North Bengal

হড়পা বানের আতঙ্ক উত্তরবঙ্গে, নদীগর্ভ সংস্কারের দাবি

জেলা

নেপালের সাম্প্রতিক প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং উত্তরবঙ্গের পাহাড়ি নদীগুলিতে একের পর এক হড়পা বানের স্মৃতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। নদীতে অতিরিক্ত পলি জমে জলধারণ ক্ষমতা কমে যাওয়া, গতিপথ পরিবর্তন এবং নদীর কাছাকাছি অপরিকল্পিত নির্মাণের কারণে বিপদের আশঙ্কা বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে দ্রুত নদীগর্ভ সংস্কার, ড্রেজিং এবং দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা কার্যকর করার দাবি উঠেছে।
গত বছর অক্টোবরে বালাসনের শাখানদী রং-এর হড়পা বানে মিরিকের তাবাকোশি গ্রামে ব্যাপক ধ্বংস হয়। ১৫টির বেশি হোমস্টে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি দুধিয়ায় বালাসন নদীর সেতু ভেঙে শতাধিক পর্যটক আটকে পড়েন। অন্যদিকে জলঢাকার গাঠিয়া নদীর জলে নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা টন্ডু ক্ষতিগ্রস্ত হয় ও এক শিশু সহ ১৩ জনের মৃত্যু হয়। ২০২৩ সালে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে তিস্তায় ভয়াবহ বিপর্যয় নেমে আসে। তিস্তার গতিপথে পরিবর্তনের জেরে জলপাইগুড়ি-সহ বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ২০২২ সালের বিজয়া দশমীর সন্ধ্যায় মালবাজারে মাল নদীর হড়পা বানে আট জন প্রাণ হারান।
ভূগোল বিভাগের শিক্ষক বরুন দাস বলেন, নেপাল ও উত্তরবঙ্গের ভূপ্রকৃতিতে বেশ কিছু মিল রয়েছে। নেপালে হিমবাহ ভেঙে সাম্প্রতিক বিপর্যয় ঘটেছে। উত্তরবঙ্গের ডুয়ার্স ও মিরিকেও অতীতে হড়পা বানের প্রকোপ দেখা গিয়েছে। প্রাবল্য তুলনায় কম হলেও সতর্ক না থাকলে বড় বিপদ ঘটতে পারে। নেপালের রাসুয়ায় কোশী নদীতে সাম্প্রতিক হড়পা বান উত্তরবঙ্গের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে।
সেচ দপ্তর পরিস্থিতি মোকাবিলায় দার্জিলিং, কালিম্পং, জলপাইগুড়ি, আলিপুরদুয়ার ও কোচবিহার জেলার অন্তত ১৬টি বড় ও মাঝারি নদী বা নদীখাতে ড্রেজিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। উত্তর-পূর্ব বিভাগের মুখ্য বাস্তুকার কৃষ্ণেন্দু ভৌমিক জানান, উত্তরবঙ্গে প্রায় ৪০–৫০টি নদী বা নদীখাতে পলি জমা-সহ নানা সমস্যা রয়েছে। প্রাথমিক ভাবে ১৫–১৬টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা চিহ্নিত করে কাজ এগোচ্ছে। কোথাও টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে, কোথাও আবার ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
মহানন্দা, জলঢাকা, তিস্তার একাধিক অংশ, মরা তোর্সা-সহ বিভিন্ন নদী ও নদীখাতে ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিস্তার কয়েকটি অংশে কাজের জন্য ওয়ার্ক অর্ডার দেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। বর্ষাকালে নদীতে জল থাকায় এখন অনেক জায়গায় কাজের অগ্রগতি চোখে পড়ছে না। অক্টোবরের পর বর্ষা শেষ হলে পুরোদমে ড্রেজিং শুরু হবে। তিনি আরও বলেন নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর নতুন করে এই পরিকল্পনা নেওয়া হয়নি। নদীগুলির পরিস্থিতি আগে থেকেই পর্যবেক্ষণ করে ড্রেজিংয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তিস্তা ও তিস্তা সংলগ্ন খালগুলিতেও পলি অপসারণের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়া চলছে। গজলডোবা থেকে শিলিগুড়ি পর্যন্ত খালেও পলি তোলার পরিকল্পনা রয়েছে। উত্তোলিত পলি নির্দিষ্ট সংস্থাকে দিয়ে তার বিনিময়ে সরকারের অর্থ পাওয়ার পদ্ধতিতে কাজ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয় বাসিন্দারা প্রশাসনিক উদ্যোগের দ্রুত বাস্তবায়ন চাইছেন। তাবাকোশির বিপর্যয়ের পর পাহাড়ে স্থায়ী বিপর্যয় মোকাবিলা ব্যবস্থা ও সেতু নির্মাণ সহ প্রায় আট কোটি টাকার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও তার অধিকাংশ এখনও বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ। নদীর একেবারে কাছে নিয়মবহির্ভূত হোমস্টে নির্মাণ এবং নদীখাতে নেমে পিকনিকের মতো বিপজ্জনক কাজ বন্ধে নজরদারি বাড়ানোর দাবিও উঠেছে।
সেচ দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ভুটান পাহাড় থেকে নেমে আসা জলরাশির সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে জলপাইগুড়ি ও আলিপুরদুয়ার জেলার ৭৪টি নদীর।ভুটানে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঝোরার জল আচমকাই নদীতে নেমে আসতে পারে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই শুকনো নদী ভয়ঙ্কর স্রোতে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বানারহাট, নাগরাকাটা, মেটেলি, মাদারিহাট, বীরপাড়া, কুমারগ্রাম, ফালাকাটা ও কালচিনি ব্লকের বাসিন্দাদের তাই সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
নদী গবেষকদের মতে, বিপদ শুধু হড়পা বানে সীমাবদ্ধ নয়। হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলি বিপুল পলি বহন করে। সেই পলি নদীর তলদেশে জমে নদীখাত উঁচু হচ্ছে। তিস্তা, জলঢাকা, তোর্সা, কালজানি ও মহানন্দার মতো নদীর গতিপথেও পরিবর্তন ঘটছে। কোথাও কোথাও গত কয়েক দশকে নদীর পাড় কয়েকশো মিটার থেকে দুই কিলোমিটারেরও বেশি সরে গিয়েছে বলে গবেষকদের দাবি।
নদীর গতিপথ বদলালে শুধু জল নয়, জমি, রাস্তা, সেতু ও বসতিও বিপর্যস্ত হয়। তাই বন্যাপ্রবণ এলাকার মানচিত্রের পাশাপাশি নদীর সম্ভাব্য গতিপথ পরিবর্তন চিহ্নিত করে ‘মাইগ্রেশন ম্যাপ’ তৈরির দাবি উঠেছে। নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনা, অপরিকল্পিত নির্মাণ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয় মোকাবিলা পরিকল্পনা কার্যকর করাকেই এখন সবচেয়ে জরুরি পদক্ষেপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

Comments :0

Login to leave a comment