editorial

প্রহসনের পুনরাবৃত্তি

সম্পাদকীয় বিভাগ

কথায় বলে, উঠন্তি মুলো পত্তনেই চেনা যায়। রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতাসীন হওয়ার পর প্রথম উপনির্বাচনেই তার স্বরূপ উন্মোচিত করল। নন্দীগ্রাম আর রেজিনগর বিধানসভা কেন্দ্রের উপনির্বাচনে অবাধ ছাপ্পা, ভোট লুট করে প্রহসনের নতুন রেকর্ড তৈরি করল বিজেপি। এমনকি, পুলিশ প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের আধিকারিকরাও সরাসরি শাসক দলের পক্ষে ‘ভোট করা’তে নেমে পড়ে নজিরবিহীন নির্লজ্জতার উদাহরণ তৈরি করেছে।  
তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে মানুষ রায় দিয়ে নতুন সরকার গঠনের পর মাত্র পাঁচ মাস হয়েছে। সরকারে আসীন হওয়ার পর মুখ্যমন্ত্রী সহ শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীরা বাগাড়ম্বরের কোনও কমতি রাখেনি। সরকারের সাফল্যের কথা সদর্পে ঘোষণা করা চললেও বোঝাই গেল যে সেই সব প্রকল্পের উপর ন্যূনতম ভরসা নেই বিজেপি’র। প্রথম ভোটে তাদের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব কতটা প্রতিফলিত হচ্ছে, তা খতিয়ে দেখতেই পারতো, কিন্তু নিশ্চিন্তে থাকতে না পেরে অবাধ লুট আর ছাপ্পার পথেই হাঁটলো শুভেন্দু অধিকারীর বিজেপি। মানুষের প্রতিরোধের মেজাজের যে ছবি গত কয়েক মাসে দেখা গিয়েছে ইতিমধ্যে, তাতেই ভয় পেয়েছে বিজেপি। 
দলীয় সংগঠন এখনও শক্তপোক্ত না হওয়ায় খোলাখুলি পুলিশকে দিয়েই ভোট লুটের আয়োজন করালো বিজেপি। ভোটারদের বুথ ঢোকানো নয়, বুথ থেকে বের করে দেওয়ার ‘দায়িত্ব’ পালন করে পুলিশ ফাঁকা বুথ তুলে দিল বিজেপি’র হাতে। এমনকি, রেজিনগরে সিপিআই (এম) প্রার্থীর নির্বাচনী এজেন্টকে পর্যন্ত ভোট দিতে দেওয়া হয়নি। দুটি কেন্দ্রেরই বেশিরভাগ বুথে বিরোধীদের কোনও এজেন্টকে বসতে দেয়নি বিজেপি’র কর্মী, পুলিশ। কিছু জায়গায় বিরোধী দলের এজেন্টকে বুথে ঢুকতেও দেওয়া হয়নি। এমনকি আগেরদিন রাতে বিরোধীদের এজেন্টদের বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়েছে বিজেপি’র নেতা, কর্মীরা। সেখানেও পুলিশ, আধা সামরিক বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। নিজেরা গিয়ে হুমকি দেওয়ার সাহসও দেখাতে পারেনি বিজেপি। এই উপনির্বাচন প্রমাণ করেছে, রাজ্যে পুলিশের সাহায্য ছাড়া বিজেপি’র কিছুই করার ক্ষমতা নেই। কোনও সংগঠন নেই তাদের।
নন্দীগ্রামে নির্বাচনের প্রচারে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেছিলেন, ‘‘আমি ভোট করাতে জানি।’’ সেই ভোটই ‘করালো’ তাঁর প্রশাসন, পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী। নির্বাচনী প্রচারে সংখ্যালঘু মানুষকে উদ্দেশ্য করে শুভেন্দু অধিকারী ‘বন্ধুত্ব’-র বার্তা দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘৬ তারিখ প্রমাণ করুন আপনারা মুখ্যমন্ত্রীর পাশে আছেন।’ সেই সংখ্যালঘুদের বড় অংশকে ভোটের দিন শত্রুর মতো তাড়া করেছে পুলিশ, বিজেপি’র কর্মীরা। ভোট দিতে পারেননি তাঁদের অনেকেই। 
২০১৮’র পঞ্চায়েত ভোটে মুর্শিদাবাদ, মালদহ ও উত্তর দিনাজপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের অবজার্ভার ছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। মুর্শিদাবাদের মানুষের অভিজ্ঞতা, পুলিশ আর দুষ্কৃতীদের দিয়ে নির্বিচারে ভোট লুটের সেই কায়দারই পুনরাবৃত্তি হয়েছে এবারেও। প্রাক্তন শাসক দলের দুষ্কৃতীরাই এখন বর্তমান শাসক দলের হয়ে ভোট লুটের কারিগর। প্রথমে এজেন্ট, ভোটারদের বুথে না আসার নির্দেশ। পরে রাস্তার মোড়ে আটকানো। আরও পরে বুথ থেকে বের করে দেওয়া। আর সবটাই হলো পুলিশের নির্দেশে, পুলিশের সরাসরি মদতে, কোথাও কোথাও পুলিশ নিজেই ভোট লুটের কারিগরের ভূমিকায়। 
প্রশ্ন হলো, দুই তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে আসা শাসক দলের কাছে কি এই কায়দায় দুটি কেন্দ্রের উপনির্বাচনে জেতা জরুরি ছিল? কিছুদিন বাদেই রাজ্যে পৌরনির্বাচন হওয়ার কথা। সেখানেও ফ্যাসিবাদী কায়দায় নির্বাচনী প্রহসনের পুনরাবৃত্তিই কি হতে চলেছে? ঘরপোড়া গোরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়!

Comments :0

Login to leave a comment