Defences Scam

একক দরপত্রে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের বরাত ভুঁইফোড় সংস্থাকে

জাতীয়

 অফিস তালাবন্ধ। নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্রের হদিস নেই। এক বছরে সংস্থার মোট আয় ৪৪.৪৩ লক্ষ টাকা। অথচ সেই সংস্থাকেই ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ সরবরাহের জন্য দেওয়া হয়েছে ৫৬.৮ কোটি টাকার বরাত। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে একক দরপত্রে এই বরাত দেওয়া ঘিরে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে স্বজনপোষণ ও সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে নরেন্দ্র মোদী সরকারের বিরুদ্ধে। বিতর্কের কেন্দ্রে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থা ভারত ডাইনামিক্স লিমিটেড (বিডিএল) এবং ‘ঐন্দ্রী ডিফেন্স অ্যাডভাইজরি প্রাইভেট লিমিটেড’।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই বরাতের প্রক্রিয়া, সংস্থাটির পরিকাঠামো এবং আর্থিক সক্ষমতা নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে। ঐন্দ্রী ডিফেন্সের মালিক শম্ভবী মিশ্র বিডিএল-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান সিদ্ধার্থ মিশ্রের স্ত্রী। ফলে প্রতিরক্ষার মতো স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে কোটি কোটি টাকার বরাত দেওয়ার সময় স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা যথাযথভাবে খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।
ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র বা ‘অ্যান্টি ট্যাঙ্ক গাইডেড মিসাইল’ (এটিজিএম)-এর লক্ষ্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ ‘অপটিক্যাল সাইট’। ২০২৬ সালের মে মাসে এই যন্ত্রাংশ কেনার জন্য বিডিএল একক দরপত্র পদ্ধতি অনুসরণ করে। অর্থাৎ, প্রতিযোগিতামূলক উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে মাত্র একটি সংস্থাকে দরপত্র জমা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই সংস্থা ঐন্দ্রী ডিফেন্স। বরাতের মূল্য ৫৬.৮ কোটি টাকা।
সিদ্ধার্থ মিশ্র ২০২৩ সালের মার্চে বিডিএল-এর চেয়ারম্যান পদ থেকে অবসর নেন। তার প্রায় ১৪ মাস পরে, ২০২৪ সালের মে মাসে তিনি ও তাঁর স্ত্রী ঐন্দ্রী ডিফেন্স প্রতিষ্ঠা করেন। প্রাথমিকভাবে দু’জনেরই সংস্থায় ৫০ শতাংশ করে শেয়ার ছিল। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে জাতীয় কোম্পানি আইন ট্রাইব্যুনালের (এনসিএলটি) কলকাতা বেঞ্চে কারিগরি সদস্য হিসেবে যোগ দেওয়ার আগে সিদ্ধার্থ মিশ্র সংস্থার ডিরেক্টর পদ ও শেয়ার ছেড়ে দেন। বর্তমানে তাঁর স্ত্রী শম্ভবী মিশ্রের হাতে রয়েছে সংস্থার ৯৫ শতাংশ শেয়ার। বাকি ৫ শতাংশের মালিক কৌশিকী নন্দন বাৎসায়ন।
প্রাক্তন রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থার প্রধানের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত একটি সংস্থাকে এভাবে একক দরপত্রে বরাত দেওয়ার ক্ষেত্রে কী ধরনের মূল্যায়ন করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে শুধু পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তিতে অনিয়মের সিদ্ধান্তে পৌঁছনো যায় না; বরাতের প্রক্রিয়া ও যোগ্যতা যাচাইয়ের নথিই এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
ঐন্দ্রী ডিফেন্সের পরিকাঠামো নিয়ে ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অনুসন্ধানে একাধিক অসঙ্গতির কথা উঠে এসেছে। হায়দরাবাদের কুশাইগুড়ায় ন্যাশনাল স্মল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশনের (এনএসআইসি) ক্যাম্পাসে ২০২৬ সালের এপ্রিলে লিজ নেওয়া প্রায় ১,০৫০ বর্গফুটের অফিসে গিয়ে প্রতিবেদকেরা সেটি তালাবন্ধ দেখতে পান। আশপাশের অফিসের কর্মীদের বক্তব্য অনুযায়ী, মাঝেমধ্যে দু’জন ব্যক্তি এসে অল্প সময়ের জন্য ঘরটি খোলেন। সংস্থার নথিভুক্ত আগের ঠিকানা, জওহর নগরের একটি ফ্ল্যাটেও গিয়ে সেটি খালি পাওয়া যায়।
সংস্থাটির নিজস্ব উৎপাদন কেন্দ্র বা ম্যানুফ্যাকচারিং প্ল্যান্টেরও হদিস মেলেনি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। অথচ বরাত অনুযায়ী ৩০০টি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিরক্ষা যন্ত্রাংশ সরবরাহের পাশাপাশি ১৫ বছর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বও রয়েছে। নিজস্ব উৎপাদন পরিকাঠামোর প্রমাণ না থাকলে সংস্থাটি কীভাবে এই দায়িত্ব পালন করবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য উৎপাদকদের কাছ থেকে যন্ত্রাংশ সংগ্রহ করে সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলে সেই ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, তা-ও স্পষ্ট নয়।
সংস্থার আর্থিক হিসাবেও রয়েছে বিস্তর ফারাক। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ঐন্দ্রী ডিফেন্সের মোট আয় ছিল ৪৪.৪৩ লক্ষ টাকা। তার পুরোটাই এসেছিল পরামর্শমূলক পরিষেবা থেকে। ওই বছরে সংস্থার মুনাফা ছিল মাত্র ২.৮৯ লক্ষ টাকা। সেই সংস্থাকেই দেওয়া হয়েছে ৫৬.৮ কোটি টাকার বরাত—যা তার এক বছরের মোট আয়ের প্রায় ১২৮ গুণ।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে, এত বড় অঙ্কের বরাত দেওয়ার আগে সংস্থাটির আর্থিক সামর্থ্য, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, সরবরাহের পরিকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে। বরাতের মূল্য নির্ধারণে বাজারদরের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও স্পষ্ট তথ্য সামনে আসেনি।
বিতর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, আগের দু’বছরের ক্রয়প্রক্রিয়ার সঙ্গে ২০২৬ সালের পদ্ধতির পার্থক্য। ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর নথি পর্যালোচনা অনুযায়ী, ২০২৪ ও ২০২৫ সালে একই ধরনের ‘অপটিক্যাল সাইট’ কেনার ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের ব্যবস্থা ছিল। সেই বরাত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিরক্ষা সংস্থাগুলির জন্য সংরক্ষিত ছিল। দু’বছরই প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্থ রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা ইন্ডিয়া অপটেল লিমিটেড এই যন্ত্রাংশ তৈরির বরাত পায়।
কিন্তু ২০২৬ সালে সেই পদ্ধতি থেকে সরে এসে একক দরপত্রের মাধ্যমে বেসরকারি সংস্থা ঐন্দ্রী ডিফেন্সকে বেছে নেওয়া হলো কেন? রাষ্ট্রায়ত্ত ইন্ডিয়া অপটেল কি এ বার যন্ত্রাংশ সরবরাহে অক্ষম ছিল? প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে একক দরপত্রের প্রয়োজনীয়তা কী ছিল? এই পরিবর্তনের পক্ষে কী যুক্তি রয়েছে?

বিডিএল কর্তৃপক্ষের দাবি, জরুরি পরিস্থিতির কারণে একক দরপত্রের ভিত্তিতে বরাত দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেই জরুরি পরিস্থিতির প্রকৃতি কী, কেন উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র সম্ভব ছিল না এবং সিদ্ধান্তের পক্ষে কী নথি রয়েছে—এই প্রশ্নগুলির উত্তর সামনে আসেনি।
প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বিপুল অঙ্কের সরকারি বরাত দেওয়ার প্রক্রিয়া কতটা স্বচ্ছ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। সংস্থাটির আর্থিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে? বাজারদরের সঙ্গে বরাতের মূল্য তুলনা করা হয়েছিল কি? আগের দু’বছর যে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এই যন্ত্রাংশ সরবরাহ করেছে, তাকে এ বার প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়া হলো না কেন? প্রাক্তন বিডিএল চেয়ারম্যানের পরিবারের সঙ্গে যুক্ত সংস্থাকে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে স্বার্থের সংঘাতের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা হয়েছিল কি?
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর তরফে সিদ্ধার্থ মিশ্র, শম্ভবী মিশ্র এবং ঐন্দ্রী ডিফেন্সের অন্য এক ডিরেক্টরের কাছে প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনও জবাব মেলেনি বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
একক দরপত্রে বরাত দেওয়া নিজে থেকেই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। কিন্তু প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া থেকে সরে আসা, সংস্থার সীমিত আর্থিক পরিসর, উৎপাদন পরিকাঠামো নিয়ে প্রশ্ন এবং প্রাক্তন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থার প্রধানের পরিবারের সঙ্গে মালিকানার যোগ—সব মিলিয়ে এই বরাতের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জোরালো হচ্ছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রক ও বিডিএল-এর কাছে এখন মূল প্রশ্ন, ৫৬.৮ কোটি টাকার এই বরাতের সিদ্ধান্তের পক্ষে কী তথ্য ও নথি রয়েছে?

Comments :0

Login to leave a comment