দেবেশ দাস
কলকাতা পৌরসভার ডিলিমিটেশনে করতে গিয়ে প্রশাসনের খসড়া প্রস্তাবে, কলকাতার ১৪৪ ওয়ার্ড পুনর্বিন্যাস করে ২০৯টি ওয়ার্ড করা হয়েছে। প্রতিটি ওয়ার্ডে তিনটি বিষয় প্রস্তাবিত; এক, ওয়ার্ডের নতুন ম্যাপ; দুই, উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিমের সীমানা; তিন, ম্যাপ ও সীমানা অনুসরণ করে গত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা অনুযায়ী প্রতিটি ওয়ার্ডের পার্টগুলি। এই প্রস্তাব যা করা হয়েছে, তাতে জেরিম্যান্ডারিং শব্দটা কারও মাথায় আসাই স্বাভাবিক।
জেরিম্যান্ডারিং একটি ইংরেজি শব্দ। শব্দটির জন্ম ১৮১২ সালে আমেরিকায়। তদানীন্তন ম্যাসাচুসেটস প্রদেশের গভর্নর জেরি (Gerry) সাহেব আসন্ন নির্বাচনের আগে নির্বাচনী এলাকাগুলি এমনভাবে ভাগ করেছিলেন, যাতে তাঁর দল ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক-এর নির্বাচনী ফলাফল ভালো হয়। এটা করতে গিয়ে একটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ম্যাপ অনেকটা টিকটিকির মতো চেহারার একটা প্রাণীর মতো দাঁড়ায়, যে প্রাণীর ইংরেজি নাম সালাম্যান্ডার (Salamander) । একটি সংবাদপত্রে সেই প্রাণীর ছবি নিয়ে কার্টুনও বেরোয়, তাতে জেরি ও সালামান্ডার শব্দ দুটি জুড়ে নতুন শব্দের ব্যবহার হয় জেরিম্যান্ডার (Gerrymander)। তারপর থেকে বিভিন্ন সময়ে এই শব্দ ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অভিধানে শব্দটির বাংলা অর্থ ‘রাজনৈতিক স্বার্থে বা দলীয় সুবিধার জন্য নির্বাচনী এলাকার সীমানা পুনর্নির্ধারণে কারচুপি বা অনিয়ম করা’।
স্বাভাবিকভাবেই সিপিআই(এম)’র রাজ্য সম্পাদক কয়েকদিন আগে অভিযোগ করেছেন যে কলকাতা ও হাওড়ায় আসন্ন পৌর ভোটের জন্য ডিলিমিটেশন করতে গিয়ে বিজেপি জেরিম্যান্ডারিং করছে।
প্রশাসন জানিয়েছে যে বিভিন্ন ওয়ার্ডে ভোটার সংখ্যার বিশাল তারতম্য হয়ে গেছে, সেটা দূর করা দরকার। এটা ঠিক, কলকাতায় পৌর এলাকার ওয়ার্ডভিত্তিক পুনর্বিন্যাস হয়েছিল ৪০ বছরেরও আগে। বলা বাহুল্য, এই ৪০ বছরে বিভিন্ন ওয়ার্ডের জনসংখ্যা বদলেছে। গরিব এলাকায় গাদাগাদি করে লোকসংখ্যা বেড়েছে। সেভাবেই কিছু ধনী এলাকায় কমেছে। গত বিধানসভায় যে ভোটার সংখ্যা দাড়িয়েছিল, তাতে সাড়ে ৫ হাজার ভোটারের ওয়ার্ড ছিল, আবার তাঁর ১৫ গুণ ভোটার নিয়ে ৮৪ হাজার ভোটারেরও ওয়ার্ড ছিল। খুবই স্বাভাবিক, ওয়ার্ডের পুনর্বিন্যাসের দরকার ছিল। ফলে ডিলিমিটেশন নিশ্চয়ই স্বাগত। কিন্তু, কিভাবে হবে?
জনসংখ্যা না ভোটার সংখ্যা– কোনটা বিবেচ্য? এই প্রশ্ন থাকা স্বাভাবিক।
একথা সবাই হয়তো মানবেন যে ডিলিমিটেশন হওয়া উচিত জনসংখ্যা দেখে। কোনও ওয়ার্ডে যত নাগরিক থাকে, তাদের সকলের নাম ভোটার তালিকায় নাও থাকতে পারে। কিন্তু পৌরসভাকে সকলের জন্যই কাজ করতে হয়। এমনকি যারা ভোটার তালিকায় নাম তোলার বয়স হয়নি, তাঁদের জন্যও কাজ করতে হয়। আবার শুধু ভোটাররাই পৌরসভার কর দেন না, সেই ওয়ার্ডে বসবাসকারী সকল নাগরিকই কর দেন। ফলে জনসংখ্যা দেখে ডিলিমিটেশন করাটাই যুক্তিসঙ্গত।
কিন্তু বর্তমানে প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে ডিলিমিটেশন করা হয়েছে, তা ভোটার সংখ্যা বিচার করে করা হয়েছে, জনসংখ্যা দেখে নয়। এর পেছনেও একটা জোরালো যুক্তি আছে, সেটা হলো জনসংখ্যা ও ভোটার সংখ্যা মোটামুটিভাবে সমানুপাতিক। সাধারণভাবে এটা খুব ভুল নাও হতে পারে। কিন্তু বর্তমানে ডিলিমিটেশন হচ্ছে সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনের ভোটার তালিকা থেকে। এই তালিকায় সব জায়গায় ভোটার সংখ্যা ও জনসংখ্যা সমানুপাতিক আদৌ ছিল না। ১ জানুয়ারি ২০২৬ যে ভোটার তালিকা বেরিয়েছিল, এসআইআর’র দ্বিতীয় দফায় তার থেকে প্রচুর নাম বাদ গেছে এপ্রিলে এসে। কিছু সরাসরি বাদ, কিছু বিচারাধীন থেকে বাদ। যারা বিচারাধীন থেকে বাদ, কোনও সন্দেহ নেই, তাঁরা বেঁচে আছেন ও সেই ওয়ার্ডেই থাকেন। কিন্তু তাঁদের সংখ্যায় ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে ব্যাপক ফারাক। যেমন এই পদ্ধতিতে একটি ওয়ার্ডে বাদ গেছে ৬০২৪ জন (২৫ শতাংশ), আরেকটি ওয়ার্ডে মাত্র ৪৫ জন (০.৪ শতাংশ)। ১০০০-র বেশি ভোট বিচারাধীন থেকে বাদ গেছেন, কলকাতার বর্তমান ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ২৭টি ওয়ার্ডে । পৌর ভোটে একটি ওয়ার্ডে ১০০০ ভোট কম নয়। শতাংশের বিচারে কলকাতার বর্তমান ১৪৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫ থেকে ২৬ শতাংশ পর্যন্ত ভোটার বিচারাধীন হয়ে বাদ গেছে ২৩টি ওয়ার্ডে। সারা কলকাতায় গড় ৩.৫ শতাংশ।
যাদের নাম বিচারাধীন থেকে বাদ, তাঁরা ২০২৬-এর নির্বাচনে ভোট দিতে পারলেন না, তাঁদের সম্বন্ধে কেউ এখন পর্যন্ত বলেননি যে তাঁরা এদেশের নাগরিক নন। তাঁরা এদেশেই জন্মেছেন, আগেও ভোট দিয়েছেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাঁদের অথবা তাঁদের বাবা বা মার নাম ছিল। তাঁরা পৌরসভার কর দেন, দিয়ে যাচ্ছেন। পৌরসভা যখন এলাকায় সার্ভিস দেবে, তখন এলাকায় বসবাসকারী সকলের জন্য দেবে, ফলে তাঁরাও সার্ভিস পাবে। ভোটার তালিকা থেকে বাতিল এই নাগরিকদের সংখ্যা বাদ ফিয়ে সঠিক ডিলিমিটেশন হতে পারে না।
ডিলিমিটেশনে আরও কিছু বিষয় দেখা উচিত। যাতে সমস্ত ওয়ার্ডেই ভোটারের সংখ্যার খুব পার্থক্য না হয় সেটা দেখা উচিত। আবার ভূগোলটাও দেখতে হবে। ভোটার সংখ্যা সমান করতে গিয়ে ওয়ার্ডটা যেন কয়েকটি বিচ্ছিন্ন এলাকার সংযুক্তি না হয়, এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে খুব বেশি সময় না লাগে, না হলে পৌরসভার যে পৌরকর্মীরা কাজ করবেন তাঁদের অসুবিধা হবে।
কিন্তু প্রস্তাবিত খসড়ায় দেখা গেল, নানা গোলমাল। প্রথমত, কিছু পার্ট আছে যেগুলি প্রস্তাবিত ২০৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে কোথাও উল্লেখিত হয়নি। দ্বিতীয়ত, কিছু পার্ট দুটি ওয়ার্ডে লেখা হয়েছে। তৃতীয়ত কিছু কিছু পার্ট এমন আছে, যা একটি ওয়ার্ডে প্রস্তাবিত হয়েছে, সেই পার্টে যে সমস্ত ঠিকানা আছে, প্রস্তাবিত ওয়ার্ডগুলির ক্ষেত্রে তাঁর কিছু ঠিকানা এক প্রস্তাবিত ওয়ার্ডে, আর কিছু ঠিকানা পাশের প্রস্তাবিত ওয়ার্ডে আছে। চতুর্থত, কোনও একটি ওয়ার্ডের প্রস্তাবিত ম্যাপ ও সীমানা যা দেওয়া আছে, তার সঙ্গে সেই ওয়ার্ডের যে পার্টগুলি দেওয়া হয়েছে তা মিলছে না, কোথাও যে পার্টকে ঢোকানো হয়েছে তা প্রস্তাবিত ম্যাপ ও সীমানার মধ্যে পড়ে না, কোথাও ওয়ার্ডের প্রস্তাবিত ম্যাপ ও সীমানা যা দেওয়া আছে, তাতে যে পার্টগুলি থাকার কথা, সেই পার্টগুলির সব নেই। এই ভুলগুলি আসলে ক্ল্যারিক্যাল ভুল। তাড়াতাড়ি ভোট করার তাগিদে প্রশাসনের তাড়া খেয়ে, তাড়াহুড়োয় এগুলি ঘটেছে। এগুলি ঠিক করা যায়। আশা করি ঠিক করা হবে।
এখানেই আসে জেরিম্যান্ডারিংয়ের কথা।
প্রশাসন জানিয়েছিল যে ভোটারের সংখ্যায় সামঞ্জস্য আনার জন্যই ডিলিমিটেশন। কলকাতা পৌরসভার এলাকার মোট ভোটার প্রায় ৩২ লক্ষ। ২০৯টা ওয়ার্ডে ভাগ করলে গড়ে প্রায় ১৫ হাজার হওয়ার কথা। ভূগোল, সীমানা, ওয়ার্ডের ভিতরের যোগাযোগ দেখে যদি করা হয়,, তবে তা কখনো এক-দু’হাজার হাজার কমতে পারে, বাড়তে পারে। কিন্তু, আগে যে ওয়ার্ডটাতে সবচেয়ে কম ভোটার ছিল, প্রায় সাড়ে ৫ হাজার, ডিলিমিটেশনের প্রস্তাবে সেটাকে সেভাবেই রেখে দেওয়া হয়েছে। অনেক বড় ওয়ার্ড ভাঙা হয়েছে বলেই, সেটা ভালো কথা। কিন্তু তারপরেও একটি ওয়ার্ডে ২৩ হাজার, আরেকটিতে ২৪ হাজার, আরেকটায় সাড়ে ২৮ হাজারের ওয়ার্ডও আছে। খুব ভালো করে যদি লক্ষ্য করেন, তবে দেখতে পাবেন, প্রস্তাবিত এই বেশি ভোটারের ওয়ার্ডগুলির অঞ্চলে বিজেপি গত নির্বাচনে বেশি ভোট পায়নি। মানে গত নির্বাচনে যে সমস্ত অঞ্চলে বিজেপি ভোট পায়নি, সেই ওয়ার্ডগুলি থেকে যাতে বেশি প্রতিনিধি নির্বাচিত না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে সেই অঞ্চলে বেশি ভোটার সংখ্যা রেখে পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোথাও কোথাও এক জায়গায় হয়তো কতকগুলি পার্টে বিজেপি গত নির্বাচনে ভোট পায়নি, সেই পার্টগুলি জুড়ে দেওয়া হয়েছে,অন্য অনেক পার্টগুলির সাথে যেখানে বিজেপি বেশি ভোট পেয়েছে। অল্প সংখ্যক পার্টের বিজেপি বিরোধী ভোট ফলাফলে যাতে প্রভাব না ফেলতে পারে, সেই উদ্দেশ্যেই এটা করা হয়েছে।
এইভাবে করতে গিয়ে কোনও কোনও ওয়ার্ডের ভূগোল এমনভাবে বানানো হয়েছে, যে রাস্তা পেরিয়ে, খাল পেরিয়ে, ওয়ার্ডের এক অঞ্চল, আরেক অঞ্চলের সাথে যুক্ত করা হয়েছে। কোথাও দুটো পরস্পর যোগাযোগহীন বিচ্ছিন্ন অংশ শুধু একটা পয়েন্টে, যুক্ত করে একটি ওয়ার্ড বানানো হয়েছে। সেরকম একটা ছবি দেওয়া হলো।
তবু রাধা নাচবে কী? পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর’র দ্বিতীয় দফায় নির্বাচন কমিশন মুসলিমদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বেশি বাদ দিয়েছিল, যেহেতু তাঁরা বিজেপি-কে ভোট দেবে না। তাঁর সাথে কিছু প্রান্তিক দলিত মানুষদের ভোটও বাদ হয়েছিল। কলকাতায় মুসলিমরা ২১ শতাংশ, কিন্তু কলকাতা পৌরসভা এলাকায় বিচারাধীন হয়ে যারা বাদ গেছেন, তাঁদের মধ্যে মুসলিম প্রায় ৬৫ শতাংশ, বাকি বাদ হওয়া অমুসলিমদের বেশিরভাগই প্রান্তিক মানুষ। এখন প্রশাসন এমন ভাবে ডিলিমিটেশনের প্রস্তাব দিয়েছে, যাতে মুসলিম অঞ্চল থেকে বেশি প্রতিনিধি না আসতে পারে। এর পিছনে, একটা চিন্তা বিজেপি’র কাজ করছে, যে সব হিন্দু বিজেপি-কেই ভোট দেবে। গত নির্বাচনে যে হিন্দুরা বিজেপি-কে ভোট দিয়েছিলেন, তারা সকলেই হিন্দু হিসাবেই বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন এমন নয়। তৃণমূলের সরকারটাকে যে কোনোভাবে সরাতে হবে ভেবেও অনেকে বিজেপি-কে ভোট দিয়েছেন। সরকারে এসে বিজেপি-কে তৃণমূলেরই ছেঁড়াজুতোয় পা গলাতে দেখার পরও তাদের অনেকেই আর বিজেপি-কেই ভোট দেবেন না। দুনিয়া বদলায়, চাকা ঘোরে। এমন অনেকে যারা একদিন হিন্দুত্বের প্রভাবে বিজেপি-কে পছন্দ করেছিলেন, তাঁরাও আর সেই অবস্থানে নেই। সাম্প্রদায়িকতার প্রভাব চিরস্থায়ী হয় না। পেটের জ্বালা বড় জ্বালা। হকার উচ্ছেদ, বস্তি উচ্ছেদ, মূল্যবৃদ্ধি, ইত্যাদিতে ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যাই বেশি। তাঁরা কেন বিজেপি-কে ভোট দিতে যাবেন?
কে কোথায় কী ফল করবে নির্বাচনে, সেটা আদৌ মূল ইস্যু নয়। মূল সমস্যা হচ্ছে, একবার অযৌক্তিক ডিলিমিটেশন হলে, তাঁর ফল ভোগ করতে হবে বছরের পর। এর আগে ডিলিমিটেশন হয়েছিল ৪০ বছরেরও বেশি সময় আগে। সেই সময়ের মধ্যে বামফ্রন্ট, তৃণমূল, বিজেপি এসেছে। বিজেপি রাজ্যে নিশ্চয়ই ৪০ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকবে না। কিন্তু আশু ফল লাভের আশায়, আজ বিজেপি যা করতে চাইছে, তাঁর ফল ভোগ করতে হবে দলমত নির্বিশেষে আপামর নগরবাসীদের, বিজেপি’র সমর্থকও বাদ যাবেন না। আসন্ন পৌরভোটের দিকে তাকিয়ে নয়, নাগরিকদের দিকে তাকিয়ে এই জেরিম্যান্ডারিং –এর ডিলিমিটেশনের প্রস্তাব মানা যায় না।
Comments :0