদ্দ বছর (১৯০৬—১৯২০)। এই সময়কেও তিনি তিন ভাগে ভাগ করে ১৯০৬—১৯১০ সালকে ‘সক্রিয়’ রাজনৈতিক জীবন বলেছেন। এই সময়কালে অবিশ্যি চৌদ্দ মাস তাঁকে কারাবন্দি থাকতে হয়েছে। গবেষক ও অধ্যাপক অমলেন্দু দে আরও জানান আমাদের, ১৯৩৯ সালে পুলিনবিহারী হিন্দু মহাসভাতে যোগ দিলেও ধীর ধীরে এদের কর্মকাণ্ড দেখে বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়েন। ওয়ার্কার্স পার্টির প্রবীণ নেতা সমর বসুকে উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, ‘ জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যখন তিনি মার্কসবাদের প্রতি আগ্রহ প্রদর্শন করেন তখনই তাঁর জীবনাবসান ঘটল। ’ ঢাকা অনুশীলন সমিতিকে শুধু উচ্চবর্ণের সদস্য ছিল না, তথাকথিত  নিম্নবর্ণের অনেকেও সদস্য হয়েছেন। পুলিনবিহারী মানতেন, ‘মুসলমানদের মধ্যেও অনেক সৎ ও স্বদেশি লোক রহিয়াছে’ তবু লর্ড কার্জনের সঙ্গে ঢাকার নবাবের দহরম-মহরম দেখে মুসলমান সদস্যভুক্তিতে আগ্রহ দেখাতেন না। অমলেন্দুবাবু স্পষ্টভাবে আমাদের জানিয়েছেন যে কোনও অবস্থাতেই ঢাকার অনুশীলন সমিতি ‘মুসলিম বিরোধী সমিতি’ ছিল না। অনুশীলন সমতির নেতা প্রতুলচন্দ্র গাঙ্গুলি তাঁর ‘ বিপ্লবীর জীবন দর্শন’ বইয়ে লিখেছেন, ‘মুসলমানদের সঙ্গে দাঙ্গা বা শত্রুতা করা আমদের উদ্দেশ্য নয়। হিন্দু-মুসলমান উভয়েরই মাতৃভূমি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে লিপ্ত আমরা এবং সাম্প্রদায়িকতা থেকে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত।’  বিপ্লবী সতীশ পাকড়াশী লিখেছেন, গণসংগঠনের কোনও মূল্য তিনি দিতেন না। ... তবে অহিংস সংগ্রাম নীতির কাছে তিনি মাথা নোয়ান নাই।’ ১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট পুলিনবিহারী ‘বঙ্গীয় ব্যায়াম সমিতি’র প্রাঙ্গণে রক্ত পতাকা তুলেছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির পতাকা ছিল না। পুরোপুরি রক্ত পতাকা। পতাকা তুলে তিনি বলেছিলেন, ‘আজ আমার দেশ, আমার জন্মভূমি, আমার ভারতমাতা ক্ষত বিক্ষত, দ্বিখণ্ডিত এবং রক্তাক্ত কলেবর! কোন দেশ প্রেমিকেরই তা কাম্য হতে পরে না। তাই, খণ্ডিত ও রক্তাক্ত মাতৃভূমির যথার্থ স্বাধীনতা না আসা পর্যন্ত এই রক্ত পতাকা উড্ডীন থাকবে।’
২০২২ সালের নভেম্বর মাসে প্রখ্যাত সাংবাদিক পি সাইনাথের সম্পাদনায় বেরিয়েছে জীবিত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সাক্ষাৎকার ভিত্তিক একটি বই। সেখানে উল্লিখিত হচ্ছে, স্বাধীনতা সংগ্রামীরা শুধু ‘ইনডিপেনডেন্স’ বা ‘স্বাধীনতা’ চাননি। তাঁরা চেয়েছিলেন ‘ইনডিপেনডেন্স’ ও ‘ফ্রিডম’। নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থেকে বৈদেশিক শক্তিকে তাড়িয়ে প্রশাসনিক ক্ষমতা দখলের নাম ‘ইনডিপেনডেন্স’। ‘ফ্রিডম’  তার চেয়ে অনেকদূর বেশি বিস্তৃত। ‘ফ্রিডম’ থাকলে প্রতিটি মানুষের স্বাধীনতা থাকে নিজের কথা বলার, মুক্ত চিন্তা প্রকাশ করার, মর্যাদা নিয়ে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা থাকে সেখানে। তাই আক্ষেপ করেছেন, আমাদের ‘ইনডিপেনডেন্স’ এসেছে, ‘ফ্রিডম’ আসেনি। সমকালের ভারত এমন দৃশ্যেরই প্রতিনিধিত্ব করছে। দীর্ঘ একবছর ধরে পুলিনবিহারী এই জীবনচরিত লিখেছেন। শুরুতে প্রত্যাশা মতোই জন্ম, বংশ পরিচয় ও শিক্ষা জীবন রয়েছে। তারপর নানা আন্দোলন ও অনুশীলন সমিতিতে যোগদানের কথা এ‘সেছে এসেছে নানা কর্মকাণ্ডের কথা। ‘স্যার জগদীশ’ নামে একটি পরিচ্ছেদ রয়েছে সেখানে পুলিনবিহারী অনুশীলন সমিতি বিষয়ে বিজ্ঞানীর দুর্বলতার কথা লিখেছেন। একই লেখায় তিনি লেখেন, ‘আমারই অনুমোদনে আমার পুরোহিত বংশীয় শ্রীমান গোপাল ভট্টাচার্যকে  স্যার জগদীশ বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরে কর্মীভাবে নিযুক্ত করিয়াছিলেন। পরিশেষে গোপাল স্যার জগদীশের অত্যন্ত প্রিয়পাত্র হইয়াছিল; বর্তমানে গোপাল বসু-বিজ্ঞান-মন্দিরে একজন শ্রেষ্ঠ প্রতিভাশালী কৃতী কর্মী। গোপালের গবেষণাপূর্ণ বহু প্রবন্ধ ইংলন্ডের বিজ্ঞান সম্পর্কিত বিভিন্ন পত্রিকাদিতে বিভিন্ন সময়ে প্রকাশিত হইয়া থাকে।’ আলোচনার শুরুতে আমরা এই গোপালচন্দ্রের কথাই বলেছি। 
বসু বিজ্ঞান মন্দিরের গবেষক-ছাত্র ও কর্মীদের লাঠি ও ছোরা খেলা শেখাতেন পুলিনবিহারী। এমনকি লেডি অবলা বসু বাহ্ম বালিকা বিদ্যালয়, বিদ্যাসাগর বাণীভবন ও মহিলাদের ‘দীপালী সমিতি’তে তাঁকে শিক্ষক হিসাবে রেখেছিলেন।  লেডি বসুর সহকারী একজন অস্ট্রো-জার্মান মহিলা বেতন দিয়ে লাঠি ছোরা খোলা শিখবেন। এই জীবনকাহিনির একটা বড় আকর্ষণ, কয়েকটি জায়গায় অনুশীলন সমিতির ছেলেদের ডাকাতির বর্ণনা রয়েছে। রয়েছে বিচারালয়ের বিবরণ। রবীন্দ্রনাথ ও মিস্টার এল্‌ম্‌হার্স্টে’র সঙ্গে কথোপকথনের পরিচয় রয়েছে। বইটিতে একগুচ্ছ আলোকচিত্র সংযোজিত হয়েছে। নির্ঘণ্ট থাকার ফলে প্রায় পাঁচশো পৃষ্ঠার বইয়ে আগ্রহের  বিষয় কম সময়ে দেখা যাবে। বইটির মলাট ও মুদ্রণ পরিপাট্য অতুলনীয়। দামী কাগজে ছাপা। শুধু  একটাই অনুযোগ করব, প্রুফ সংশোধনে আরও বেশি সতর্কতা বাঞ্ছিত ছিল। ভবিষ্যৎ মুদ্রণে নিশ্চয়ই এই ত্রুটি দূর হবে। এই বই এক বৃহৎ সময়ের দলিল। বহু কৃতী মানুষের আদর্শায়িত জীবনযাপনের এক আন্তরিক চিত্র। বইটির বহুল প্রচার নিশ্চয়ই আমরা সকলে চাইব। 


পুলিনবিহারী দাস 
আমার জীবনকাহিনী। সম্পাদনা : বিশ্বরঞ্জন দাস ও মণীশরঞ্জন দাস, শৈলী প্রকাশনী, ২০২৩। ৯৫০ টাকা।

Comments :0

Login to leave a comment