কৌশিক দাম
উত্তরবঙ্গের চা বাগানগুলিতে মোট শ্রমিকের প্রায় ৭৫ শতাংশ মহিলা। চা পাতা তোলা থেকে বাগানের প্রশাসনিক কাজ, ফ্যাক্টরির নাইট শিফট, সেচ ও নিকাশি ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণ—চা শিল্পের উৎপাদন সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। অথচ কাজের পরিধি ও দায়িত্ব বাড়লেও সেই অনুপাতে মর্যাদা, মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা এবং শিশু পরিচর্যার পরিকাঠামো কতটা নিশ্চিত হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। মহিলা শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রের পাশাপাশি সংসারের দায়িত্ব সামলাতে গিয়ে প্রতিদিনই নানা সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে।
বিভিন্ন চা বাগানের শ্রমিকদের বক্তব্য, একসময় বাগানে মহিলা শ্রমিকের অনুপাত ছিল প্রায় ৫০ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে ৭৫ শতাংশ বেশি হয়েছে। বিকল্প উপার্জনের সন্ধানে বহু পুরুষ শ্রমিক বাগানের কাজ ছেড়ে দিনমজুরি করছেন অথবা ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে চলে যাচ্ছেন। ফলে বাগানে পুরুষ শ্রমিকের সংখ্যা কমছে। মহিলাদের কাঁধে উৎপাদন সচল রাখার বাড়তি দায়িত্ব এসে পড়ছে।
তাঁদের ভূমিকা কাঁচা পাতা তোলার কাজেই সীমাবদ্ধ নেই। বিভিন্ন বাগানে টলার, সর্দার,দফাদার ও সাব-স্টাফের দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। অফিসের কাজ, ফ্যাক্টরির নাইট শিফট, কৃত্রিম সেচব্যবস্থা চালু রাখা, নিকাশিনালা তৈরি এবং নতুন চা গাছ রোপণের মতো কাজেও তাঁরা দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছেন। কিন্তু দায়িত্ব বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে কর্মক্ষেত্রে তাঁদের সুযোগ-সুবিধা ও স্বীকৃতি বাড়ছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের অধীন বানারহাট চা বাগানে একসময় সাবিত্রী লোরঞ্জ, দুর্গী মুন্ডা ও সোমা ওরাওঁয়ের মতো মহিলারা সর্দার ও বৈলাদারের দায়িত্ব সামলেছেন। তাঁরা এখন অবসরপ্রাপ্ত। বর্তমানে ওই বাগানে বৈলাদারের দায়িত্বে কবিতা মাহালী রয়েছেন। তাঁর কথায়,“মহিলারা পারবেন না, এমন কোনও কাজ হতেই পারে না। সঠিক সুযোগ ও দায়িত্ব পেলে তাঁরা পুরুষদের চেয়েও ভালোভাবে কাজ সামলাতে পারেন।”
একই ছবি জলপাইগুড়ির ডেঙ্গুয়াঝাড় চা বাগানেও। সেখানে সুখমইত ওরাওঁ, ঝর্ণা লাকড়া, কল্পনা ওরাওঁ এবং সুমিতা থাপার মতো মহিলারা সর্দার, দফাদার ও সাব-স্টাফের দায়িত্ব পালন করছেন। ঝর্ণা লাকড়ার বক্তব্য, বাগানের কাজ সামলানোর পাশাপাশি বাড়ির সমস্ত দায়িত্বও তাঁদেরই বহন করতে হয়। ফলে দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের পরেও বিশ্রাম ও ব্যক্তিগত সময়ের সুযোগ খুবই সীমিত।
নাগরাকাটার বামনডাঙ্গা চা বাগানের সুখমনি ওরাওঁ ২০২৪ সালের চা বাগানের বোনাস আন্দোলনের অন্যতম মুখ ছিলেন। তাঁর অভিযোগ, আজও বহু চা বাগানে সদ্যোজাত ও ছোট শিশুদের রাখার জন্য ন্যূনতম ক্রেশের ব্যবস্থা নেই। কাজে যোগ দেওয়ার পর শিশুদের দেখাশোনা করা মহিলা শ্রমিকদের কাছে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়ায়। মাতৃত্বকালীন ছুটি ও শিশুর পরিচর্যার সুযোগ পেতেও নানা অসুবিধার মুখে পড়তে হয়।
বানারহাটের কারবালা চা বাগানের জেনারেল ম্যানেজারও মহিলা শ্রমিকদের কাজের প্রশংসা করেছেন। তাঁর বক্তব্য, ওই বাগানের মোট শ্রমিকের প্রায় ৬০ শতাংশ মহিলা। তাঁরা দায়িত্বশীল এবং কাজের প্রতি নিষ্ঠাবান।
চা বাগান মজদুর ইউনিয়নের নেতৃত্ব সিকান্দার মাঝির বক্তব্য, চা শিল্পে মহিলা শ্রমিকদের অবদানের স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি তাঁদের পেশাগত দক্ষতা বাড়াতে কর্তৃপক্ষকে আরও ইতিবাচক পদক্ষেপ নিতে হবে। কাজের সুযোগ বৃদ্ধির সঙ্গে তাঁদের মর্যাদা, মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা এবং শিশু পরিচর্যার উপযুক্ত পরিকাঠামো নিশ্চিত করার দাবিও উঠছে।
চা শিল্পের উৎপাদন ও ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে মহিলা শ্রমিকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সেই অবদানের স্বীকৃতি শুধু প্রশংসায় সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। কর্মক্ষেত্রে সমান মর্যাদা, প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা এবং শিশু পরিচর্যার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব হচ্ছে, তার উপরই নির্ভর করছে চা বাগানের মহিলা শ্রমিকদের কাজের পরিবেশ ও জীবনযাত্রার উন্নতি।
Comments :0