রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী প্রাক্তন তৃণমূলী শুভেন্দু অধিকারী ঘোষণা করেছেন তাদের টার্গেট হলো তৃণমূলকে গণতান্ত্রিকভাবে খতম করা এবং সিপিআই(এম)-কে কোনোভাবেই মাথা তুলতে না দেওয়া। বাছাই করা শব্দ ব্যবহার করে তিনি তার ভাষ্য যেভাবে সাজিয়েছেন এবং জনসমক্ষে হাজির করেছেন সেটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি তার পুরানো দলকে খতম করার কথা বলেছেন তবে গণতান্ত্রিকভাবে। গণতান্ত্রিকভাবে খতম করার বিষয়টি ঠিক কেমন তা তিনি খোলসা করেননি। আবার সিপিআই(এম)-কে খতম করার কথা বলেননি। বলেছেন যাতে মাথা তুলতে না পারে তার ব্যবস্থা করবেন। তেমনি মাথা তুলতে না দেবার কাজটি গণতান্ত্রিকভাবে করবেন সেটা বলেননি। তাহলে কি ধরে নিতে হবে বর্তমান সরকারের ‘বিরোধী’ তৃণমূলকে আইনি পথে গণতান্ত্রিক উপায়ে নির্মূল করে দেবেন। তৃণমূল অবশ্য ইতিমধ্যেই উঠে যাবার মুখে। তাকে তুলে দিতে শুভেন্দুর খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হবে না। ভালো তৃণমূলের মর্যাদা অর্জন করে তৃণমূলের দুই-তৃতীয়াংশ বিধায়ক শুভেন্দুদের পকেটে ঢুকে গেছে। বাকিরা কতদিন টিকতে পারবে সন্দেহ আছে। অতএব তৃণমূল আরএসএস-বিজেপি’র কাছে কোনও সমস্যা নয়। আসল সমস্যা সিপিআই(এম) তথা বামপন্থীদের নিয়ে।
শুভেন্দু বা তিনি এখন যে দলের নেতা ও মুখ্যমন্ত্রী সেই দল হাড়ে হাড়ে জানে গণতান্ত্রিক পথে সিপিআই(এম)-কে খতম করা সম্ভব নয়। কারণ এই দলটা অত্যন্ত শক্তিশালী একটা মতাদর্শের ভিতের উপর দাঁড়িয়ে তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে। যে মার্কসীয় মতাদর্শ শোষণহীন সমতার ও বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখায় সেই মতাদর্শকে পাথেয় করেই সিপিআই(এম) জাত-ধর্ম-বর্ণের ঊর্ধ্বে শ্রমজীবী মানুষকে সংগঠিত করে লড়াইয়ের মাঠটাকে ক্রমাগত বাড়িয়ে যায় তাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা আর যাই হোক বৃহৎ পুঁজির প্রতিনিধি ধর্মান্ধ সাম্প্রদায়িক হিন্দুত্ববাদী বিজেপি’র নেই। তাই শুভেন্দু সিপিআই(এম)-কে খতম করার দুঃসাহস দেখাননি। তেমনি এটাও বুঝেছেন মননে, বৌদ্ধিক চর্চায় সমাজ বদলের অভিঘাত এতটাই প্রলয় যে গণতান্ত্রিক পথেও সিপিআই(এম)’র অগ্রগতি আটকানো যাবে না। অতএব মুখে না বললেও অগণতান্ত্রিক, অসাংবিধানিক, বেআইনি স্বৈরাচারী পথকে আশ্রয় করেই তিনি সিপিআই(এম)-কে উঠতে না দেবার ছক কষেছেন। এক্ষেত্রে তিনি তার পুরানো দল তৃণমূলে থাকার সময়কার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাবেন ধরে নেওয়া যায়। ইতিমধ্যে গত দু’-তিন মাস তার বহু নমুনা দেখা গেছে।
যে কোনও রাজনৈতিক দলের শান্তিপূর্ণভাবে বিক্ষোভ, প্রতিবাদ, অবস্থান, ধরনা, মিছিল-সমাবেশ করার গণতান্ত্রিক অধিকার আছে। সিপিআই(এম) এবং তাদের সহযোগী বিভিন্ন সংগঠন প্রতিদিন সাধারণ মানুষের নানা জ্বলন্ত ইস্যুকে সামনে রেখে আন্দোলন করছে। যত দিন যাচ্ছে সেই আন্দোলনে জনসমাগম বাড়ছে। এটা কোনও মতেই সহ্য করতে পারছে না আরএসএস। তাই আন্দোলনের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে, ভয় দেখাতে একদিকে প্রশাসনকে অপব্যবহার করছে অন্যদিকে দলীয় আশ্রিত গুন্ডাদের লেলিয়ে দিচ্ছে আন্দোলনকারীদের উপর হামলা করতে। এখন প্রতিদিনই রাজ্যের নানা প্রান্তে কম করে শতাধিক কর্মসূচি হয়। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয় না। পরে পুলিশ পাঠিয়ে কর্মসূচি বানচালের চেষ্টা হয়। একইভাবে দুষ্কৃতীদের পাঠিয়ে মঞ্চ ভাঙা হয়। পতাকা, ফেস্টুন ছেঁড়া, পোড়ানো হয়। কর্মীদের মারধর করে হাসপাতালে পাঠানো হয়। পার্টি অফিসে হামলা, ভাঙচুর, দখল করা হয়। অর্থাৎ সবটাই গুন্ডামির পথে প্রশাসনকে ব্যবহার করে। শুভেন্দু স্বপ্ন দেখছেন এইভাবে সিপিআই(এম)-কে মাথা তোলা আটকাবেন। ব্রিটিশরাও এমন চেষ্টা করেছিল। ডাঃ বিধান রায়, সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়ও করেছিলেন। সর্বশেষ মমতা ব্যানার্জি চেষ্টা করেছিলেন। হাতি-ঘোড়া গেল তল, মশা বলে কত জল।
Suvendu Adhikari
শুভেন্দুর দিবাস্বপ্ন
×
Comments :0