একজন চিকিৎসক এবং রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী যদি বলেন দেহদানের প্রয়োজন নেই তাহলে বুঝতে হবে এটি সুচিন্তিত প্রচার। যার পিছনে রয়েছে বিজ্ঞানমনস্কতা বিরোধী মনোভাব। কৌশলে তিনি সংবিধান বিরোধী বক্তব্য প্রকাশ করেছেন।
‘গণদর্পণ’ আয়োজিত সাংবাদিক সম্মেলনে এ কথাই বলেছেন বিশিষ্ট আইনজীবী ও গণদর্পণের কার্যকরী সভাপতি বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য।
সোমবার কলকাতা প্রেস ক্লাবে এই সাংবাদিক সম্মেলনে বিকাশ ভট্টাচার্য ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ ও কেপিসি মেডিক্যাল কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ অদ্যাপক চিকিৎসক সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী, পশ্চিমবঙ্গ বিজ্ঞান মঞ্চের সম্পাদক সৌরভ চক্রবর্তী, জনস্বাস্থ্য কমিটির সম্পাদক ডাঃ গোপাল দাস ও ডাঃ কাজল কৃষ্ণ বণিক।
রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী শারদ্বত মুখার্জি এক বেসরকারি হাসপাতালের অনুষ্ঠানে গিয়ে বলেছিলেন, "জ্যোতি বসু তাঁর দেহ দান করেছিলেন। কিন্তু মেডিক্যাল সায়েন্সে সেই দেহ কোনও কাজে লাগেনি। গোটা দেহ দান করে কোনও লাভ হয় না। তার থেকে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ দান করা।"
ডাঃ সিদ্ধার্থ চক্রবর্তী বলেছেন, "দেহ দান করা হয় চিকিৎসা শাস্ত্রের জন্য। অঙ্গ প্রতিস্থাপনের উদ্দেশ্য আলাদা। ‘ব্রেন ডেথ’ হলে তখন অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা যায়। কিন্তু আমাদের রাজ্যে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের হার খুবই কম। পরিকাঠামগত অভাব ও সরকারি সহযোগিতা নেই বললেই চলে। যারা বলছেন দেহ দানের দরকার নেই, তারা হয়তো জানেন না হাতে-কলমে অপারেশন থেকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন শেখা এবং পড়ুয়া চিকিৎসকদের চিকিৎসা শাস্ত্র শেখার জন্য শবদেহ প্রয়োজন হয়। এর কোনও বিকল্প নেই। গ্রাফিক্যাল ছবি অথবা এআই মডেল দ্বারা হাতে-কলমে শেখানো সম্ভব হয় না।’’
চিকিৎসক কাজল কৃষ্ণ বনিক বলেছেন, ‘‘দেহদান আন্দোলন শুরু হয়েছে একটি লক্ষ্য নিয়ে এবং অনেক পথ অতিক্রম করেছে। শুধুমাত্র চিকিৎসা শাস্ত্র কে সাহায্য করা নয়, মানুষের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা, কুসংস্কার বিরোধী চিন্তা তৈরি করার পেছনেও এই দেহ দান আন্দোলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বিদেশেও শব ব্যবচ্ছেদ ব্যবস্থা জরুরি চিকিৎসাশাস্ত্রে। আমাদের দেশেও এটা আগেও জরুরি ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। শব ব্যবচ্ছেদ হচ্ছে মেডিকেল সায়েন্সের অন্যতম প্রয়োজনীয় অংশ।"
‘গণদর্পণ’ বলেছে যে সমাজকে পেছনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চলছে, বিজ্ঞানমনস্কতার বিরোধী একটা শক্তি কাজ করছে। তার বিরুদ্ধেও ‘গণদর্পণ‘, বিজ্ঞানমঞ্চ, জনস্বাস্থ্য কমিটি লাগাতার প্রচার সচেতনতা চালাবে।
বিকাশ রঞ্জন ভট্টাচার্য বলেছেন বিজ্ঞান মনস্কতার প্রসার, কুসংস্কার বিরোধিতা, যুক্তি নির্ভর দেহদান বা অঙ্গদানের বিজ্ঞানভিত্তিক চেতনা ছড়িয়ে দিতেই ‘গণদর্পণ’ কাজ করেছে। রাজ্যের স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজে চিকিৎসক। তিনি যখন বলেন দেহ দানের প্রয়োজন নেই তার মধ্যে বুঝতে হবে এর পিছনে বিজ্ঞানমনস্কতা বিরোধী মনোভাব কাজ করছে। বিজ্ঞানের বিকাশের পথ রুদ্ধ করতে চাইছেন। কৌশলে সংবিধান বিরোধী কথা তুলে ধরছেন। এই সময় আমাদের কাজ বিজ্ঞানমনস্কতাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তিনি আরো বলেছেন আমি তীব্র ভাষায় নিন্দা করছি এই বক্তব্যের। স্বাস্থ্যমন্ত্রী বিনা শর্তে তাঁর মন্তব্য ফিরিয়ে নিন।
শুধুমাত্র স্বাস্থ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের বিরোধিতাই নয়, পরিকাঠামো গত এবং সরকারি উদ্যোগের দাবিও জানিয়েছে চিকিৎসক থেকে গণদর্পণের নেতৃবৃন্দ। সাংবাদিক সম্মেলন থেকে দাবি করা হয়েছে, দেহদান আইন মেনে সরকারিভাবে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। পরিকাঠামগত উন্নয়ন থেকে এই বিষয়ে সেমিনার আলোচনা সভা এবং ‘আই ব্যাংক’-গুলিতে সঠিক সংখ্যায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ করতে হবে। সরকারি মেডিক্যাল কলেজগুলি সামনে সচেতনতার জন্য হোর্ডিং ব্যবহার করতে হবে।
Health Minister's objection to body donation is essentially anti-science: Bikash Bhattacharya
দেহদানে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর আপত্তি আসলে বিজ্ঞান বিরোধিতা: বিকাশ ভট্টাচার্য
×
Comments :0