নতুনপাতা
শিক্ষক দিবস | গল্প
দিদি
সৌরীশ মিশ্র
৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ
প্রায় দু'দশক আগের এ কথা।
উচ্চমাধ্যমিক পাশ করে কলেজে অ্যাডমিশন নিয়েছি সবে-সবে। কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ব। কলেজে ক্লাস শুরু হতে তখনও বেশ কয়েকদিন দেরী আছে। বাবা একদিন অফিস থেকে ফিরে আমাকে বললেন, "তুই তো কম্পিউটারের অ-আ-ক-খ কিছুই জানিস না। কলেজ খুলতেও দেরী আছে। এই ফাঁকে কম্পিউটারের বেসিকসগুলো বরং কিছুটা শিখে রাখ্। আমাদের ব্লকেই একজন আছেন, তিনি শেখান। নাম রুমেলা। আজ অফিস ফেরতা গিয়েছিলাম ওনার বাড়ি। কাল থেকে যেতে বলেছেন তোকে। সকাল ন'টায়।"
পরেরদিন নতুন টিচারের বাড়িটার সামনে গিয়ে হাজির হয়ে গেলাম সময় মতোন। এই রাস্তা দিয়ে বহুবার গেছি। কিন্তু, এই বাড়িতে যে কেউ কম্পিউটার শেখান জানা ছিল না। বুক দুর-দুর করছে। কে জানে, কেমন হবেন এই নতুন টিচার? রাগী হবেন কি? খুব কি বকাঝকা করবেন, না পারলেই? হাজার প্রশ্ন মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। এইসব ভাবতে-ভাবতেই কলিংবেলের সুইচটা টিপলাম। আর, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই মেন-দরজাটা খুলে হাসি-হাসি মুখে এসে দাঁড়ালেন আমার সামনে যে ভদ্রমহিলা, তাঁর বয়স আমার চেয়ে বছর দশ-বারোর বেশী হবেই না। আর আমাকে দেখেই বলে উঠলেন, "তুমিই সৌরীশ তো? আসো ভিতরে।" আর কথাকটা এতো সুন্দর করে স্নেহের সাথে বললেন যে আমার মধ্যের যে ভয়টা ছিল সেটা কর্পূরের মতো কোথায় উবে গেল কে জানে!
মনে আছে, সেইদিন কম্পিউটার সংক্রান্ত কিছু নোটস্ দিয়েছিলেন কেবল তিনি। এই যেমন সিপিউ কি, র্যাম কি, হার্ড ডিস্ক-ই বা কাকে বলে, এই সব আর কি! কিন্তু, সামনের টেবিলে রাখা কম্পিউটারটার ঢাকনা খোলা সিপিউটা থেকে ভিতরের পার্টসগুলো দেখিয়ে-দেখিয়ে এতো আন্তরিক ভাবে বুঝিয়ে দিলেন নোটস্ লেখাতে-লেখাতে উনি সেগুলো যে, কোনটা কি একদম যেন মনে গেঁথে গেল আমার। তা, ঘন্টাখানেক বাদে ফার্স্ট ক্লাস করে যখন বেরোলাম ওনার বাড়ি থেকে ততক্ষণে ওনাকে ডাকতে শুরু করে দিয়েছি 'দিদি' বলে। আর 'আপনি' থেকে উনি হয়ে গেছেন 'তুমি'-ও।
সেই শুরু। দিদি এরপর ধীরে-ধীরে হাতে ধরে শিখিয়েছে আমাকে কম্পিউটার অপারেট করা। মনে আছে, প্রথমদিন যেদিন মাউসে হাত রাখলাম, কি মুশকিলই না হচ্ছিল কারসরটাকে বাগে আনতে আর ডাবল ক্লিকটা করতে! আমি ঠিক মতোন করতে না পেরে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছিলাম মাঝে মধ্যেই, কিন্তু, দিদি এতোই ভালো টিচার ছিল যে ওর ধৈর্য্যচ্যুতি হতে দেখিনি।
যাই হোক। একই ব্লকেই থাকি এখনও আমরা। কিন্তু দেখা হোলো এই ক'দিন আগে আবার দিদির সাথে বহু বছর বাদে। বাজারে গিয়েছি। দেখি, দিদিও এসছে। আমার কি যে ভালো লাগলো দিদিকে আগের মতোই হাসিখুশি দেখে, কি বলব! কথা হোলো কিছুক্ষণ। একসময় দিদি বলল, "চেহারাটা খারাপ হয়েছে খুব তোমার। শরীরের যত্ন নিও।"
ক'মাস আগেই বাবাকে হারিয়েছি। তার জন্য শরীরটা সত্যিই ভেঙ্গেছে।
দিদির কাছে স্নেহ-মাখা কথাকটা শুনে চোখটা জ্বালা-জ্বালা করে উঠল সাথে-সাথে। আমি "হ্যাঁ দিদি নেব।" বলে দিদির কাছ থেকে বিদায় নিলাম।
কিছুটা এগিয়েছি। সামনেই একটা টার্ন। ঐটা দিয়েই ঘুরে যাব আমি। ধরব, যে রাস্তাটায় আমাদের বাড়ি সেইটা। টার্নটা নেওয়ার আগে ঘুরে তাকালাম পিছনে একবার। দেখি, দিদি নীচু হয়ে কি যেন বাছছে সব্জির দোকানে। আমি মনে-মনে বললাম, "দিদি, তুমি ভালো থেকো।"
Comments :0