অমিত ভদ্র
ফারাক গড়ে দিলেন কিলিয়ান এমবাপে। সেনেগালের মতো আফ্রিকান জায়ান্টের বিরুদ্ধে কঠিন ম্যাচে ৩-১ গোল জিতল গত বিশ্বকাপের ফাইনালিস্ট। কাতার বিশ্বকাপে যেখানে শেষ করেছিলেন, ছাব্বিশের বিশ্বকাপে সেখান থেকেই শুরু করলেন এমবাপে। অজস্র গোল মিস করলেও, আসল সময়ে কাজের কাজটা করেছেন। ছাব্বিশের বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করে ম্যাচের নায়ক এমবাপে। দ্বিতীয় গোলটা অসাধারণ। ডি বক্সের অনেকটা বাইরে থেকে কামান দাগা শটে জাল কাঁপিয়ে দিলেন। অপর গোলটি করেন পরিবর্ত হিসেবে নামা বার্কোলা। বলতেই হয়, এবার ফ্রান্সের মতো রিজার্ভ বেঞ্চ অন্য দলের নেই।
দু’টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে বারোটা গোল ছিল এমবাপের। সেনেগালের বিরুদ্ধে দু’গোল করে বিশ্বকাপে তাঁর গোলসংখ্যা দাঁড়াল ১৪। পিছনে ফেলে দিলেন ফ্রান্সের প্রাক্তন ফুটবলার জাঁ ফতে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল মেসিকে। নাম লেখালেন গার্ড মুলারের পাশে। এমবাপের সামনে এখন শুধু ব্রাজিলের রোনাল্ডো নাজারিও (১৫) ও জার্মানির মিরোস্লাভ ক্লোজে (১৬)। এদিন জোড়া গোল করে ফ্রান্সের সর্বাধিক গোলদাতাও এমবাপে (৫৮)। পেরিয়ে গেলেন অলিভিয়ের জিরুকে।
অথচ প্রথমার্ধে সুযোগগুলি কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাওয়া উচিত ছিল সেনেগালের। বিরতির আগে সেনেগালের ইসমাইলা সারের ওই গোলটা করা উচিত ছিল। সবচেয়ে সহজ সুযোগটা মিস করলেন ইসমাইলা। তার আগে নিকোলাস জ্যাকসনের বাঁ পায়ের শটটা পোস্টে লেগে প্রতিহত হলো। প্রথমার্ধে ফ্রান্সের তুলনায় ভালো খেলেছে সেনেগাল। ওদের খেলায় তিন বিভাগের মধ্যেই নিখুঁত বোঝাপড়া-যোগসূত্র রয়েছে। ত্রিভুজাকৃতি পাস খেলে আক্রমণে উঠছে, সেনেগালের আক্রমণগুলি দেখতে ভালোই লাগছিল। ডিফেন্ডাররা সতর্ক থাকায়, গোল হজম করতে হয়নি ফ্রান্সকে।
মাঝমাঠ থেকেই সেনেগালের আক্রমণগুলি শুরু হয়। বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেললেও ঝাঁপিয়ে পড়ে বল ছিনিয়ে নিচ্ছিল। যে কারণে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি আক্রমণ শানাতে পেরেছে। সেনেগালের ফুটবলাররা শারীরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ায় সমস্যা হচ্ছিল ফ্রান্সের। সেনেগালের দুই সাইডব্যাক ফ্রান্সের উইং প্লে বন্ধ করে দিয়েছিল। যে কারণে উইং থেকে অপারেট করতে পারেনি ফ্রান্স। প্রথমার্ধের শেষদিকে একবার ডানদিক থেকে ডেম্বেলে একটা বল বাড়িয়েছিল, যেটা কৌলিবালির গায়ে লেগে কর্নার হয়ে যায়।
এমবাপেকে সেভাবে চোখে পড়লো না। তাও দুটি হাফচান্স পেয়েছিল। বলের প্রথম স্পর্শ ঠিকঠাক না হওয়ায়, কাজের কাজ হয়নি। এমবাপের মতো ফুটবলারকে এই সুযোগগুলি কাজে লাগাতে হবে। সেনেগালের মতো ফিজিক্যাল দলের বিরুদ্ধে বেশি সুযোগ পাবে না। আরেকটি উল্লেখ্যযোগ্য ব্যাপার, সেনেগালের মাঝমাঠ ও ডিফেন্ডাররা নিজেদের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে ফ্রান্সের উইং প্লে বন্ধ করে দিয়েছিল, যে কারণে এমবাপে সেভাবে সাপ্লাই পায়নি প্রথমার্ধে। এমবাপে বাঁ দিক বরাবর খেলতে ভালোবাসে। বল ধরে ফাঁকা জায়গায় গতি বাড়িয়ে দৌড়ে বিপক্ষে ঢুকে শট নিয়ে গোল করতে চায়। যদিও ক্লাবের হয়ে এখন বক্সেই খেলে। এমবাপের উপর চাপ কমাতেই দেশঁ রণকৌশল ছিল, উইং নির্ভর ফুটবল খেলে, এমবাপের উদ্দেশ্য পাস দেওয়া। উইংয়ে বল ছড়াতে হলে মাঝমাঠের দুই ফুটবলারের বড় ভূমিকা থাকতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে রাবিও ছাড়া চুয়োমিনি সেভাবে নজর কাড়তে পারেনি। বাঁ প্রান্তে ডুয়ে খেলতে পারছিল না। ডানপ্রান্তে ওলিসেও। ক্লাবের হয়ে যেমন খেলে বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রথম ম্যাচে প্রথমার্ধে সেভাবে দাগ কাটতে পারলো না। ডানদিক থেকে কাটব্যাক করে ডি বক্সের কাছে চলে গিয়ে শট নেন, সেনেগালের ফুটবলাররা ওকে সেই জায়গাটাই দেয়নি প্রথমার্ধে।
দ্বিতীয়ার্ধে ওলিসে নড়েচড়ে বসায় ফ্রান্স খেলায় ফিরল। সেনেগালের রণকৌশল ছিল কাউন্টার অ্যাটাকে গিয়ে বিপক্ষের গোলমুখ খোলা। এটা করতে গিয়েও নিজেদের বিপদ নিজেরাই ডেকে আনল। ফ্রান্সের ফুটবলাররা জায়গা পরিবর্তন করে বিভ্রান্ত বাড়াল সেনেগালের। ওলিসে ফ্রি হয়ে যাওয়ায় ফের ফ্রান্স সুযোগ তৈরি করতে শুরু করে। ওলিসে দুরন্ত একটি বল বাড়ান এমবাপের জন্য। কিন্তু সেনেগালের গোলরক্ষক এডুয়ার্ডো মেন্ডি নিশ্চিত গোল সেভ করে দলের পতন রোধ করলেন। এরপর আবারও এমবাপের মিস। মেন্ডি এগিয়ে এসে এমবাপের শট রুখে দেন। সেনেগালের এক ডিফেন্ডারের সঙ্গে বল দখলের লড়াইয়ে বক্সের মধ্যে পড়ে যান এমবাপে। ভিএআরের সাহায্য নিয়ে রেফারি গোলকিক দেন। ফ্রান্সের আক্রমণের গতি এতটাই খুব বেশিক্ষণ আটকে রাখা সম্ভব হল না সেনেগালের পক্ষে। ৬৬ মিনিটে এগিয়ে গেল ফ্রান্স। ডানদিক থেকে ওলিসের ডিফেন্স ছেঁড়া থ্রু। চলতি বলে শট নিয়ে ফ্রান্সকে এগিয়ে দিলেন এমবাপে। পরের মিনিটে প্রতি আক্রমণ থেকে নিকোলাস জ্যাকসন গোল করলেও, অফসাইডের জন্য বাতিল হয়। ৮০ মিনিটে ডেম্বেলেকে তুলে দেশঁ নামান বার্কোলাকে। দু’মিনিট মধ্যে দলকে এগিয়ে দিলেন তিনি। মাঝমাঠের সেন্টার লাইন থেকে থ্রু দিলেন রাবিও। গোলরক্ষককে এগিয়ে আসতে দেখে, বলটা চিপ করে জালে পাঠিয়ে দিলেন বার্কোলা। অতিরিক্ত সময়ে ইব্রাহিম এমবায়ে ব্যবধান কমালেও, ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। গোল হজম করার পর ওলিসের পাসে দ্বিতীয় গোল এমবাপের। সেনেগালের বিরুদ্ধে কঠিন ম্যাচ জয়, আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেবে ফ্রান্সের।
Comments :0