MUKTADHARA | SUCHITRA MITRA 102 | GOUTAM ROY | 19 SEPTEMBER 2026 | 4th YEAR

মুক্তধারা | সুচিত্রা মিত্র - রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করে প্রতিবাদের স্বর | গৌতম রায় | ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

নতুনপাতা/মুক্তধারা

MUKTADHARA  SUCHITRA MITRA 102  GOUTAM ROY  19 SEPTEMBER 2026  4th YEAR

মুক্তধারা

সুচিত্রা মিত্র - রবীন্দ্রনাথকে অবলম্বন করে প্রতিবাদের স্বর  

গৌতম রায়

১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৪র্থ বর্ষ

---------------------
সুচিত্রা মিত্রকে শুধু রবীন্দ্রসঙ্গীতের অসামান্য শিল্পী হিসেবে দেখলে তাঁর শিল্পীসত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক অনালোচিত থেকে যায়। তাঁর গানের ভিতরে যে মানবতাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা কাজ করেছিল, তার সঙ্গে চল্লিশের দশক থেকে বাংলার বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের একটি গভীর যোগ ছিল। বলা যায়, রবীন্দ্রনাথের গানকেই তিনি নিজের প্রতিবাদের ভাষা করে তুলেছিলেন।

সুচিত্রার রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক চেতনার গঠনের সময়টি ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৪১ সালে তিনি শান্তিনিকেতনের সঙ্গীতভবনে ভর্তি হন এবং ইন্দিরা দেবীচৌধুরানি, শান্তিদেব ঘোষ ও শৈলজারঞ্জন মজুমদারের কাছে শিক্ষালাভ করেন। তাঁর পরিবারের বড় দুই বোনও গণআন্দোলন ও বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ফলে শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্র-মানবতাবাদ এবং চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা—দুইয়েরই প্রভাব তাঁর মানসগঠনে পড়ে।

ফ্যাসিবাদ-বিরোধী সাংস্কৃতিক আন্দোলনে রবীন্দ্রনাথের দেশাত্মবোধক ও সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী গান ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছিল। ‘এখন আর দেরি নয়’, ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ’ প্রভৃতি গান গণআন্দোলনের সাংস্কৃতিক পরিসরে নতুন অর্থ পেয়েছিল। গবেষণাতেও দেখা হয়েছে যে রবীন্দ্রসঙ্গীতের মধ্যে হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, ভারতের যৌথ সংস্কৃতি ও মানবিকতার প্রবল উপাদান ছিল।       
            সুচিত্রা এই ধারাটিকেই নিজের শিল্পীজীবনে গ্রহণ করেন। চল্লিশের দশকের দুর্ভিক্ষ, দাঙ্গা ও ঔপনিবেশিক শাসনের সংকটের সময় শিল্পীদের একটি অংশ গানকে ত্রাণ, প্রতিবাদ ও গণসংযোগের মাধ্যম করে তুলেছিল। সুচিত্রাও সেই সাংস্কৃতিক পরিসরের সঙ্গে যুক্ত হন। পরবর্তী সময়ে গণনাট্য সংঘ, বামপন্থী শিল্পী-সাহিত্যিকদের আড্ডা, মিছিল এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির কথা একাধিক জীবনীমূলক সূত্রে পাওয়া যায়। শম্ভু মিত্র, বিজন ভট্টাচার্য, সুভাষ মুখোপাধ্যায়, কলিম শরাফি, সুরপতি নন্দী, ভূপতি নন্দী , হেমাঙ্গ বিশ্বাস, দেবব্রত বিশ্বাস, সলিল চৌধুরী প্রমুখের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও ছিল।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। সুচিত্রার রাজনৈতিক অবস্থানকে কোন দলীয় কাঠামোয় ফেলা যায় না। একটি গবেষণামূলক আলোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে সাংস্কৃতিক বামপন্থা এবং তার মানবিক মূল্যবোধ থেকে তিনি কখনও সরে যাননি।
             ১৯৫১ সালের বার্লিন বিশ্ব যুব উৎসব তাঁর এই অবস্থানের একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। ভারতের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বহু বামপন্থী ছাত্র-যুব নেতা তখন কারাবন্দি বা আত্মগোপনে ছিলেন। সেই সময় সুচিত্রা বার্লিনে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের গান পরিবেশন করেন। গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণে তাঁর সেই ভূমিকার বিশেষ গুরুত্বের কথা উঠে এসেছে।

১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় তাঁর ভূমিকা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। কলকাতায় সাম্প্রদায়িক হিংসার বিরুদ্ধে যে শান্তি-মিছিল সংগঠিত হয়, সেখানে সুচিত্রা মিত্র সামনের সারিতে থেকে রবীন্দ্রনাথের ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’ গানটি গেয়েছিলেন। অর্থাৎ সাম্প্রদায়িক বিভাজনের মুহূর্তে তাঁর উত্তর ছিল কোনও দলীয় স্লোগান নয়—রবীন্দ্রনাথের মানুষের ঐক্যের গান। 
পরবর্তী দশকগুলিতেও এই ধারাটি অব্যাহত ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা শরণার্থী ও বিপর্যস্ত মানুষের সাহায্যের জন্য IPTA-র শিল্পীদের সঙ্গে তিনি অনুষ্ঠান ও রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহে অংশ নেন। অর্থাৎ, রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর কাছে নিছক মঞ্চের পরিবেশন নয়; নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক পরিস্থিতিতে তা মানুষের পাশে দাঁড়ানোর সাংস্কৃতিক কর্মে পরিণত হয়েছিল। 
সুচিত্রা মিত্রের এই অবস্থান বোঝার জন্য তাই ‘বামপন্থী’ শব্দটির অর্থও একটু বিস্তৃত করে দেখা দরকার। তিনি হয়তো প্রত্যক্ষ পার্টি-সংগঠনের কর্মী ছিলেন না; কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার বিরোধিতা, মানুষের ঐক্য, সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধিতা, নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং সংস্কৃতিকে সামাজিক দায়িত্ব হিসেবে দেখা—এই মূল্যবোধগুলির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক যাত্রার গভীর সম্পর্ক ছিল। সাম্প্রতিক গবেষণাতেও তাঁকে ‘cultural activist’ হিসেবে পুনর্বিবেচনা করা হয়েছে এবং রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিকে রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে সক্রিয়ভাবে ব্যবহারের বিষয়টি বিশেষভাবে চিহ্নিত হয়েছে। 
এই কারণেই সুচিত্রা মিত্রের রবীন্দ্রসঙ্গীতকে কেবল ‘সুরের সৌন্দর্য’ দিয়ে বিচার করলে তাঁর উত্তরাধিকার অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ কখনও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে মানুষের মিলনের আহ্বান, কখনও সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, কখনও বা বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোর নৈতিক ডাক হয়ে উঠেছে। বামপন্থার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ছিল এই অর্থে। 
রবীন্দ্রনাথের গান: এক প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক ভাষা। সুচিত্রা মিত্রের অবস্থানকে আরও গভীরভাবে বুঝতে হলে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার—তাঁর কাছে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন কেবল সঙ্গীতের গুরু নন, সামাজিক বিবেকেরও এক গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়। চল্লিশের দশকের রাজনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয়ের মধ্যে রবীন্দ্রসঙ্গীতকে তিনি যে ভাবে জনসমক্ষে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাতে গানগুলি তাদের প্রচলিত নান্দনিক পরিসর ছাড়িয়ে নতুন সামাজিক অর্থ লাভ করেছিল। গবেষণায়ও দেখানো হয়েছে যে রবীন্দ্রনাথের গানেই হিন্দু-মুসলিম ঐক্য, সমন্বিত ভারতীয় সংস্কৃতি এবং মানুষের মর্যাদার প্রশ্নটি বিশেষভাবে উপস্থিত। 
১৯৪৬-এর কলকাতার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সময় সুচিত্রার গান এই অর্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। স্মৃতিচারণে এসেছে, আতঙ্কগ্রস্ত মানুষের ভিড়ের মধ্যে একটি গাড়ি থামলে তিনি ট্রাকের উপর দাঁড়িয়ে ‘সার্থক জনম আমার জন্মেছি এই দেশে’ গানটি গেয়েছিলেন। সেই পরিস্থিতিতে গানটি নিছক দেশাত্মবোধক সংগীত ছিল না; হিংসায় বিধ্বস্ত মানুষের সামনে নিজের দেশ ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক সাংস্কৃতিক উচ্চারণে পরিণত হয়েছিল। এক ই সঙ্গে কলিম শরাফি গাইতেন, শুনহ হিন্দ কে রহনেওয়ালে- এখানেই সুচিত্রার স্বাতন্ত্র্য। গণনাট্য আন্দোলনের শিল্পীরা যখন নতুন গণসংগীত রচনা করছিলেন, তিনি অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই নতুন গানকে নিজের প্রধান মাধ্যম করেননি; রবীন্দ্রনাথের গানকেই সমকালীন সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন। ‘এক সূত্রে বাঁধিয়াছি সহস্রটি মন’ কিংবা ‘এখন আর দেরি নয়’-এর মতো গান মিছিল ও জনসমাবেশে তাঁর কণ্ঠে নতুন রাজনৈতিক অভিঘাত পেয়েছিল। 
এই কারণেই তাঁকে শুধুমাত্র ‘বামপন্থী শিল্পী’ বললে তাঁর অবস্থানটি ধরা পড়ে না। বরং বলা যায়, বামপন্থী সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর গভীর আত্মীয়তা তৈরি হয়েছিল মানুষের মুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতা ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে। 
সাংস্কৃতিকভাবে বামপন্থী মূল্যবোধের প্রতি স্থায়ী আস্থা; আর সেই আস্থার প্রধান ভাষা রবীন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রসঙ্গীত তাঁর কণ্ঠে কখনও নিছক ‘উচ্চাঙ্গ’ সংস্কৃতির সম্পদ হয়ে থাকেনি —সংকটের মুহূর্তে তা মানুষের কাছে ফিরে যাওয়ার, বিভাজনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিবেক জাগানোর গান হয়ে উঠেছিল।

Comments :0

Login to leave a comment