editorial

বিদেশিকরণ

সম্পাদকীয় বিভাগ

দিল্লির বুকে দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সংবিধান এবং মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে ছাত্র-যুব সমাজ ও বিরোধী দলগুলির লাগাতার বিক্ষোভ-প্রতিবাদে মোদী সরকারের নাজেহাল অবস্থার মধ্যেই শিল্প ক্ষেত্রে ঋণদানকারী দেশে বৃহত্তম রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক আইডিবিআই বিক্রি করে দেবার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে দিয়েছে সরকার। অবশ্য এবার আর দেশীয় বেসরকারি মালিকের হাতে আইডিবিআই-কে তুলে দেওয়া হচ্ছে না। বদলে সরকারি সংস্থাটিকে সরাসরি তুলে দেওয়া হচ্ছে বিদেশি সংস্থার হাতে। কানাডার সংস্থা ফেয়ারফ্যাক্স ৫২ হাজার ৮৭৮ কোটি টাকার বিনিময়ে ৬০.৭২ শতাংশ শেয়ার কিনে নিয়ে সরাসরি আইডিবিআই-র নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালন ভার হাতে নিচ্ছে। ভারতের আর্থিক ক্ষেত্রে এত বড় আকারের বিদেশি ল‍‌গ্নি এবং বিদেশি কর্তৃত্ব অতীতে কোনও দিন হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই এর প্রভাব হবে সুদূরপ্রসারী।
এতদিন বিলগ্নিকরণ বা বেসরকারিকরণের ক্ষেত্রে মোদী সরকারের অগ্রাধিকার ছিল দেশীয় কর্পোরেট তথা শিল্পগোষ্ঠী। আদানি-আম্বানিদের মতো বেসরকারি শিল্পপতিদেরই বেছে নেওয়া হতো সরকারি সম্পদ তথা জাতীয় সম্পদ হস্তান্তরের জন্য। এবার বিদেশি সংস্থার জন্য দরজা খুলে দিয়ে বিদেশি বহুজাতিক পুঁজির জন্য নতুন বার্তা দেওয়া হয়েছে। আপাতত আর্থিক ক্ষেত্রের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিদেশি মালিকদের হাতে অর্পিত হলেও আগামীদিনে অন্যান্য ক্ষেত্রের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাও বাদ যাবে না।
স্বাধীন ভারতে শিল্প বিকাশের লক্ষ্যে প্রধানত বেসরকারি শিল্পোদ্যোগীদের ঋণের ব্যবস্থা করতে সরকারি মালিকানায় তৈরি হয় আইডিবিআই। এই সংস্থার ঋণের সুযোগে দেশে গড়ে উঠেছে অসংখ্য শিল্প সংস্থা। তেমনি বিপুল ঋণ নিয়ে শোধ দেয়নি এমন সংস্থাও অনেক। ফলত এক সময় সংস্থাটি কঠিন আর্থিক সঙ্কটে পড়ে। অনাদায়ী ঋণের চাপে বিপুল লোকসান হতে থাকে। তখন থেকেই ভাবনা শুরু হয় বেসরকারিকরণের। ২০১৯ সাল পর্যন্ত আইডিবিআই ছিল পুরোপুরি কেন্দ্রীয় সরকারের মালিকানাধীন। মোদী দ্বিতীয়বারের জন্য প্রধানমন্ত্রী হয়েই ৪৯.২৪ শতাংশ শেয়ার এলআইসি-কে বিক্রি করে দেয়। তারপর সুযোগ খুঁজতে থাকে বেসরকারি হাতে তুলে দেবার।
গত বেশ কয়েক বছর ধরে ভারতে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ নিতান্তই কমে গেছে। তেমনি শেয়ার বাজার থেকে লাগাতার বিদেশি লগ্নি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। অর্থাৎ দেশে বিদেশি মুদ্রার আগমন কমছে। আবার বৈ‍‌দেশিক বাণিজ্যে বিপুল ঘাটতির ফলে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ের টান পড়ছে। ফলত ডলারের তুলনায় ভারতের টাকার ধারাবাহিক মূল্য পতন অনিবার্য হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় বিদেশি সংস্থার কাছে সরাসরি আইডিবিআই বিক্রি করে দিলে একদিকে মোটা অঙ্কের বিদেশি মুদ্রা মিলবে তেমনি সরকারের বাজেট ঘাটতিও অনেকটা সামাল দেওয়া যাবে। সর্বোপরি মোদী সরকারের সমর্থক ভারতীয় বংশোদ্ভূত কানাডার নাগরিকের সংস্থার কাছে আইডিবিআই তুলে দিয়ে আত্মতৃপ্তিও মিলবে। কিন্তু শেষ বিচারে আত্মনির্ভর ভারতের প্রচারের আড়ালে ভারতের রাষ্ট্রীয় সম্পদের মালিকানা তুলে দেওয়া হলো বিদেশি পুঁজির হাতে। বস্তুত অর্থনীতির লাগাম থাকে যে আর্থিক ক্ষেত্রের উপর সেই ক্ষেত্রেই লাগাম চলে যাচ্ছে বিদেশিদের হাতে। এটাই মোদীমার্কা দেশপ্রেম।

Comments :0

Login to leave a comment